নাসিরনগর হামলা চার বছর আজ: শেষ হয়নি মামলার তদন্ত কাজ

Send
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৩:৫২, অক্টোবর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৬, অক্টোবর ৩১, ২০২০

হামলায় ভাংচুর করা বাড়ি ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক বাড়িঘর, মন্দিরে হামলার ঘটনার চার বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের আজকের দিনে নারকীয় ওই তান্ডবের পর বিচার চেয়ে একাধিক মামলা হয়েছিল। দীর্ঘ চার বছরেও মামলাগুলোর তদন্ত কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত কাজ শেষ হবে বলে আশা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীরা জানান, ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জেলে পরিবারের সদস্য নিরক্ষর রসরাজ দাসের ফেসবুক আইডি থেকে পবিত্র ‘কাবাঘর’ অবমাননা করে ছবি পোস্ট করা হয়েছিল-এমন অভিযোগের পর সেদিন পুরো উপজেলা সদরে মাইকিং করে প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করা হয়। পরদিন ৩০ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে নাসিরনগর উপজেলা সদরের কলেজ মোড় এবং আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আহলে সুন্নাতুল জামায়াত এবং হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এক পর্যায়ে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে এক দল লোক মিছিল নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮টি পাড়ার শতাধিক বাড়িঘর ও ১০টি মন্দিরে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করে।

সেদিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা এখনও ভুলতে পারেননি গাংকুল পাড়ার পূর্ণিমা রানী দাস। তিনি বলেন, সেদিন কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ঘরে ভাংচুর, লুটপাট করা হয়। সেই ঘটনায় আমার স্বামী স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল। গত বছর তিনি মারা যান।

হরিপুর গ্রামের আরতি দাস জানান, আমরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যারা হামলা করেছিল তাদেরকে যেন যোগ্য শাস্তি এবং জ্ঞান দান করেন। এমন হামলার ঘটনা আমরা আর দেখতে চাই না।

নাসিরনগর সদরের পরিমল, অনাথ, সুবল দাস বলেন, হামলার ঘটনা আর জিজ্ঞেস করবেন না। কি হবে আর জিজ্ঞেস করে, লিখে। কোনও বিচার হবে না। পুরনো ঘটনা সামনে এনে আর বিপদে পড়তে চাই না। সে দিনের ঘটনায় যারা জড়িত ছিল তারা সবাই এখন প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। এ নিয়ে কথা বললে তাদের (আসামিদের) রোশানলে পরতে হবে।

তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মামলা হয়েছে ৮টি। শুনেছি গৌর মন্দির ভাঙ্গার মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর চার বছরেও কোনও হদিস নেই। যে কয়েকজন আসামি ধরা পড়েছিল তারা কিছু দিন জেল খেটেছে। সবাই এখন জামিনে মুক্ত। গত চার বছরে অনেক কিছু বদলেছে, মন্ত্রী মারা যাওয়ার পর নতুন এমপি হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না।

তারা বলেন, হতাশার মধ্যেও সেদিন আমরা আশার আলো খুজে পেয়েছিলাম, নাসিরনগর উপজেলা সদরের স্থানীয় মুসলিম যুবকরা হয়তো বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন। সেদিন তারা অনেকেই দলবদ্ধভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের একজন স্কুল শিক্ষক আব্দুল মজিদ। তিনি তখন জানিয়ে ছিলেন নাসিরনগরে সেই দিনের হামলার ঘটনা ছিল পরিকল্পিত। 

তিনি জানান, হামলার দিন আমরা কলেজ মোড়ে একটি ক্লিনিকে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এর কিছু দূরে আমাদের সামনে দিয়ে হঠাৎ লাঠিসোঁটা নিয়ে একটি মিছিল নাসিরনগরের সম্রান্ত হিন্দু বাড়ি দত্তবাড়ির দিকে যাচ্ছিল। মিছিলকারী সবাই ছিল উত্তেজিত। এরমধ্যে একজন এসে বললো, দত্তবাড়িতে হামলা চালাচ্ছে মিছিলকারীরা। এ সময় বন্ধু জামাল, জোবায়ের, চৌধুরী সুমন, উজ্জলসহ বেশ কয়েকজন সেখানে ছুটে যাই। ততক্ষণে দত্তবাড়ির কালীমন্দিরে হামলা চালিয়ে মূর্তি ভেঙ্গে ফেলে মিছিলকারীরা। পরে বাড়িটিকে রক্ষায় বন্ধুদের নিয়ে মানব দেয়াল তৈরি করে শেষ চেষ্টা চালিয়ে সফল হই। তবে হামলাকারীদের আঘাতে আহত হই। আমরা চাই প্রত্যেক দোষীর বিচার হোক। তবে কোনও নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয় সেই দাবিও জানাই।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির এদিকে হরিপুর গ্রামের রসরাজ দাস জানান, ফেসবুক কি আমি জানতাম না। ঘটনার দিন আমাকে এক দল লোক মারতে মারতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। আমি গুরুতর আহত হই। পরে তারা আমাকে মৃত ভেবে পুলিশের কাছে তুলে দেয়। পুলিশ আমার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করে। গত চার বছর ধরে আমাকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিলে মাছ ধরে জীবন চালাই। যা পাই আদালতে আসা-যাওয়ার গাড়ি ভাড়া দিতে গিয়ে শেষ। অন্যায় না করেও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা খেয়েছি। ঘটনায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মামলার দায় থেকে মুক্তি চান জেলে পরিবারের সহজ সরল রসরাজ দাস।

২০১৬ সালের এ ঘটনার পর দোষীদের বিচার চেয়ে সে সময় নাসিরনগর থানায় মোট ৮টি মামলা হয়। কিন্তু গত চার বছরে গৌরমন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার চার্জশিট ছাড়া বাকি মামলাগুলোর তদন্ত কাজ এখনও শেষ হয়নি। এতে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকই।

গৌরমন্দির হামলার ঘটনার মামলার বাদী নির্মল চৌধুরী জানান, আমার দায়ের করা মামলায় ২২৩ জনকে দায়ী করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। যারা ইতোপূর্বে এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছে তারা জেলা থেকে জামিনে মুক্ত। বিচার চেয়ে লাভ নেই বিধায় আজকের দিনে কোনও কর্মসূচি পালন করিনি।

এ ব্যাপারে নাসিরনগর উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খিষ্ট্রান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার চক্রবর্তী জানান, ফেসবুক কেন্দ্রিক ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। বিচারহীনতা চলতে থাকলে এক সময় সরকারও বিপাকে পড়তে পারেন। তাই প্রত্যেকটি ঘটনার পেছনের ঘটনা সামনে আনা উচিৎ। দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিৎ। অন্যথায় এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। 

চার বছরে নাসিরনগরে কোনও কর্মসূচি ছিল কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেননি বিধায় কোনও কর্মসূচি পালন করা হয়নি।

মামলার বিষয়ে রসরাজ দাসের আইনজীবি অ্যাডভোকেট নাসির মিয়া জানান, রসরাজের মামলাটির কোনও কূল-কিনার হয়নি। প্রতিনিয়ত মামলায় হাজিরা দিচ্ছেন রসরাজ।

অন্য মামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, রসরাজ দাসসহ নাসিরনগরে হামলার ঘটনায় মোট ৮টি মামলার মধ্যে শুধুমাত্র গৌরমন্দির হামলার ঘটনার ২২৩ জনকে আসামি করে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত অনেকেই জামিনে আছেন। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত কাজ এখনও শেষ হয়নি।  

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আনিসুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, নাসিরনগর হামলার ঘটনার থানায় দায়েরকৃত ৮টি মামলায় পুলিশ মোট ১২৬ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছিল। তবে তারা সবাই এখন জামিনে মুক্ত। 

/আরআইজে/

লাইভ

টপ