আজ ১০৮ টন এসেছে শুধুই ভোমরা দিয়ে, শনিবার পাওয়া পেঁয়াজের ৩০ শতাংশই পচা

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ২২:২০, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৪, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

নষ্ট পেঁয়াজভারতের পেঁয়াজ নিয়ে খেলা অস্থিরতা ও বিরক্তি সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের মধ্যে। কোনও ঘোষণা ছাড়াই হুট করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় কূটনৈতিক যোগাযোগে পাঁচ দিন পর সামান্য পরিমাণে যেটুকু রফতানি শুরু হয়েছে তার ৩০ শতাংশই পচা দেখে উষ্মা প্রকাশ করেছেন আমদানিকারকরা। আবার আজ ভারতে ছুটি থাকায় ভোমরা ছাড়া কোনও বন্দর দিয়ে ঢোকেনি পেঁয়াজ। বাংলাদেশি আমদানিকারকদের অভিযোগ, পয়সা দিয়ে এলসি খোলার পর দেশটির রফতানিকারকরা যে পেঁয়াজ পাঠিয়েছেন সেগুলো ট্রাকে আটকে রেখে পচানোর চেষ্টা করছে স্থল সীমান্তবন্দরগুলোর শুল্ক কর্মকর্তারা। পচনশীল পণ্য জেনেও ১২ থেকে ১৫ দিন ধরে এসব ত্রিপল ঢাকা বস্তবন্দি পণ্য ছাড় না করার বিষয়ে তাদের উদাসীনতার কারণ একবারেই অস্পষ্ট। ডলার দিয়ে পেঁয়াজ কেনার অর্ডার পাঠিয়ে ‘পচা পানি’ পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে আমদানিকারকরা এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে আরও নজরদারি ও তদবির বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।

আমদানি করা নষ্ট পেঁয়াজ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গতকাল ও আজ কোনও পেঁয়াজ ঢোকেনি। ওপারে পেট্রাপোল স্থলবন্দর ও এর আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত ট্রাক পেঁয়াজ ঘুরপথে পাঠানো হচ্ছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের উদ্দেশ্যে। এর কারণ, নতুন করে আমদানি ও রফতানিকারকদের কাছে এটা সেটা কাগজের বাহানা করছে পেট্রাপোলের শুল্ক কর্মকর্তারা। তবে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি বেনাপোলের সংশ্লিষ্টরা। আবার, ভোমরা দিয়ে শনিবার ৩১ ট্রাক পেঁয়াজ ঢুকলেও এর ৩০ শতাংশই পচে গেছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। আর আজ রবিবার ৫টি ট্রাকে এসেছে ১০৮ টন পেঁয়াজ। এদিন দিনাজপুরের হিলি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে কোনও ট্রাক ঢোকেইনি। অথচ এ দুটি বন্দরের ওপারে পেঁয়াজ বোঝাই শত শত ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে বলে আমদানিকারকদের জানিয়েছেন ভারতীয় রফতানিকারকরা।

এমন অবস্থা আমদানির পেঁয়াজের

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, হুট করে রফতানি বন্ধ রাখায় সীমান্তের ওপারে টানা পাঁচদিন আটকে থাকা ট্রাকগুলোর ৩১টি প্রবেশ করেছে শনিবার। আর আজ বিকাল থেকে রাতে প্রবেশ করেছে ৫টি ট্রাক। এতে আমদানি হয়েছে মোট ১০৮ টন পেঁয়াজ। কিন্তু, আমদানিকারকদের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে গেছে বেশিরভাগ ভারতীয় ট্রাকের পেঁয়াজের অবস্থা দেখে। তারা জানিয়েছেন, ভোমরা দিয়ে ঢোকা প্রতিটি ভারতীয় ট্রাক থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। খালাস করার আগেই বোঝা যাচ্ছে অনেক পেঁয়াজ পচে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ৩১টি ট্রাকে আনা ৯৩০ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট বলে দাবি করেছেন তারা।

সাতক্ষীরা ভোমরা কাস্টমস সহকারী কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, শনিবার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ৩১টি ট্রাকে ৯৩০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও রবিবার সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ৪টি পেঁয়াজের ট্রাক প্রবেশ করেছে জিরো পয়েন্টে।

সাতক্ষীরা ভোমরা স্থল বন্দরের আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, পাঁচদিন আটকে থাকার কারণে অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ায় কিনছেন না কোনও ক্রেতা। এতে লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা।

এদিকে, ভোমরা স্থলবন্দরের সীমান্তের ওপারে এখনও অপেক্ষায় রয়েছে দুই থেকে আড়াই শতাধিক ট্রাক।

ভোমরা বন্দরের এমকে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কামরুল ইসলাম বলেন, পাঁচদিন সীমান্তের ওপারে আটকে থাকার পর শনিবার পুরনো এলসির এক ট্রাক পেঁয়াজ এসেছে। গরমের মধ্যে পাঁচদিন আটকে থাকায় বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি পেঁয়াজ পচে পানি বের হচ্ছে। পাইকার এলেও পেঁয়াজ দেখে নিতে চাচ্ছেন না। এক ট্রাকে ৩৭০ বস্তা পেঁয়াজ পেয়েছি। সেগুলো থেকে ১০ জন লোক দিয়ে ১০০ বস্তা পেঁয়াজ বাছাই করে করে ৩০ বস্তা ফেলে দিতে হয়েছে। পেঁয়াজ নিয়েও বিপদে পড়েছি। রোদে শুকিয়ে খুচরা বাজারে বিক্রি করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। লাভ তো দূরের কথা, ক্ষতির মুখে পড়ে গেলাম।

ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, কয়েকজন ভারতীয় ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে, সীমান্তের ওপারে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা বন্দরে পূর্বে এলসি করা পেঁয়াজবোঝাই ২৫৫টি ট্রাক আটকে থাকলেও নতুন করে পেঁয়াজ আসার সম্ভাবনা খুবই কম। ওপারের তারাও স্বীকার করেছেন পাঁচদিন আটকে থাকার কারণে অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে।

শনিবার আসা পেঁয়াজের অবস্থা দেখে আমদানিকারকরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ।

সোনা মসজিদ বন্দর দিয়ে আজ ঢোকেনি পেঁয়াজ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পাঁচদিন রফতানি বন্ধ রাখার পর একদিন পেঁয়াজ দিয়ে আবারও রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। আজ রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে কোনও পেঁয়াজ আসেনি।

পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের বন্দর ব্যবস্থাপক মাইনুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, ‘নিষেধাজ্ঞায় আটকে পড়া পেঁয়াজের একটি অংশ ভারত সরকার ছেড়ে দিতে সম্মতি দিলেও আজ আসেনি কোনও ট্রাক। কবে বা কখন আসতে পারে সে ব্যাপারেও কিছু জানা নেই ওপারের রফতানিকারকদের।’

তবে ভারতের  মোহদীপুর সিঅ্যান্ডএফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ভূপতি মন্ডল পানামা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন,‘পূর্বের এলসির টেন্ডারকৃত কোনও পেঁয়াজের ট্রাক আজ (২০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে প্রবেশ করবে না’।

তিনি আরও জানান, ‘গতকাল (১৯ সেপ্টেম্বর) পূর্বের এলসির টেন্ডারকৃত ৮ টি ট্রাকযোগে ২১৩ মেট্রিক টন পেঁয়াজ বাংলাদেশের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আসে। আর এসব পেঁয়াজের ৫০ শতাংশই পচে গেছে বলেও তিনি জানান।’

এদিকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আব্দুল আওয়াল জানান, ‘সোনামসজিদ স্থলবন্দরে শনিবার প্রবেশ করা পেঁয়াজের ৫০ শতাংশ পচা ছিল এবং এতে আমদানিকারকরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে।’

আজ স্থানীয় বাজারে ৫০-৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ।

আমদানি হওয়া নষ্ট পেঁয়াজ

হিলি দিয়ে কোনও পেঁয়াজ ঢোকেনি

হিলি প্রতিনিধি জানান, শনিবার দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আগের এলসির ১১ ট্রাক ভারতীয় পেঁয়াজ এলেও আজ রবিবার কোনও পেঁয়াজের ট্রাক ঢোকেনি। দেশটির  সরকারের নতুন কোনও নির্দেশনা না আসায় সারি সারি পেঁয়াজবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও তা রফতানি করেননি ভারতীয় শুল্ক কর্মকর্তারা। এদিকে গতকাল রফতানি হওয়া বেশিরভাগ পেঁয়াজই পচা ও নষ্ট হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ভারত সরকারের প্রতারণায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রায় এলসি করার বিনিময়ে পাওয়া এমন পচা পেঁয়াজ দেখে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ এসব ব্যবসায়ী ভারত থেকে আর পেঁয়াজ না নেওয়ার কথাও এখন ভাবছেন। 

এরপরও হিলি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত বন্দর দিয়ে আমদানি রফতানি হওয়ার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্দর দিয়ে ভারত থেকে কোনও পেঁয়াজবাহী ট্রাক দেশে প্রবেশ করেনি।

ভারতের হিলির সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট খোকন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শনিবার বিকেল থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পূর্বের টেন্ডার সম্পূর্ণ হওয়া ১১টি ট্রাকে ২৪৬ টন পেঁয়াজ রফতানি করেছে ভারত। এরপর পেঁয়াজ রফতানির নতুন কোনও নির্দেশনা না থাকায় আজ রবিবার বন্দর দিয়ে কোনও পেঁয়াজ রফতানি হয়নি। একইসাথে আজ রবিবার ভারতে সরকারি ছুটি থাকায় সব অফিস বন্ধ রয়েছে। তাই আজকে এ বিষয়ে কোনও নির্দেশনা আসার সম্ভাবনাও নেই। তবে আগামীকাল আটকে পড়া পেঁয়াজ রফতানির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে নির্দেশনা আসতেও পারে।

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক শহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ডলার দিয়ে পেঁয়াজ কিনলাম কিন্তু কয়েকদিন অপেক্ষায় থাকার পর পেলাম পচা পানি। তবে আমাদের ব্যবসায়ীদের বড় দুঃখ যদি আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটু জোর তদবির করতো তাহলে এই ক্ষতির মুখে আমদানিকারকরা পড়তেন না ‘ 

হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক হারুন উর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দিবো দিচ্ছি, অনুমোদন হবে হচ্ছে এমন অবস্থায় কয়েকদিন অপেক্ষায় থাকার পর গত রবিবারের টেন্ডার হওয়া ১১ ট্রাক পেঁয়াজ গতকাল শনিবার বন্দর দিয়ে রফতানি করেছে ভারত। রফতানি করা এসব পেঁয়াজের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ট্রাকে আটকা থাকায় পচে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক পেঁয়াজ ফেলে দিতে হয়েছে, যার কারণে আমরা ক্ষতির মুখে পড়ে গেছি।

আমদানি হওয়া নষ্ট পেঁয়াজ

বেনাপোলে দু’দিনেও ঢোকেনি পেঁয়াজ 

বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, হুট করে রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শনিবার অন্য বন্দরগুলো দিয়ে পেঁয়াজ ঢুকলেও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কোনও পেঁয়াজ ঢোকেনি। আজ রবিবারও একই অবস্থা দেখা গেছে। মূলত নতুন করে কিছু কাগজ চেয়ে পেট্রাপোলের ভারতীয় শুল্ক কর্মকর্তারা জটিলতা সৃষ্টি করায় এ বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ ঢোকেনি। বেনাপোলের আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, এসব পেঁয়াজবাহী ট্রাক এখন দীর্ঘপথ ঘুরে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আসার কথা রয়েছে।

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X