অর্থ উত্তলোনসহ গুরুতর অভিযোগে সোনালী ব্যাংকের ৫ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই জন শাখা ব্যবস্থাপকের দেশ ত্যাগ আটকাতে ইমিগ্রেশন বিভাগ ও স্থল বন্দরে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়। অভিযুক্ত এসব কর্মকর্তা নাটোর জেলার বিভিন্ন শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তারা সবাই প্রিন্সিপাল পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ব্যাংকটির জেনারেল ম্যানেজার (ইনচার্জ) শওকত জামান স্বাক্ষরিত পৃথক পাঁচটি পত্রে নাটোরের বড়াইগ্রাম শাখার ব্যবস্থাপক হাফিজুর রহমান, নাটোর শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মনিরুজ্জামান, নাটোর শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রোকনুজ্জামান, নওগাঁ শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার লিটন কুমার ও নওগাঁর টিটিডিসি শাখার ব্যবস্থাপক বিপুল কুমার পালকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া পৃথক আরও একটি পত্রে লিটন কুমার ও বিপুল কুমারের দেশত্যাগ বন্ধে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্তের এসব চিঠি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পাঁচটি পত্রে ১২টি পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছে ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ উত্তোলন, ভুয়া ও ভিত্তিহীন ঋণ প্রদান এবং অধিক হারে আমানত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। মূলত সোনালী ব্যাংক পিএলসি নাটোর শহরের বাসস্ট্যান্ড শাখা, স্টেশন বাজার শাখা, গুরুদাসপুর ও চাঁচকৈড় এই চারটি শাখায় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা করে বেশ কিছু অসঙ্গতি পেয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন নাটোর ও নওগাঁর প্রধান শাখাকে গত ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর চিঠি মাধ্যমে বরখাস্তের ওই আদেশ দেওয়া হয়। তবে সোমবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বিষয়টি প্রকাশ হতে থাকে।
কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় ওই পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নানা ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায়। ওই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে পৃথকভাবে অভিযোগের বর্ণনা করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, বিপুল কুমার পালের বিরুদ্ধে ব্যাংকের বিধি বহির্ভূতভাবে ভাউচারবিহীন লেনদেন, সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক বিধি অমান্য করে অ্যাকাউন্ট থেকে গ্রাহকের অগোচরে স্ট্যাম্প খরচের নামে টাকা কর্তন এবং সিবিএস সফটওয়্যারে অননুমোদিত ট্রানজেকশন করার মতো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩৬.৯৭ টাকা আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে।
নাটোর পুরাতন বাসস্ট্যান্ড শাখায় কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। সবশেষ তিনি নওগাঁয় ব্যবস্থাপক হিসেবে টিটিডিসি শাখায় কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত করে বিপুল কুমারকে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার লিটন কুমার নাটোর পুরাতন বাসস্ট্যান্ড শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় অবৈধ উদ্দেশে ব্যাংকবিধি বহির্ভূতভাবে উইন্ডো ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া ঋণ, আমানত বৃদ্ধি দেখানো, ব্যক্তিগত ঋণ বিতরণে জালিয়াতির মাধ্যমে অনিয়ম, ব্যাংক বিধি বহির্ভূতভাবে ডাউটফুল অ্যাকাউন্ট ও সিসির মাধ্যমে একাধিক ঋণ বিতরণে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৯২ লাখ ৭ হাজার ৭৬৯.৪৮ টাকা আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এই কর্মকর্তা সবশেষ প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে নওগাঁয় কর্মরত ছিলেন। তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করে নিয়ন্ত্রণকারী কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিপুল কুমার ও লিটন কুমার দাসকে সোনালী ব্যাংক পিএলসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০২২ এর ৩৯(১) ও ৪৭(১) বিধি অনুযায়ী সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার পাশাপাশি দেশত্যাগ বন্ধে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।
এ ছাড়া নাটোর প্রিন্সিপাল অফিসের সিনিয়র প্রিন্সিপাল কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যাংকবিধি বহির্ভূতভাবে উইন্ডো ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া ঋণ ও আমানত বৃদ্ধি দেখানো, সত্য গোপন করে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ এবং ব্যাংকের স্বার্থ পরিপন্থি কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি ভুয়া ঋণ ও আমানতের ৪০ লাখ ৩৬ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। এই কর্মকর্তা সবশেষ নাটোর স্টেশন বাজার শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাকেও প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
নাটোর শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার মনিরুজ্জামান গুরুদাসপুর শাখায় ব্যপস্থাপক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ব্যাংকবিধি বহির্ভূতভাবে উইন্ডো ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া ঋণ ও আমানত বৃদ্ধি দেখানো এবং নানাবিধ অনিয়ম, জালিয়াতি সৃষ্টি করে ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৭৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগে এই কর্মকর্তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বড়াইগ্রামের শাখা ব্যবস্থাপক হাফিজুর রহমান পাবনার চাটমোহর শাখায় কর্মরত থাকাকালীন ব্যাংকবিধি বহির্ভূতভাবে উইন্ডো ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে ভুয়া ঋণ, আমানত বৃদ্ধি দেখানো এবং নানাবিধ অনিয়ম ও জালিয়াতি সৃষ্টি করে ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অপরাধ রয়েছে। ভুয়া ঋণ ও আমানত প্রদর্শনের পরিমাণ ছিল দুই কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তাকেও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে লিটন কুমার ও মনিরুজ্জামান নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি লেখা পোস্ট করেছেন।
ওই পোস্টে দুই ব্যক্তি একই বাক্য ব্যবহার করেছেন। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘প্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষী, সম্প্রতি কিছু চক্রান্তকারীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। দয়া করে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। সত্যের জয় হবেই একদিন। সবাই আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন।’
সোনালী ব্যাংকের নাটোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের এজিএম (ইনচার্জ) আহসান রেজা বলেন, ‘আত্মসাৎ ও জালিয়াতির দায়ে পাঁচ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই জনকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটি সঠিক।’ তবে তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চান না।