বগুড়ার গাবতলীর দাঁড়াইল মৌজায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে কেনা সাড়ে ৯ বিঘা জমি এখন বিএনপির স্থানীয় এক নেতার নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ মিল্টন এই জমির আয় নিজেই ভোগ করছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযোগ করছেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তারেক রহমানের নির্দেশে মোরশেদ মিল্টন জমি নিলেও অনেককে টাকা দেননি। হয়রানির ভয়ে জমির মালিকরাও দলিল করে দিয়েছেন। তবে বিএনপি নেতা মিল্টন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে নেওয়া ওইসব জমির মালিককে প্রকৃত মূল্য দেওয়া হয়েছে। কাউকে হুমকি দিয়ে বা ফ্রি নেওয়া হয়নি।’
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পূর্বে গাবতলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের তরফসরতাজ গ্রামের দাঁড়াইল মৌজায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে প্রায় ৯ বিঘা জমির ওপর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। সেখানে কোনও জমি পতিত, আবার কোনোটিতে চাষাবাদ করা হয়েছে বা চাষের প্রস্তুতি চলছে। ১৫ ব্যক্তির কাছ থেকে এই জমি কেনা হয়। জমির দলিল করা হয়েছে ১৭টি। সম্প্রতি সেখানে সাইনবোর্ড লাগনো হয়েছে।
এ জমি গাবতলী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোরশেদ মিল্টনের তত্ত্বাবধানে আছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই জমি লিজ দিয়ে সে টাকা দলীয় কাজে ও গাবতলী শহীদ জিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ব্যয় করেন। গাবতলী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন খাঁন ও কয়েকজন জমিদাতা এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
জমিদাতা তরফসরতাজ গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক মুসা আলম জানান, তিনি ৪৭ হাজার টাকায় ৩২ শতক জমি কিনেছিলেন। তবে ’৯৩ সালে গাবতলীর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এক পুলিশ কর্মকর্তা ও চৌকিদার বাড়িতে এসে ওই জমি দলিল করে দেওয়োর জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। রাজি না হলে জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো হয়। বাধ্য হয়ে জমি দিতে রাজি হন। ওই সময় প্রতি শতকের দাম দেওয়া হয় এক হাজার টাকা করে।
তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমান দেশে থাকার সময় জমিগুলো আমিই চাষাবাদ করতাম। তারেক রহমান দেশের বাইরে যাওয়ার পর বিএনপি নেতারা ওইসব জমি লিজ দিয়ে খাচ্ছে।’ তরফসরতাজ হিন্দুপাড়ার লক্ষ্মী সরকার জানান, গ্রামের রবীন্দ্রনাথ, রুক্ষুনী, শংকরী বালা, মুসা আলম, নিজাম উদ্দিনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে এতিমখানার নামে সাড়ে ৯ বিঘা জমি নেওয়া হয়েছে। প্রতি শতকের মূল্য দেওয়া হয়েছে এক হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি শতক জমির দাম ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। জমি নেওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ, রুক্ষুনী, শংকরী বালা ভারতে চলে গেছেন।
জমি বিক্রেতা নিজাম উদ্দিন মাস্টার জানান, ‘বিএনপি নেতারা এসে বলে এখানে এতিমখানা হবে। যারা জমি দেবে তাদের সন্তানদের চাকরি দেওয়া হবে। আমি রুক্ষুনীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকায় ৮ শতক জমি কিনেছিলাম। সেই জমি এক হাজার টাকা শতক হিসেবে দলিল করে দিয়েছি।
জমি কেনার আগেই সেখানে ডিসি, এসপি, ইউএনও, ভূমি অফিসের লোকজন এবং ঢাকা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসেন। জমি দিলাম জিয়া এতিমখানার নামে। পরে শুনলাম সেটা তারেক রহমানের নামে দলিল হয়েছে। জমি দলিল করে দেওয়ার পর সন্তানদের চাকরি দেওয়ার নামে বিএনপি নেতারা সবার কাছ থেকে টাকা নেয়। আমাদের বলা হয়েছিল সন্তানদের চাকরির জন্য তারেক রহমানের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। পরবর্তীতে আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।’
গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ আজম খান বলেন, ‘গাবতলী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মোরশেদ মিল্টন তাদের নেতার (তারেক রহমান) নির্দেশে এতিমখানার নামে ৯ বিঘার বেশি জমি কেনেন। কিন্তু তারা অনেককে টাকা না দিলেও দলিল করে নিয়েছেন। আজও সেখানে এতিমখানা নির্মাণ করা হয়নি। এর ওপর বিএনপি নেতারাই এগুলো ইজারা দিয়ে লাভ খাচ্ছেন।’
তবে বিএনপি নেতা মোরশেদ মিল্টন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তারেক রহমানের নির্দেশে ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে প্রতি শতক ১ হাজার ২০০ টাকা হিসাবে সব জমিদাতাকে দেওয়া হয়েছে। তখন জমির বাজার দর আরও কম ছিল। কারও কাছে টাকা ছাড়া জমি নেওয়া হয়নি।’
লিজ দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জমিগুলো আমার তত্ত্বাবধানে থাকলেও সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন দেখভাল ও চাষাবাদ করতেন। তার মৃত্যুর পর তার ভাই ইউনিয়ন যুবদল নেতা এরশাদ ও ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আবদুল গফুর চাষাবাদ ও দেখভাল করেন। এরা গরিব নেতা হওয়ায় তাদের চাষাবাদ করতে দেওয়া হয়েছে। জমি আছে। টাকাগুলোও প্রাইম ব্যাংকে এফডিআর করা আছে। কিন্তু খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান সময়ের অভাবে এতিমখানার কাজ শুরু করতে পারেননি।’








