ভারতের আসাম থেকে বানের জলে ভেসে আসা বুনো হাতিটি এখন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের যমুনার দুর্গম ছিন্নার চরে অবস্থান করছে। মঙ্গলবার সকালে বগুড়া ও জামালপুর জেলার সীমান্তপথে আসার পর বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতিটি যমুনার ছিন্নার চরে বিচরণ করতে দেখা গেছে। কখনও চরের ভুট্টা ক্ষেতে, কখনও ধান, পাট বা কাইশ্যা ক্ষেতে বিচরণ করছে। কখনও যমুনা নদীর পানিতে নেমে গা ভেজাচ্ছে। কখনও ভিড় দেখে চরবাসীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
ছিন্নার চরে হালকা বসতি ও লোকালয় থাকলেও হাতিকে এক নজর দেখতে আশেপাশের গ্রাম ও চর থেকে শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করছেন। সেই সঙ্গে মিডিয়াকর্মীরা ঢাকা, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছেন। নাটুয়ারপাড়ার মাত্র চারজন পুলিশের পক্ষে জনসাধারণের ভিড় সামাল দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে।
ভারত থেকে ভেসে আসা বুনো হাতিটি গত তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ঘুরলেও একে এখনও ধরতে পারেনি বন বিভাগ। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া ও জামালপুর হয়ে এখন সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের ওই চরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্য এ হাতি। হাতির বিষয়টি ভারত সরকারকেও জানানো হলেও, সেখান থেকে এখনও কোনও বিশেষজ্ঞ দল আসেনি।
এদিকে, মঙ্গলবার দিনভর হাতিটি শান্ত থাকলেও চরাঞ্চলের লোকজনের ক্রমাগত উত্ত্যক্তের মুখে বুধবার সকাল এটি ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে বলে জানান স্থানীয়রা। বুধবার সকালে ছীন্নাবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী মহসিনকে(১০) শুঁড়ে পেচিয়ে দূরে ছুড়ে দেয় হাতিটি। মহসিন খুব একটা আহত হয়নি বলে জানা যায়। এরপরও এ ঘটনার পর স্থানীয়রা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। যে কোনও মূহুর্তে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা। মনসুরনগর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক আজমল বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
কাজিপুর থানা পুলিশ, বন বিভাগ ও দমকল বাহিনীর লোকজন মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ছীন্নার চরে থাকলেও বুধবার সকাল থেকে নাটুয়ারপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ৪ সদস্যরা ছাড়া কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জনগণ যাতে হাতিটিকে বিরক্ত না করে এবং হাতিও যেন কারও ক্ষতি করতে না পারে, সে দিকে নজর রাখছেন বলে জানান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শামিম আহম্মেদ। ঢাকা-ঢোল, বাদ্যযন্ত্র, মশাল ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে চরাঞ্চলের লোকজনকে তারা মাইকে পরামর্শ দিচ্ছেন।
কাজিপুর উপজেলা দমকল বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার লিয়াতক আলী বলেন, হাতিটি মনসুরনগর ইউনিয়নের যমুনার দুর্গম ছিন্নার চরে। চরে হাতিটিকে ঘিরে লোকজনের ভীড় চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তবে, হাতিটি মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কারও কোনও ক্ষতি করেনি। রাতে আমরা চলে এসেছি।
কাজিপুর থানার উপ-পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম জানান, সিরাজগঞ্জ-বগুড়ার সীমান্তবর্তী একটি ছোট খাল সাঁতরে বন্যহাতিটি মঙ্গলবার সকালে কাজিপুর উপজেলার মনসুর নগর ইউনিয়নের মাজনাবাড়ি ও ছীন্নাবাড়ির চরের কাশবনে অবস্থান নেয়। চরের চারিদিকে নদী। হাতিটি চরের এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছে। দূর থেকে হাতিটি শুধু দেখছি। কিছু করতে পারছি না। কোনও কিছু করার অবস্থা নেই। হাতিটি যাতে লোকালয়ে ঢুকে লোকজন ও বাড়িঘরের কোনও ক্ষতি করতে না পারে, আমরা মূলত সেদিকে নজর রাখছি।
জেলার বন বিভাগের ইব্রাহীম খলিল জানান, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত আমরা চরে ছিলাম। হাতিটিকে বিরক্ত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারন এটা বন্যহাতি। কুড়িগ্রাম ও বগুড়া হয়ে দীর্ঘসময় পার করে সিরাজগঞ্জে পৌঁছেছে। হাতিটি কারও কোনও ক্ষতি করেনি। ওকে বিরক্ত করলে ক্ষতি করবে। এখন লোকজনকে বলা হচ্ছে যাতে কেউ বিরক্ত করা না হয়। তারপরেও চরের মানুষজন শুনছে না।
কাজিপুর থানার ওসি সুমিত কুমার কুন্ডু জানান, হাতিটি বুধবার সকালে কাজিপুর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের ছিন্নাবাড়ি এলাকার চরাঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন বুনো এই হাতিটি কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার আন্তর্জাতিক মেইন পিলার নম্বর ১০৫২-এর কাছ দিয়ে বানের জলে ভেসে বাংলাদেশে আসে। ভারতের আসাম রাজ্যের শিশুমারা পাহাড়ি এলাকা থেকে এই হাতি বাংলাদেশে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রৌমারী সীমান্ত দিয়ে আসা হাতিটি কয়েক দফা অবস্থান পরিবর্তনের পর ব্রহ্মপুত্র নদের বাগুয়ার চরের কাদায় আটকা পড়ে। সেখানে দুদিন আটকে থাকার পর নিজের চেষ্টায় মুক্ত হয়ে নয়ারচর কাশবনে যায়। পরে জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের চরে গিয়ে অবস্থান নেয়। মঙ্গলবার সিরাজগঞ্জের চরে পৌঁছে হাতিটি। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে হাতি আসা নিয়মিত ঘটনা। তবে এ হাতিটি এসেছে ভিন্নভাবে। ভারি বর্ষণে ব্রহ্মপুত্রের পানির স্রোতে কুড়িগ্রামের রৌমারী দিয়ে ঢুকে সে। এরপর গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া হয়ে সিরাজগঞ্জে এখন হাতিটি। প্রতিদিন জায়গা বদল করে যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আবার সরিষাবাড়ির দিকে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
/এইচকে/
আরও পড়ুন: বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ২০৩ কোটি টাকা!







