খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের নাভিশ্বাসএক আঁটি খড় এখন ১৫ টাকা!

Send
তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী
প্রকাশিত : ১০:০০, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০০, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

এক নাগাড়ে বৃষ্টিতে হুট করে বেড়ে গেছে গোখাদ্য খড়ের দাম।

সাধারণ সময়ে গোখাদ্যের খড়ের দাম প্রতি আঁটি এক টাকা। স্থানীয় ভাষায় ‘পোয়াল’ নামে পরিচিত এই ধানের খড়ের আঁটি বিক্রি হয় পণ দরে। ৮০ আঁটিতে পণ। পণের দাম ৮০ টাকা। এক মাস আগেও ছিল এমন দর। তবে আপাতত ধানের সময় শেষ হওয়ায় ও চতুর্থ দফায় বন্যা শুরু হওয়ায় চাহিদার তুলনায় এর সরবরাহ কমে গেছে। পাশপাশি বৃষ্টিতে ভিজে গেছে বেশিরভাগ কৃষকের খড়। এরই সুযোগে এসব খড়ের আঁটির দাম বেড়েছে ১২ থেকে ১৫ গুণ। এখন একেকটি আঁটি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৫ টাকায়। হুট করে পশু খাদ্যের এমন চরম মূল্যবৃদ্ধিতে মারাত্মক সংকটে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারগুলো। নীলফামারীর ছয় উপজেলাজুড়ে এখন এই অবস্থা।

এদিকে, স্থানীয় পশুখাদ্যের দাম বাড়াতে সুযোগ নিচ্ছে পশুখাদ্য বিক্রির বিভিন্ন কোম্পানি। তারাও অধিক মুনাফার আশায় দোকান খুলে বসে আছে।

খড় বিক্রি করেন এমন পাইকারি দোকানিরা বলছেন, সরবরাহ কম থাকার কারণে এক মাস আগে যে খড়ের আঁটির দাম ছিল এক টাকা, সেটি গত সপ্তাহে ঠেকে ৫ টাকায়। তবে এরপর এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই দামও বৃদ্ধি পেয়েছে তিন গুণ আর এক মাস আগের দরের সঙ্গে তুলনা করলে দাম বেড়েছে ১৫ গুণ। টানা বৃষ্টির কারণে ও বাজারে সরবরাহ কম থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এসব ব্যবসায়ী। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে পশুর মালিক ও খামারিরা পড়েছেন চরম বিপাকে।

অতিবর্ষণের সুযোগে দাম বাড়িয়ে খড় বিক্রি করছেন পাইকাররা।

জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের খগাখড়িবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মোতালেব ও উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আছির উদ্দিন জানান, এক বছরে ছয়-সাত বার বন্যা হওয়ায় নিজেদের খড়ের গাঁদা (পোয়ালের পুঞ্জ, কেউ কেউ গোলাও বলে থাকেন) পচে গলে শেষ হয়েছে। এখন গরু বাছুর নিয়ে মহা সংকটের মধ্যে আছি। তিস্তাবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় বারবার বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে একধারে মানুষের কষ্ট ও গবাদি পশুর খাদ্য সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কৃষক ও গৃহস্তদের সীমাহীন দুর্ভোগ চলছে।

জেলার সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের পশ্চিম চৌধুরী পাড়ার আবুল কাশেম জানান, দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের অনেকেই চড়া দামে খড়, ঘাস, লতাপাতাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে না পেরে বাধ্য হয়ে গরু, ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন পানির দামে। এতে নামকা ওয়াস্তে মূল্যে লাখ টাকার পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

একই উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের বটতলী ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের গৃহস্থ আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার তিনটি গরু ও পাঁচটি ছাগল আছে। নিজের জমিতে আবাদ করা ধানের যেটুকু খড় ছিল তা দু’মাস আগেই শেষ হয়েছে। উপায় না পেয়ে, বাজার থেকে অল্প অল্প করে খড় কিনে পশুগুলোর খাবার যোগান দিচ্ছি। কিন্তু, আজ খড় কিনতে এসে উপায় না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি।’

কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত সপ্তাহে যে খড় ৪০০ টাকা পণ (৮০ আঁটি) ছিল তা আজ বিক্রি হচ্ছে ১২০০-১৩০০ টাকা দামে। আর একটু নিম্নমানের ভেজা আঁটির দাম হাজার টাকা পণ। কিভাবে কিনবো বলেন?

এসময় খড়ের দাম প্রায় তিনগুণ দাম বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সৈয়দপুরের ইউসুফ ডেইরি ফার্মের মালিক জামিল আশরাফ বলেন, এক মাসের ব্যবধানে খড়সহ বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত পশু খাদ্যের পণ্যের দাম আকাশচুম্বি হয়েছে। গত বছর সংগ্রহ করা খড়ের মজুত শেষ হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগই বিড়ম্বনার কারণ বলে মনে করেন তিনি।

উপজেলার উত্তরা আবাসন সংলগ্ন টেলাপীর হাটের খড় বিক্রেতা আব্দুল্যা মিয়া জানান, গ্রাম অঞ্চলের বড় বড় গৃহস্থরা খড়ের গোলা তৈরি করে সংরক্ষণ করে। আর ব্যবসায়ীরা মৌসুমে খড় সংগ্রহ করে মজুত গড়ে তোলেন। এবার পরপর কয়েক দফায় বন্যা ও অতি বৃষ্টির কারণে গৃহস্থ বাড়ির খড়ের গোলা পচে গেছে। ফলে খড়ের বাজারে সরবরাহ কমে গেছে।

তিনি বলেন, বড় বড় গৃহস্থরা অধিক মুনাফার আশায় প্রয়োজন অনুযায়ী ওইসব খড় বাজারে না ছেড়ে আটকে রাখায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যা এখন সাধাণ খামারি ও গৃহস্থদের নাগালের বাইরে। এভাবে বন্যা আর বৃষ্টি চলতে থাকলে খাদ্যের দাম আরোও বাড়বে এবং পশু খাদ্য নিয়ে চরম পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

কৃষকের খড়ের গাদা

নীলফামারী জেলা শহরের নিউবাবু পাড়ার খামারি শফিয়ার রহমান বলেন, দুইটি বিদেশি গরু ও দুইটি দেশি ষাঁড় পালন করছি। এবার অতি বৃষ্টি ও বারবার বন্যার কারণে তরতর করে বেড়েই যাচ্ছে পশু খাদ্যের দাম। গমের ভূষি, খৈল, চালের কুড়া, ছোলার খোসা, মশুর ডালের গুড়া ও চালের খুদের বাজার গত দুই মাসে দেড় থেকে দুইগুণ বেড়েছে।

বিদেশি নেপিয়ার ঘাসের আঁটি (বোঝা) ১০ টাকায় স্থির থাকলেও তা এখন পরিমাণে কমে গেছে। আগের আঁটিগুলো এক হাতে ধরা যেত না। এখন দাম ঠিক রেখে সাইজ এতোটাই কম বা চিকন করা হচ্ছে যে দু’আঁটি এক হাতেই ধরা যাচ্ছে।

নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা সাহিদুল ইসলাম জানান, ঔষুধের দোকানসহ নিয়মিতভাবে হাট বাজারের পশু খাদ্যের দোকান মনিটারিং করা হচ্ছে। এটি আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। প্রথমদিকে ব্যবসায়ীদের বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে সচেতন করি। এতে সাবধান না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের জরিমানা করা হয়। তবে খড় বা লতাপাতা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য আমাদের নাগালের বাইরে হওয়ায় খড়ের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এতে ছোট বড় খামারিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি। আবার অনেকেই পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

/টিএন/

লাইভ

টপ