যমুনা-পদ্মায় অবাধে চলছে মা ইলিশ নিধন

Send
মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত : ১২:৩৫, অক্টোবর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৬, অক্টোবর ৩০, ২০২০

ইলিশনিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার যমুনা এবং হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা নদীতে অবাধে চলছে মা ইলিশ নিধন। স্থানীয় অসাধু জনপ্রতিনিধিরা জেলেদের টাকার বিনিময়ে ইলিশ ধরার টোকেন দিচ্ছেন—এমন প্রমাণও পেয়েছে প্রশাসন। গত মঙ্গলবার যমুনা নদীতে মা ইলিশ ধরার সময় প্রশাসন ৫৮ জন জেলেকে আটক করেছে। এদের একজনের কাছে টোকেন পাওয়া গেছে। দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য ওই টোকেন দিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সরেজমিনে যমুনায় ঘুরে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা  উপজেলা সীমানা পেরিয়ে দৌলতপুরের জিয়নপুর এলাকায় পৌঁছানোর পর দেখে যায় অসংখ্য নৌকার বহর। মা ইলিশ ধরতে সবাই মাঝ যমুনার পথে ছুটে চলছে। এ সময় কথা হয় কয়েকজন জেলের সঙ্গে। তারা বলেন, কী আর করবো ভাই, নিতান্ত পেটের তাগিদে মাছ ধরতে এসেছি। পুলিশ কিংবা প্রশাসনের হাতে ধরা পড়লে নির্ঘাত জেল-জরিমানা জেনেও আমরা এসেছি। 

জিয়নপুর থেকে বাঘুটিয়া গিয়ে দেখা গেলো, মা ইলিশ ধরার নৌকার সংখ্যা আরও বেশি। রীতিমতো স্বাচ্ছন্দে তারা ইলিশ ধরতে জাল ফেলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মাছ শিকারি জানান, প্রশাসনের লোকজন কখন নদীতে আসছেন, তারা তা ফোনে আগেই জেনে যান। কীভাবে খবর আসে তাদের কাছে এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, দিনরাত ছদ্মবেশে আমাদের সহযোগীরা উপজেলা পরিষদ গেট ও থানার গেটে বসে থাকেন। কেউ রওনা হওয়ামাত্র নদীর ঘাটে থাকা আমাদের আরেক লোককে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই আমাদের পুরো নেটওয়ার্কে খবর ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় সাবেক একজন জনপ্রতিনিধিও মা ইলিশ শিকারে নেমেছেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কখন অফিস থেকে রওয়া হন, কখন তিনি নদীর ঘাটে পৌঁছান, আগেই আমাদের কাছে মেসেজ চলে আসে। সে হিসেব মতো সুবিধাজনক সময়ে একসঙ্গে আমরা যমুনা নদীতে ঢুকে পড়ি। তিনি জানান, আমাদের এ জন্য নৌকা প্রতি প্রশাসনের জন্য বাজেট থাকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাতে টাকাগুলো তুলে দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার সকাল ১১টা, যমুনা বক্ষে দুচোখের সীমানা দৃষ্টিতে শুধু ইলিশ ধরার ছোট ছোট নৌকা। কম করে হলেও দুইশ’-তিনশ’ নৌকা হবে। প্রতিটি নৌকায় মধ্যবয়সী, যুবক ও শিশুরা আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৫ বছর বয়স্ক এক ইলিশ শিকারি জানান, এবার নদীতে কম মাছ ধরা পড়ছে। তারপরও তারা নদীতে ঝুঁকি নিয়ে নেমেছেন। স্থানীয় ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে তিনিসহ অনেকেই মাছ ধরতে নদীতে নেমেছেন। ওই মেম্বারের সঙ্গে কথা হলে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এটা ষড়যন্ত্র।’

এদিকে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাচামারা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম, স্থানীয় সালাম শেখ, আরিফ শেখ টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।  তারা ইলিশ শিকারিদের টাকার বিনিময়ে টোকেন দিচ্ছেন।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরুল হাসান জানান, তাদের কাছে টোকেন দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। গত মঙ্গলবার প্রশাসনের হাতে আটক এক জেলের কাছ থেকে টোকেন উদ্ধার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৪ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত দৌলতপুর উপজেলায় ২৫টি অভিযান পরিচালনা করে ২২৭টি মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৬০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও ৩ লাখ ২১ হাজার দুইশ’ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ২১ লাখ ৬৫ হাজার মিটার করেন্ট জাল ধ্বংস করা হয়েছে এবং জব্দকৃত ১০৫ কেজি ইলিশ মাছ এতিমখানা ও গরিবের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

শিবালয় উপজেলায় ২৭টি অভিযান পরিচালনা করে ১৮১টি মামলা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও ২ লাখ ৫৬ হাজার ছয়শ’ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া ২৩ লাখ ৮০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস ও জব্দকৃত ১২০ কেজি ইলিশ মাছ এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে।

তবে হরিরামপুর উপজেলায় ২১টি অভিযান পরিচালনা হলেও মামলা হয়েছে মাত্র ৯টি। এদের মধ্যে ৮ জনকে কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া ৫ লাখ ৭৭ মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস করা হয়েছে। ১৫ কেজি ইলিশ মাছ জব্দ করে এতিমখানায় দেওয়া হয়েছে।

পদ্মা নদীর বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় জেলেরা জাল, নৌকা নিয়ে নদীতে ইলিশ ধরার চেষ্টা করছেন। অনেক নৌকা রাতে মাছ ধরে নদীর তীরবর্তী চরে নোঙর করে রেখেছেন তারা। এসব ইলিশ সুতালড়ী, আজিমনগর ও লেজরাগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। পাড়া মহল্লায় এসব ইলিশ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ছোট আকারের ইলিশ দুইশ’ থেকে তিনশ’ আর বড় সাইজের মা ইলিশ ছয়শ’ থেকে সাতশ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।  

সুতালড়ী এলাকার রোজিনা বেগম জানান, এ সময়ে অল্প দামে ইলিশ পাওয়ায় কিনছেন তারা।

/আইএ/

লাইভ

টপ