কয়েকদিনের টানা শৈত্যপ্রবাহে দুর্ভোগ নেমে এসেছে রাজশাহীবাসীর। তীব্র শীতের কারণে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না কেউ। অনেক খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। তবে শীতে বেশি বিপাকে পড়েছেন সহায়-সম্বলহীন হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এছাড়া শীতজনিত কারণে বাড়ছে ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা। এদের মধ্যে বৃদ্ধ ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।
মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রাজশাহী নগরীর রেলগেটে কাজ শেষে করে বাড়ি ফেরার পথে গোদাগাড়ী উপজেলার মুরালীপুর এলাকার দিন মজুর আবদুর রশিদ মিয়া বলেন, কয়েকদিন থেকে ব্যাপক ঠাণ্ডা লাগছে। ঘরের বাইরে বের হলেই শীতের প্রভাব বেশি লাগে। এমনকি ভোর ও সন্ধ্যার পর তো কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল। তারপরও ভোরে কাজের সন্ধ্যানে গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসি। কারণ সংসারের খরচ তো আর থেমে থাকবে না।
তার সঙ্গে থাকা আরেক দিনমজুর তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভোরে কুয়াশা ভেঙে শহরে এসেছি। কিন্তু প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে মালিকেরা তেমন কাজ করাচ্ছেন না। কাজ করলে কিছু টাকা আয় হয়, না করলে তো টাকা পাবো না।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মঙ্গলবার রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সর্বনিম্ন ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে রবিবার রাজশাহীতে বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৫.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে রবিবার ছিল চলতি বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।’
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আশরাফুল আলম বলেন, ‘গত কয়েকদিনে শৈত্যপ্রবাহের পর আজ দুপুরে সূর্যের দেখা মেলায় একটু হলেও মানুষ ঘর থেকে বের হয়েছে। আশা করা যায়, কয়েকদিনের মধ্যে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসবে।’
এদিকে শীতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে ছিন্নমূল মানুষ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রও পাচ্ছেন না তারা। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যে পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় কম।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফরমে থাকা ইয়াকুব আলী কোনও ত্রাণ পেয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনও ত্রাণ পাইনি।
রাজশাহী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইতোমধ্যে পুরো জেলায় ৫২ হাজার ৫০০ কম্বল শীতার্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কম্বলগুলো বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে অনেক সংস্থা গরম পোষাক বিতরণ করছে।’
এদিকে শীতের কারণে প্রতিদিন অর্ধ শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছানাউল হক মিয়া। তিনি বলেন, ‘শীতজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই সময় শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। যাতে করে শিশুরা কুয়াশার সংস্পর্শে না যায়। এছাড়া বিশুদ্ধ পানি যাতে পান করে সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত।’
শীতজনিত কারণে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের ১০, ২৪, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে শিশু ও ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ৩৬, ৩৭, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে নারী ও পুরুষ রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে। এসব ওয়ার্ডগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে।
রামেক হাপাতালের শিশু বিভাগের সহাযোগী অধ্যাপক ডা. শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘শীতে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া প্রকোপ শিশুদের বেশি।’
ডা. শাহিদা ইয়াসমিন আরও বলেন, ‘শিশুদের চিকিৎসা চলছে। এছাড়া তাদের মায়েদের বিভিন্ন পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। তারা যেন শিশুদের গরম স্থানে রাখে। নিজেদের খাবারের বিষয়েও সতর্ক থাকে।’
অপরদিকে শীতের কারণে এখন পর্যন্ত ফসলের কোনও ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক দেব দুলাল ঢালী। তিনি বলেন, ‘শীতে এখন পর্যন্ত ফসলের কোনও ক্ষতি হয়নি। তবে এরকম আবহাওয়া কয়েকদিন বিরাজ করলে বোরো বীজতলার ক্ষতি হতে পারে। এজন্য বীজতলাগুলো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়ার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’








