রাজশাহীতে দুই শিশু নির্যাতন: দুর্বল মামলায় ৮ আসামি জামিনে

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৯:৪১আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৯:৪১

রাজশাহীতে নির্যাতিত দুই শিশু রাজশাহীর পবা উপজেলায় দুই শিশুকে নির্যাতনের ঘটনায় বৃহস্পতিবার আরও তিন আসামি জামিন পেয়েছেন। এ নিয়ে এই মামলার ১৩ আসামির মধ্যে আটজনই জামিনে ছাড়া পেলেন। এদিকে, একের পর এক আসামি জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
আলোচিত এ মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট দিল সেতারা চুনি জানান, প্রকৃত ঘটনা হলো শিশু জাহিদকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে এবং আটক করে মারধর করা হয়েছে। এখানে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। দণ্ডবিধির ৩৬৪ ধারায় অপহরণের শাস্তি বিধান করা আছে। এক্ষেত্রে আসামি দোষী প্রমাণিত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ৩৬৪ ধারায় মামলা করা হলে ঠিক হতো। এই ধারাটি জামিনযোগ্য নয়। কাজেই আসামিরা দ্রুত জামিনও পেতেন না। যেহেতু তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করা হয়েছে কাজেই ৩০৭ ধারাও এখানে আসতে পারে। কারণ এই ধারায় হত্যার উদ্দেশ্যে মারধরের শাস্তির বিধান বলা আছে।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার জন্য ৩৬৪ ধারায় মামলা না করে ৩০৭ ও ৩২৩ ধারায় মামলা করা হয়েছে। কিন্তু দণ্ডবিধির ৩০৭ ও ৩২৩ ধারা পরস্পরবিরোধী। এই দুই ধারা একটি মামলায় একসঙ্গে কোনওভাবেই যেতে পারে না। ৩২৩ ধারায় হালকা মারধরের বিষয়ে শাস্তির বিধান আছে। এ ধারা অনুযায়ী আঘাত প্রদানকারী ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করা হলে সেটা কোনওভাবেই ৩২৩ ধারায় আসার কথা না।
এদিকে, ৩৬৪ ধারায় মামলা রেকর্ড না করায় মামলার বাদীকে দুষলেন পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাদীর অভিযোগের ভিত্তিতে ১৪৩, ৩৪১ (ঘরের ভিতর আটক), ৩২৩ (আঘাত), ৩০৭ (হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর) ও ৫০৬ (ভয়ভীতি) ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযোগে অপহরণের কথা উল্লেখ না থাকায় ৩৬৪ ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়নি। কারণ কাউকে অপহরণ করে নিয়ে গেলে ভিডিও ধারণ করতে পারতো না। কেউ জানতেও পারবে না। বাদী অপহরণের কথা বলেনি। তাই আমি বাদীর বাইরে যেতে পারিনি।

তবে বাদী ইমরান বলেন, আমি লেখাপড়া জানি না। আমার ও আমার ছেলের মুখ থেকে শুনে পুলিশের একজন কম্পিউটারে লিখেছিলেন। পরে ওই লেখার (এজাহার) নিচে তিনি আমার স্বাক্ষর নেন। কিন্তু মামলায় আসামি জামিন পেয়ে যাওয়ায় আইনজীবীদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, আপনার বক্তব্য লিখিত অভিযোগে উঠে আসেনি। পুলিশদের কারসাজিতে মামলাটি দুর্বল হয়ে গেছে। এজাহারে আমার বক্তব্যের সম্পূর্ণটুকু উঠে আসেনি।

বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী রাশেদ উন নবী আহসান বলেন, দুর্বল ধারায় মামলা রেকর্ডের বিষয়ে বাদীপক্ষের এখন তেমন কিছু করার নেই। এখানে তদন্তকারী কর্মকর্তা চাইলে এই মামলার সঙ্গে ৩৬৪, ৩৬৫, ৩২৪ ধারা সংযুক্ত করে একটি আবেদন করতে পারেন। যা মামলার সঙ্গে নথিভুক্ত থাকবে। এটা কার্যকর হবে চার্জশিট দাখিলের পর। তবে পুলিশের মধ্যে সেই সদিচ্ছা আছে বলে মনে হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বাদীপক্ষের নারাজি দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ মামলার এজাহার পুলিশই লেখুক আর অন্যকেউ লিখে দিক, সেখানে বাদীর স্বাক্ষর রয়েছে। শিশু জাহিদকে রাস্তায় অটোরিকশা থামিয়ে তুলে নিয়ে আসার যে ঘটনা ঘটেছে তা অপহরণের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মামলার এজাহারে তার উল্লেখ নেই। যে কারণে আমরা ডিফেন্ড করতে পারছি না।

আরও তিন আসামির জামিন: বৃহস্পতিবার দুপুরে আরও তিন আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের (শিশু) বিচারক হায়দার আলী খন্দকার। তারা হলেন, আব্দুর রাজ্জাক, পলাশ ও অনিক। তারা এ মামলার ৩, ৪ ও ১১ নম্বর আসামি।

দোষীদের শাস্তি দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত: কিশোর নির্যাতনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারও উত্তাল ছিল পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া। এ দিন সকালে এলাকাবাসী পবার করমকজা এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

আতঙ্কে শিশুটির পরিবার: শিশু জাহিদের বাবা ও মামলার বাদী ইমরান বলেন, আসামিদের অব্যাহত হুমকির মুখে তিনি এবং তার ছেলেসহ গোটা পরিবার রয়েছেন চরম আতঙ্কে। তারা বাড়িতেও যেতে পারছেন না। অথচ একের পর এক আসামি জামিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে তারা আরও হুমকির মুখে পড়ছেন।

এদিকে, জাহিদ ও ইমনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে তাদেরকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া: রাজশাহীর মানবাধিকার কর্মী এহেসানুল হক ইমন বলেন, শিশু নির্যাতনের ঘটনাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। পুলিশ, আইনজীবী এমনকি বিচার ব্যবস্থাও এ ব্যাপারটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বলে মনে হচ্ছে না। ফলে শিশু নির্যাতন বন্ধ করা যাচ্ছে না। এদিকে, এ মামলায় একের পর এক আসামির জামিন পাওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক। এতে করে অন্যরাও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় উৎসাহিত হতে পারেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, সম্প্রতি দেশে নতুন করে শিশু নির্যাতন বাড়ছে। এর জন্য আলাদাভাবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন দরকার। যেখানে সুষ্পষ্টভাবে ধারা ও দণ্ড উল্লেখ থাকবে।

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্লাস্টের রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর আমরা সংগ্রহ করছি। সেইসঙ্গে মামলার বিচারিক কার্যক্রমও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তথ্য অনুসন্ধান করে বাদীপক্ষকে আইনি সহযোগিতা দেওয়া হবে। যাতে পরবর্তীতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে।

প্রসঙ্গত, মোবাইল চুরির অভিযোগে শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জাহিদ হাসান (১৫) ও ইমন (১৩) নামের দুই শিশুকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে রশি দিয়ে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এ ঘটনায় শনিবার রাতে জাহিদ হাসানের বাবা ইমরান আলী পবা থানায় এক সেনা ও পুলিশ সদস্যসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

/বিটি/এএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
বজ্রনিনাদে ভারতে বর্ষার প্রবেশ, কেরালাজুড়ে হচ্ছে ভারি বৃষ্টি
বজ্রনিনাদে ভারতে বর্ষার প্রবেশ, কেরালাজুড়ে হচ্ছে ভারি বৃষ্টি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান