পূজার বাদ্যের বায়না, ঢাকের হাট ছাড়া হয় না

Send
বিজয় রায় খোকা, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৬:১৭, অক্টোবর ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৪১, অক্টোবর ২৩, ২০২০

পূজার মণ্ডপে বাজনা বাজানোর বায়নার আশায় ঢাকের হাটে উপস্থিত ঢাকিরা।

মহাষষ্ঠী পূজোর মাধ্যমে শুরু হয়ে গেছে সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে সব আনন্দের মাঝেই যেন বিষন্নতার ছাপ। প্রতিবারের মতো জাঁকজমক পূর্ণতা পাচ্ছে না এবারের দুর্গাপূজায়। তবে এরই মাঝে এবারও জমজমাট ছিল কটিয়াদির ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট।

মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী ঢাকের আওয়াজ ছাড়া সকল কিছুই যেন অসম্পূর্ণ। আর এমন প্রয়োজন থেকেই ৫০০ বছর ধরে কিশোরগঞ্জে কটিয়াদী উপজেলায় শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। ষষ্ঠীর আগের দিন থেকে মোট দুই দিন এ হাট বসে। তবে এবার করোনা ভাইরাসের প্রভাবের কারণে ঢাকের হাটটি বসে ষষ্ঠীপূজোর দু’দিন আগেই। শেষ হয় বৃহস্পতিবার দুপুরে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কটিয়াদীর পুরান বাজারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রতি বছরের মতন এবারও ঢাকীদের সরব উপস্থিতি। তবে করোনার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ঢাকীর সংখ্যা তুলনামূলক হারে কম। এবার ঢাকার বিক্রমপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে আসা ঢাকীর সংখ্যাই বেশি।

ঢোল ঢাক নিয়ে পূজার আয়োজকদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রীরা।

তবে নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচার কোনও কারবার হয় না। এ হাটে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের বাদকরা টাকার বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন পূজা আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। বাদকরা তাদের বাদ্যযন্ত্র বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বাজিয়ে বায়নাকারীদের আকৃষ্ট করেই পূজোর দিনগুলোতে চুক্তিবদ্ধ হোন। বেশিরভাগ ঢাকি বংশ পরম্পরায় প্রতিবছরই এ হাটে ঢাক-ঢোল নিয়ে উপস্থিত হন। হাটে শুধু ঢাক-ঢোলই নয়, এখানে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, কাঁশি, ঝনঝনিসহ নানা জাতের বাদ্যযন্ত্রও বায়না করা হয়।

বাদকরা জানান, প্রতিবার দলগতভাবেই বিভিন্ন পূজা আয়োজকদের সাথে তাদের চুক্তি হয়। তবে এবারের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তারা নিজেদের মত করেই যাদের সাথে দরদামে মিলবে তাদের মণ্ডপেই বাজনা বাজাবে। প্রতিবার ১০ হাজার থেকে লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায় তাদের চুক্তিমূল্য। তবে এবারের পূজোয় সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই পূজোর দিনগুলোতে মোটামুটি পোষাবে এমন দামেই তারা বিভিন্ন মণ্ডপে বাদ্যযন্ত্র বাজাবেন।

শ্যামল দাস (৬৫) প্রতিবার নরংসিদীর কোনও না কোনও দলের সঙ্গে আসেন। তবে এবার এসেছেন একা। তিনি জানান, গতকাল রাতেই এখানে এসেছি। গত ৪০ বছর ধরে এ হাটে ভালো বায়নায় চুক্তি পেয়েছি। তবে এবার যেহেতু একা ৮-১০ হাজার পেলেও যে কোনও জায়গার মণ্ডপে অংশ নেবো।

ঢাকের হাটে ঢাকিদের এন ভিড় হয় সবসময়।

ঢাকিসহ বিভিন্ন বাদ্যের একটি দল ভাড়া নিতে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা থেকে এসেছিলেন সুকুমার পন্ডিত। তিনি জানান, ‘সকাল থেকে হাটে ঘুরছি। বিভিন্ন বাদকদের সাথে কথাও হয়েছে। বাদ্যযন্ত্র ও বাদকদের পরখ করা হয়েছে। প্রতিবছরই এখান থেকে বাদকদলের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তাদের নিয়ে যাই। তাই এবারো এসেছি। বিক্রমপুরের একটি দলকে পছন্দ হয়েছে, দাম-দর ঠিক থাকলে চুক্তি করবো।’

জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে কটিয়াদীতে প্রথম ঢাকের হাটের সূচনা হয়। তিনি ওই সময় রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। একবার তিনি পূজার প্রয়োজনে সেরা ঢাকির সন্ধানে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠান। তখন নৌপথে বহু ঢাকি কটিয়াদী আসেন। রাজা নিজে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নেন। সেই থেকেই প্রচলন শুরু এ ঢাকের হাটের।

হাটের আয়োজকদের পক্ষে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, কটিয়াদী উপজেলা শাখার  সভাপতি বেনী মাধব ঘোষ জানান, এ হাটে প্রতিবছরই প্রায় পাঁচশ বাদকদল দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশ নেন। কটিয়াদি পুরান বাজারে এ হাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা আয়োজক হিসেবে বাদকদল এবং যারা বায়না করবে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে থাকি। তবে এবার করোনা ভাইরাসের কারণে বাদকদের উপস্থিতি অনেকটাই কম। আবার হাটে আসা সকল বাদকরাই চুক্তিবদ্ধ হতে পারে না। তখন তাদেরকে গাড়িভাড়া দিয়ে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করি।

/টিএন/

লাইভ

টপ