টাকা ছিনতাই করতেই পিরোজপুরে চীনা নাগরিককে হত্যা: ডিআইজি

Send
পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬:৪৯, অক্টোবর ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৪, অক্টোবর ২০, ২০২০

 

লাও ফানপিরোজপুরে বেকুটিয়ায় কঁচা নদীতে নির্মাণাধীন ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুতে কর্মরত চীনের নাগরিক লাও ফান (প্যান ইয়াংজুন (৫৮) হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি হোসেন সেখ (১৯) এবং তার সহযোগী সাব্বির আহম্মেদ সেখকে (২০) গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম।

গ্রেফতার হোসেন সেখ পিরোজপুর সদরের মরিচাল এলাকার ছোরাফ সেখের ছেলে এবং সাব্বির সেখ একই এলাকার হায়দার আলী সেখের ছেলে।

ব্রিফিংয়ে ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যাপক তদন্তের পর হত্যাকাণ্ডের মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে মূল আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। টাকা ছিনতাইয়ের জন্যই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, গ্রেফতার সাব্বির সেখ নির্মাণাধীন ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর কর্মরত একজন স্থানীয় শ্রমিক। সে প্রায় দেড় বছর ধরে সেতু নির্মাণ কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আসছে। চীনা নাগরিক হত্যার মূল ঘাতক হোসেন সেখ নির্মাণ শ্রমিক সাব্বিরের বন্ধু। সাব্বিরের সুপারিশে গত মার্চ মাসে সেতুতে শ্রমিক হিসেবে কাজ নেয় হোসেন সেখ। হোসেনের কাজ ভালো না হওয়ায় তাকে মাত্র ১৪ দিন পরে কাজ থেকে বাদ দেয় চীনা নাগরিক লাও ফান। এসময় হোসেন তার কাজের ব্যবহৃত হেলমেটটি নিয়ে যায়। পরবর্তী মাসে বেতন দেওয়ার সময় লাও ফান হেলমেট বাবদ ৫০০ টাকা কেটে রাখেন।

এই ক্ষোভ থেকে সে চীনা নাগরিক প্রধান টেকনিশিয়ান লাও ফান থেকে টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে। তাই ওই চীনা নাগরিক কখন ও কীভাবে শ্রমিকদের বেতনের টাকা নিয়ে যায় তা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। পরে সাব্বিরের সঙ্গে যোগসাজসে তারা দু'জনে লাও ফানের থেকে টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে।

গত ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চীনা নাগরিক লাও ফান শ্রমিকদের বেতন দিতে ব্যাগে করে ২ লাখ ৫৩ হাজার ২৩০ টাকা নিয়ে বাইসাইকেলে করে চায়না ব্যারাকের বাসস্থান থেকে সেতুর নির্মাণ কাজের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে ওঁৎ পেতে থাকা হোসেন সেখ টাকার ব্যাগ ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে লাও ফান বাধা দেয়। তখন হোসেন তাকে ছুরিকাঘাত করে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় লাও ফানকে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে নিয়ে এলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

 পুলিশ এ ঘটনায় ওই দিন রাতে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে পিরোজপুর সদর উপজেলার শারিকতলা-ডুমুরিতলা ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের আব্দুস সত্তার সেখের ছেলে সিরাজ সেখ (৩০) এবং পিরোজপুর পৌরসভার কুমারখালী গ্রামের বাবুল সেখের ছেলে রানা সেখকে (২৮) গ্রেফতার করে।

পরবর্তীতে পুলিশ ব্যাপক তদন্ত শেষে গত ১২ অক্টোবর সেতুতে কর্মরত শ্রমিক সাব্বিরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যার ঘটনা এবং তার বন্ধু হোসেনের কথা পুলিশকে জানায়। পুলিশ ওইদিন রাতেই হোসেনকে তার বাড়ি থেকে আটক করে। এসময় তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বাড়ির খাটের নিচ থেকে ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ও ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিস উদ্ধার করে। এরপর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে হোসেন সব দোষ স্বীকার করে গত ১৯ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

পিরোজপুর পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান জানান, মূল টাকা থেকে হিসাব অনুযায়ী ২ হাজার ৪৩০ টাকা এখনও পাওয়া যায়নি।

প্রেস ব্রিফিংয়ে পিরোজপুর পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) মোল্লা আজাদ হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী শাহ নেওয়াজ (সদর দপ্তর), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) খায়রুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, চীনা নাগরিক হত্যা ঘটনায় নির্মানাধীন ৮ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর সিকিউরিটি ইনচার্জ কাও চিয়েন হুয়া বাদী হয়ে গত ৭ অক্টোবর রাতে অজ্ঞাত আসামিদের নামে পিরোজপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। নিহত চীনা নাগরিক লাও ফানের (প্যান ইয়াংজু) লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে লাশ চীনে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর পুলিশ সুপার হায়াতুল ইসলাম খান। তিনি আরও জানান, বেকুটিয়া সেতুতে কর্মরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তায় সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সেতু এলাকায় পুলিশের একটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে, পিরোজপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন জানান, বেকুটিয়া সেতুতে কর্মরত চীনা নাগরিক হত্যার ঘটনায় পিরোজপুর পুলিশের তদন্তকাজ এবং আসামিদের গ্রেফতার করায় সেতুতে কর্মরত চীনা নাগরিকরা সন্তুষ্ট। হত্যা ঘটনায় সেতুর কাজে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েনি। বর্তমানে সেতুর কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছে।

/টিটি/

লাইভ

টপ