আরসার নামে রোহিঙ্গাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ

Send
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১০:৪২, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৫, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি আরসা (আগের নাম আল-ইয়াকিন) নাম ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের অপহরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, গত এক মাসে অর্ধশতাধিক অপরহরণের ঘটনা  ঘটেছে। বেশির ভাগই মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, ক্যাম্পে আরসার অস্তিত্ব নেই। অনেক সময় সাধারণ অপরাধীরা এই সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে।

শরণার্থীদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘সম্প্রতি অপরণের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। গত এক মাসে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে অর্ধশতাধিক ঘটনার কথা আমরা জেনেছি। এসব ঘটনার ফলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপহরণ আতঙ্ক বেড়েছে।’ 
উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা বলেছেন, অপহরণের কিছু ঘটনা ঘটলেও তা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো নয়। তাছাড়া কেউ অপহৃত হলে তাকে উদ্ধার করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের নতুন রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বেশ কয়েক মাস ধরেই মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বেড়েছেই চলেছে। তিন বছরে শুধু আমাদের শিবিরেই কমপক্ষে ১০টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।’
এপিবিএন-১৪ অধিনায়ক আতিকুর রহমান বলেন, ‘উখিয়ার ২১টি শরণার্থী শিবিরে গত এক মাসে ১৫টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৩ জন অপহৃতকে আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। তবে মাত্র তিনটি  ঘটনায় মামলা হয়েছে।’
জানতে চাইলে এপিবিএন-১৬ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ হেমায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে পাঁচটি অপহরণের অভিযোগ  পেয়েছি  আমরা। এছাড়া বিভিন্ন সূত্রে আরও চার-পাঁচটি ঘটনা জানা গেছে। তবে ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বেশির ভাগ অপহরণ মুক্তিপণ আদায়ের কারণে ঘটছে।’

উদ্ধার হওয়া অপহৃতরা যা বললেন
পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের সূত্রে অপহৃত ১২ জনের পরিচয় জানতে পাওয়া গেছে। তারা হচ্ছেন; উখিয়ার জামতলীর নুর আংকিজ (১২), একই শিবিরের আবদুল্লাহ (৪০) ও রশিদ (২৬), কুতুপালংয়ের শাহ আলম (১৭), আক্তার হোসেন (২৬), টেকনাফের লেদা শিবিরের আবুল ফয়েজ (৩৫), আলমগীর (২৪), শালবন শিবিরের একরাম (২৫), সৈয়দ আমিন (৩০), উনচিপ্রাংয়ের জাহেদ হোসেন (৩০), ইয়াছের আরফাত (১৮) এবং আলীখালী শিবিরের ইমান হোসেন (২২)। 

আগস্টের শেষ সপ্তাহে অপহরণের শিকার হয়েছিলেন লেদার নতুন শিবিরের বাসিন্দা  ইউনুছ (৩৫)। তিনি বলেন, ‘রাতে ঘর থেকে আমাকে ধরে চোখ-মুখ আর হাত বেঁধে শিবির সংলগ্ন পাহাড়ে নিয়ে যায় আল-ইয়াকিনের লোকজন। সেখানে নিয়ে লোহার রড ও লাঠি নিয়ে ব্যাপক মারধর করে। এভাবে দুই দফা নির্যাতন করে রক্তাক্ত করে আমাকে। এরপর আমার  মোবাইল দিয়েই স্বজনদের কাছে ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়। বিষয়টি কাউকে অবহিত করলে আমাকে হত্যার করা হবে বলে ভয় দেখানো হয়। পরিবারের সদস্যরা সোনার গহনা বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করে তা অপহরণকারীদের কাছে দিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে আনে।’ সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর একই শিবিরের আমানউল্লাহ (৩১) ও মোহাম্মদ সেলিমকে  (১৬) ‘আল-ইয়াকিন’ পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রোহিঙ্গারা। দুই দিন পর তাদের কাছ থেকে যথাক্রমে ৩০ হাজার ও ৫৫ হাজার টাকা  মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয় অপহরণকারীরা।
আমান বলেন, ‘দিন দুপুরে কয়েকজন মুখোশধারী অস্ত্রধারী চোখ বেঁধে আমাকে পাহাড়ে  নিয়ে যায়। সেখানে তাদের আস্তানায় অস্ত্রশস্ত্রসহ আরও সদস্য ছিল। তারা সবাই খুব  ভয়ঙ্কর প্রকৃতির।’
সদ্য বিদায়ী কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেছিলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি, বাংলাদেশে আরসার কোনও অস্তিত্ব নেই। তবে  ক্যাম্পের অনেক ছিঁচকে অপরাধীও আতঙ্ক তৈরির জন্য তাদের নাম ব্যবহার করে। এদের  ব্যাপারে পুলিশ সব সময় সতর্ক রয়েছে।’
সস্প্রতি অপহরণের সঙ্গে জড়িত আটজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এপিবিএন। এর মধ্যে উখিয়া থেকে চারজন এবং টেকনাফ থেকে চারজনকে গ্রেফতার করা  হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার নয়াপাড়া শিবিরে অভিযান চালিয়ে অপহৃত রশিদকে (২৮) উদ্ধার  এবং অস্ত্রসহ অপহরণকারী মো. সাদেক (২৬) নামে এক অপহরণকারীকে গ্রেফতার করা  হয়েছে।
শিবিরের এপিবিএন-এর পুলিশ চৌকির পরিদর্শক রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘রশিদের স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছিল অপহরণকারীরা। এর আগে রবিবার শালবন শিবির থেকে জাবের (২৫) নামের এক রোহিঙ্গা যুবককে তুলে  নিয়ে গেছে অপহরণকারীরা। তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। ’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যাতে ক্যাম্পে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। শিবিরগুলোয় পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে বেশির  ভাগ ক্ষেত্রে  ভুক্তভোগীরা এ জাতীয়  ঘটনা  গোপন  রেখে  অপহরণকারীদের  সঙ্গে  সমঝোতা  করে ফেলে।’
তার  বক্তব্যের  সত্যতা  নিশ্চিত  করে  উখিয়ার  লম্বাশিয়া  রোহিঙ্গা  শিবিরের  নেতা   রফিক  বলেন, ‘অনেক  সময়  এসব  বিষয়  আমাদের  কান  পর্যন্তও  আসে  না।’

 

 

/এসটি/

লাইভ

টপ
X