খাগড়াছড়িতে সবই চলছে আগের মতো, হারিয়ে গেছে মাস্ক

Send
জসিম উদ্দিন মজুমদার, খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত : ২১:২৯, অক্টোবর ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৫, অক্টোবর ৩১, ২০২০

খাগড়াছড়ির সড়কে মাস্ক ছাড়া এভাবেই ঘুরছে মানুষ।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে খাগড়াছড়িতে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানতে নারাজ বেশিরভাগ মানুষ। স্বাস্থ্যবিধি না মানার তালিকায় শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আছেন স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। চলমান দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনেও মানা হয়নি স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত বিধি-বিধান। এখন সবই চলছে আগের মতো, কেবল হারিয়ে গেছে মাস্ক। আর স্বাস্থ্যবিধি আছে কাগজে-কলমে। এই বিষয়ে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরাও আছেন নমনীয় অবস্থানে। সাধারণ মানুষ তো বটেই মাস্ক ব্যবহার করেন না রাজনৈতিক দলের নেতারাও। অথচ জেলাটিতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেলেও একেবারে নির্মূলও হয়নি এই রোগ। এখনও অনেকে বাড়িতে থেকে এ রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১ মার্চ হতে ২৪শে অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশ থেকে খাগড়াছড়িতে ফিরেছে ২৬৪ জন প্রবাসী। তাদের মধ্যে ১৮২ জন পুরুষ এবং ৮২ জন নারী। প্রবাসীদের মধ্যে ১৬৩ জনকে শনাক্ত করার পর কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল এবং ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হননি। আর দেশের বিভিন্ন জেলা হতে খাগড়াছড়ি জেলায় আসা
১ হাজার ১০১জনকে কোয়ারেন্টিন শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ৪ হাজার ২৫২ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এদের মধ্যে দুজন বাদে সবার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৭১০ জন করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন। তাদের মধ্যে ৫৬৮ জন পুরুষ আর নারী হচ্ছেন ১৪২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৫৫ জন সুস্থ হয়েছেন আর মারা গেছেন ৫জন। ৫০ জন করোনা আক্রান্ত হয়ে তখন পর্যন্ত বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

স্বাস্থ্যবিধি ছাড়াই চলছে খাগড়াছড়ির বাজার


জেলা সদর হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কেউ হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নেই। তবে এর আগে শুরু থেকে গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ২৬০ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে ছিলেন এবং ছাড় পেয়েছেন। হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা ১২৬৪ জনের প্রত্যেকেই ছাড় পেয়েছেন। ৯ উপজেলায় আইসোলেশনে থাকা ৭১৯ জনের মধ্যে ছাড় পেয়েছেন ৬৬৩জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি জানান, তিনি বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। কারণ বাড়ির লোকজন তার যে যত্ন নেবে, সেভাবে কিন্তু হাসপাতালের নার্স ও চিকিৎসকেরা নেবেন না। তাছাড়া চিকিৎসাও প্রায় একই ধরনের, হাসপাতালে গেলে বাড়ির চেয়ে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই।

মনপুরা আবাসিক এলাকার নাছিমা আকতার বলেন, প্রথম প্রথম করোনার রোগী সন্দেহে সব ধরনের রোগীই ঠিকমতো সেবা পায়নি। তাছাড়া চিকিৎসকেরা সামনা সামনি রোগী দেখেননি। কিন্তু এখন তারা চিকিৎসকেরা স্বাস্থ সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করে রোগী দেখছেন। সবাই সচেতন বিধায় করোনা ভাইরাস কম ছড়াচ্ছে।

খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের নার্স সানাউ মারমা জানান এখনও তাদের মাঝে ভয় কাজ করে। তবে এটি তাদের পেশা এবং সরকার পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়ায় তাদের সাহস বেড়েছে।

একই হাসপাতালের ডা. জয়া চাকমা বলেন রোগীদের সেবা দিতে দিতে নিজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ি। নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়েছি। বাসার সবাই সতর্কতার সঙ্গে সেবা-যত্ন করলেও কেউ অবহেলা করেনি। নিজ অভিজ্ঞতায় বলছি ভয় নয়, সাহস,মানবিকতা ও সতর্কতা আমাদেরকে এই মহামারি থেকে রক্ষা করতে পারে।

মোটর সাইকেল থেকে নেমে ভাড়া মেটাচ্ছেন এক যাত্রী। সব ঠিক আগের মতো। মাস্ক কিংবা স্বাস্থ্যবিধি পুরোটাই উপেক্ষিত।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী আছে। সরকারের পাশাপাশি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েছে। খাগড়াছড়িতে স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা মোকাবিলায় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, আশা করি কোনও সমস্যা হবে না।

খাগড়াছড়ি মাতৃমঙ্গলের চিকিৎসক ডা. সূপর্না দে জানান, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী পর্যাপ্ত নেই। গর্ভবতী মহিলারাও করোনায় আক্রান্ত হতে পারে উল্লেখ করে খাগড়াছড়িতে পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য আরও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়ার অনুরোধ করার পাশাপাশি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি হতে সামগ্রী দেওয়ায় ধন্যবাদ জানান।

ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মিটন চাকমা বলেন, খাগড়াছড়িতে করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার এখন পর্যন্ত খুবই কম। জেলার ৯ উপজেলার ৮টি সরকারি ও ১টি বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার সুযোগ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩০০ বেড আছে এবং এর মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ কোভিড -১৯ চিকিৎসায় ৯৫টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৮৭ জন চিকিৎসক এবং ১১৯ জন নার্স চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) পাওয়া গেছে ৮ হাজার ৪২১টি। এরমধ্যে ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিতরণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৭৩৯টি। বাকি পিপিই চাহিদামতো মজুত আছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য ১০টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশাকরি আমরা করোনা প্রতিরোধে কাজ করতে সক্ষম হবো।

জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন প্রশাসন, স্থানীয় নেতা, ইমাম, পুরোহিত, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছে। লোকজনকে স্বাস্থ্য বিধি মানতে, মাস্ক পরতে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করছে। বিভিন্ন সময়ে একাধিক মোবাইল কোটের মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে। সময়ে সময়ে সরকার প্রদত্ত নির্দশেনা পালনে লোকজনকে বলা হচ্ছে। খাগড়াছড়ি লোকজন অনেক সচেতন বিধায় আক্রান্তের সংখ্যা কমছে বলেও মনে করেন জেলা প্রশাসক।

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ