বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বগুড়ায় প্রথম জুলাই শহীদ সিয়াম হোসেন শুভর পালক মা শাপলা বেগমকে (৪৫) মাদকসহ গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে শহরের চকসুত্রাপুর হাড্ডিপট্টি বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ৫০ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও ৩০ গ্রাম হেরোইনসহ তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী। তিনি বলেন, ‘৫০ পিস টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও ৩০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেফতার করা হয়েছে।’
শাপলা বেগম বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুর হাড্ডিপট্টি এলাকার বাসচালক মো. আশিকের স্ত্রী। জুলাই আন্দোলনে বগুড়ায় প্রথম শহীদ সিয়াম শুভর পালিত মা তিনি।
পুলিশের দাবি, সিয়াম শুভর পালিত মা শাপলা বেগম ‘মাদক ব্যবসায়ী’। তার বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে ১৬টি মামলা রয়েছে। মাদকসহ গ্রেফতার হয়ে বেশ কয়েকবার কারাভোগ করেছেন। তবু জুলাই শহীদের মা হওয়ায় সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। এরপরও মাদক ব্যবসা ছাড়েননি শাপলা বেগম।
মাদক কেনাবেচার খবর পেয়ে সোমবার সকালে শহরের চকসুত্রাপুর হাড্ডিপট্টি বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে শাপলা বেগমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তার কাছে ৫০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও ৩০ গ্রাম হেরোইন পাওয়া যায়। এ ছাড়া গত বছরের ১৪ আগস্ট রাতে শাজাহানপুর থানায় একটি চুরির মামলার আসামি রনিকে গ্রেফতারের জন্য চকসুত্রাপুর এলাকায় অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। রনিকে গ্রেফতারের সময় শাপলা বেগম ও তার স্বামী আশিকের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত লাঠি, রড এবং বঁটিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ডিবি পুলিশের ওপর হামলা চালান। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছিলেন। এ সময় পুলিশ শাপলা বেগমকে গ্রেফতার করেছিল। পরবর্তীতে তিনি জামিনে ছাড়া পেয়েছেন।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাপলা বেগম মাদক ব্যবসায়ী। তার মাদক বিক্রির কারণে অতিষ্ঠ এলাকার লোকজন। গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। বিকালে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দেশজুড়ে ছিল কারফিউ। ওই দিন থমথমে ছিল বগুড়া শহর। একদিন আগে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের কয়েক শ রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনায় উত্তাল ছিল গোটা শহর। গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন অর্ধশত মানুষ। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে মানুষ।
গুলি-হামলার প্রতিবাদে দুপুরের পর কারফিউ ভেঙে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন তারা। বিকাল ৩টার দিকে শহরের সাতমাথা-তিনমাথা সড়কের সেউজগাড়ি আমতলা মোড়ে ছাত্র ও লোকজন টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
ওই দিন বিকাল ৫টার দিকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল এবং শটগানের গুলিবর্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষ আর পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে ঘণ্টাব্যাপী। ওই সময় গুলিবিদ্ধ হয় অনাথ সিয়াম শুভ (১৬)। এলোপাতাড়ি ছোড়া ছররা গুলিতে ঘটনাস্থলেই সে নিহত হয়। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।
জুলাই আন্দোলনে বগুড়ায় শহীদ হন ১৬ জন। এর মধ্যে প্রথম শহীদ সিয়াম শুভ। সিয়াম বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি এলাকার বাসচালক মো. আশিক ও শাপলা বেগমের পালিত সন্তান। সিয়ামের জন্ম বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার হাটকড়ই এলাকার দরিয়াপুর গ্রামে। তার বাবা বাবু মিয়া এবং মা আয়েশা বেগম কেউ বেঁচে নেই। সাত বছর বয়সে বগুড়া শহরে এসে হারিয়ে যায় সিয়াম। এরপর রেলস্টেশন এলাকায় শিশুটিকে কুড়িয়ে পান হাড্ডিপট্টি এলাকার শাপলা বেগম। শাপলা-আশিক দম্পতির ঘরেই বেড়ে ওঠে সিয়াম। বাবা আশিকের সঙ্গে কখনও কখনও বাসচালকের সহকারীর কাজ করতো।
১৯ জুলাই কারফিউ জারির কারণে বাস বন্ধ ছিল। ঘরে চাল না থাকায় হাড্ডিপট্টি এলাকার একটি ভাঙাড়ির দোকানে কাজ করতে যায় সিয়াম। ফাঁক দিয়ে বাড়িতে এসে চলে যায় মিছিলে। এরপর শহরের স্টেশন সড়কের সেউজগাড়ি পালপাড়া মন্দির এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়। ছররা গুলিতে ঝাঁজরা হয় তার মাথা, চোখ,মুখ, বুক, পেট, ঊরু, হাঁটুসহ গোটা শরীর। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ ও মৃত অবস্থায় সিয়ামকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরে সিয়ামকে বগুড়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার।









