রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, সারের ডিলার নিয়োগ দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহী নগরের অলকার মোড়ের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন দলের নেতাকর্মীরা। তারা এসব অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলামের প্রত্যাহার চেয়েছেন।
‘রাজশাহী-৫ আসনের ভুক্তভোগী বিএনপির নেতাকর্মী’-এর ব্যানারে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে পুঠিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার সরকার আল-আমীন, উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নবী ও সাবেক ছাত্রনেতা আহসান হাবিব বক্তব্য দেন। তারা সংসদ সদস্যের নির্দেশে ‘মিথ্যা’ মামলা রেকর্ড করায় পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলামের প্রত্যাহার দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার সরকার আল-আমীন বলেন, সম্প্রতি সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তার সঙ্গে পুঠিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পল্লব সেনগুপ্ত ও আওয়ামী লীগকর্মী মাজহারুল ইসলাম মিন্টুও ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীরা হতাশ হয়েছেন। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছিল। পাশাপাশি সংসদ সদস্য পুঠিয়া-দুর্গাপুরের বেশির ভাগ সরকারি পুকুর আওয়ামী লীগের একজন অর্থদাতাকে দিয়ে চাষ করাচ্ছেন। টাকার বিনিময়ে তিনি ‘ফ্যাসিবাদ ও রাজাকার ঘরানার লোকদের’ ডিলার নিয়োগ দিতে সাহায্য করেছেন। সংসদ সদস্যের সুপারিশে ভাল্লুকগাছি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন শফিউল ইসলাম। তিনি জামায়াতের রাজনীতি করেন। সংসদ সদস্য নিজের প্যাডে কয়েকজনের নাম প্রথম দিকে রেখে ডিলারশিপের জন্য সুপারিশ করেছেন। পুঠিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতা রিশাদ হোসেন কেতাব সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। পুঠিয়া পৌরসভা এলাকায় ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের নাতনি জামাই শাহেদ হাসান, যার বাড়ি ময়মনসিংহে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, এলাকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নজরুল ইসলাম মণ্ডল তার পরিবারের সদস্য, ফ্যাসিবাদের দোসর কিংবা জামায়াতের কাউকে সভাপতি ও সদস্য মনোনীত করেছেন। বিভিন্ন সরকারি ও দলীয় অনুদান, ঈদের সময়ের বিশেষ বরাদ্দ এবং উন্নয়নকাজের থোকবরাদ্দগুলো তিনি কোথায় কীভাবে খরচ করেন, তা দৃশ্যমান নয়। এ বিষয়ে প্রশ্ন করায় দুর্গাপুর পৌর ছাত্রদল ও যুবদলের চারজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
দেলোয়ার সরকার আল-আমীন আরও বলেন, সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও আওয়ামী লীগপ্রীতি নিয়ে কথা বললেই মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের কেউ ফেসবুকে এ বিষয়ে মন্তব্য করলেও তাকে মামলায় জড়ানো হচ্ছে। গত ১৩ আগস্ট বিড়ালদহ পশ্চিমপাড়া গ্রামের একটি পারিবারিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাকেসহ বিএনপির নয়জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অথচ ওই ঘটনার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। সংসদ সদস্যের কথায় তাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলাটি করা হয়েছে।
তিনি সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করেন, গত ১১ অক্টোবর চারজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা হয়েছে। এসব মামলার পেছনে সংসদ সদস্যের চাপ রয়েছে এবং পুঠিয়া থানার ওসি সহযোগিতা করেছেন। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কসহ কয়েকজন নেতা ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সংসদ সদস্যের চাপে মামলা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বানেশ্বর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নবী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচনের আগে পুঠিয়া-দুর্গাপুরে নজরুল ইসলাম মণ্ডল ছাড়াও আরও অনেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। যারা নজরুল ইসলাম মণ্ডলের পক্ষে ছিলেন না, তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। আর পুনর্বাসন করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের।
সাবেক ছাত্রনেতা আহসান হাবিব বলেন, রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিব খান সংসদ সদস্যের ভাতিজা আজাদ মণ্ডলের জামাতা। হাবিব খান শ্বশুরবাড়িতে থেকে সরকার পতনের হুংকার দিচ্ছেন। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য কী পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা জানতে চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে আমাকেও মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগের তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিএনপির নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং পুঠিয়া থানার ওসি ফরিদুল ইসলামের প্রত্যাহার দাবি করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘যারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তারা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভোট করেননি। তারা দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন করেছেন। তখন থেকেই তারা তার বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং করেছেন। এখনও সেই কাজই করে বেড়াচ্ছেন।’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে সাক্ষাৎ করানোর প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘তারা শিক্ষক হিসেবে গেছেন, কোনও দলীয় পরিচয়ে যাননি।’
সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াই মামলা করানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো কারও বিরুদ্ধে মামলা করিনি। ফেসবুকে পোস্ট দেখে কেউ আঘাত পেয়ে মামলা করতেই পারে। এ ব্যাপারে আমি অবগত নই আর ওসিকেও কিছু বলিনি।’