সাঁওতাল পল্লীতে আগুন

পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল হওয়ায় স্বস্তিতে সাঁওতালরা, বিচার দাবি

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা
৩১ জানুয়ারি ২০১৭, ১৯:৫৯আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৭, ২০:০৭

গাইবান্ধায় সাঁওতাল পল্লী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন হাইকোর্টে। ঘটনার সময় সাঁওতাল পল্লীর ঘর-বাড়ি ও মালামাল পুলিশ ও মিল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে বলে সাঁওতালরা প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিলেন। অবশেষে দাখিল করা প্রতিবেদনে পুলিশকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পেয়ে সাঁওতালদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তারা জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার কার্যকর ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এর আগে, হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির সদস্য গাইবান্ধা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল্লাহ কয়েক দফায় সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার এলাকায় গিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করেন। এসময় ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, স্থানীয়দের বক্তব্য, ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের বক্তব্য, দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা, মিল কর্তৃপক্ষ-কর্মচারী, ইউপি চেয়ারম্যান ও সংবাদকর্মীদের জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে রবিবার বিকালে হাইকোর্টে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা গাইবান্ধা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল্লাহ। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লী

সাঁওতাল পল্লীর ত্রাণ কমিটির সভাপতি বার্নাবাস বলেন, ‘ঘটনার দিন ৬ নভেম্বর বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুলিশ ও মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে তারা সাঁওতালদের প্রতিটি ঘর-বাড়ি ও ঘরের মালামাল আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালরা আগুনের ঘটনায় পুলিশ ও মিল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে। কিন্তু পুলিশ ও মিল কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। এ কারণে পুলিশ ও মিল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েও সম্ভব হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত টিম ঘটনাস্থলে এসে তদন্ত কার্যক্রম চালান। তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশকে দায়ী করা হয়েছে। এই খবর পেয়ে অনেক শাস্তি পেয়েছি। স্বস্তি ফিরেছে সাঁওতাল পল্লীতে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন অনুয়ায়ী উচ্চ আদালত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন এটাই দাবি জানাই।’ গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লী

সাঁওতাল টাটু টুডু বলেন, ‘হামলা ও উচ্ছেদের পর ঘর-বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তখন থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাদারপুর গির্জার সামনে খোলা আকাশের নিচে খেয়ে না খেয়ে অবস্থান করছি। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের খবর শুনে অনেক ভালো লাগছে, একটু হলেও কষ্ট কমছে। তবে হামলা ও আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে সবোর্চ্চ শাস্তির দাবি জানাই।’

মাদারপুর গির্জার সদস্য পলুস মাস্টার বলেন, ‘বাপ-দাদার জমিতে বসত গড়ে তুলেছিলো সাঁওতালরা। কিন্তু হামলা ও আগুন দিয়ে তা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাপ-দাদার জমি উদ্ধার ও আগুন-হামলার সঙ্গে জড়িতদের এখনও কোনও বিচার হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা শুনে স্বস্তি পেয়েছি। পুলিশ ও মিল কর্মকতা-কর্মচারীরা হামলা ও আগুন দিয়েছিল। এখন তাদের শাস্তি হোক এটাই চাওয়া।’

ভূমি উদ্ধার কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান বলেন, ‘ঘটনার দিন গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশসহ বিভিন্ন থানা থেকে কমপক্ষে এক হাজারের বেশি পুলিশ হামলা-আগুনে অংশ নেয়। এর মধ্যে পুলিশের ১৫-২০ জন ও মিলের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আগুন দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ও মিল কর্তৃপক্ষের কারা কারা অংশ নেয় তাদের চিনতে পারিনি। তদন্ত চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পুলিশ ও মিল কর্তৃপক্ষের আগুন দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলেছি। তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশকে দায়ীর বিষয়টি সঠিক হয়েছে। এ জন্য অনেক শান্তি পেয়েছি। তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থাসহ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের বাপ-দাদার জমি ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকার ব্যবস্থা নেবেন বলে দাবি জানাই।’

অপর সাঁওতাল আমেনা হেমরন, ধিরেন মুরমু ও সরনী কিসকো বলেন, ‘প্রতিবেদন তো দিয়েছে। এখন জড়িতদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমরা আগুন ও হামলাকারীদের বিচার দেখতে চাই। ঘটনার পর থেকে আজও খোলা আকাশের নিচে খেয়ে না খেয়ে আছি। কিন্তু তাতে দুঃখ নেই। শান্তি পাবো আমাদের ঘর-বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া অপরাধীদের বিচার দেখতে পেলে।’ গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লী

তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশকে দায়ী করা হয়েছে এমন বিষয় জানতে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপারসহ পুলিশ কর্মকর্তারাও বক্তব্য দিতে চাননি।

প্রসঙ্গত ১৯৬২ সালে বেশ কয়েকটি গ্রামের সাঁওতাল ও বাঙালিদের কাছ থেকে ১৮৪২.৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। সেই জমিতে ইক্ষু খামার গড়ে তোলা হয়। কিছুদিন জমিতে আখ চাষ করলেও পরবর্তীতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে জমি লিজ দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ। ফলে আখ চাষের পরিবর্তে জমিতে ধান ও তামাক চাষ করা হতো। পরে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে জমি ফিরে পেতে আন্দোলনে নামে আধিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। গত ১ জুলাই সাঁওতালরা একত্রিত হয়ে জমি দখলে নিয়ে ঘর নির্মাণ, ধান, পাট, ডাল ও সরিষা চাষ করে।

গত ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের আখ কাটাকে কেন্দ্র করে খামারের জমি দখলকারী আদিবাসী সাঁওতালদের সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারী ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এ সময় সাঁওতালদের ছোড়া তীর-ধনুকের আঘাতে ৯ পুলিশ তীরবিদ্ধসহ উভয়পক্ষের ৩০ জন আহত হয়। পরে তিন সাঁওতাল নিহত হন।

এরপর বিকালে তাদের উচ্ছেদ করে ঘরে আগুন দেওয়া হয় এবং লুটপাট করা হয় জমির ফসল। এছাড়া সাঁওতালদের উচ্ছেদের পর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ট্রাক্টর দিয়ে ধ্বংসস্তুপ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় ও চারপাশ তারকাঁটার বেড়া দিয়ে আখ রোপন করে।

এঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত সাড়ে ৩শ’ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। ঘটনার ১১ দিন পর ১৬ নভেম্বর গভীর রাতে সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মরমুর বাদি হয়ে পাঁচ থেকে ছয়শ জনকে অজ্ঞাত পরিচয় আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন।

এরপর ২০ দিন পর ক্ষতিগ্রস্থ সাঁওতালদের পক্ষে সাপমারা ইউনিয়নের হরিণমারী নতুন পল্লী গ্রামের মঙ্গল হেমরমের ছেলে থোমাস হেমব্রন বাদী হয়ে সংসদ সদস্য, ইউএনও, ইউপি চেয়ারম্যান, চিনিকলের এমডিসহ অজ্ঞাতনামা ৫০০/৬০০ জনকে আসামি দেখিয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় এজাহার দায়ের করেন। মামলার এজাহারটি সাধারণ ডায়েরি করে পূর্বের মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

/এফএস/

আরও পড়ুন- 


বিশেষ আনসার: প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশায় ১৭ বছর পার

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এক দিনেই ৭০০ তিমি ও ডলফিন হত্যা
এক দিনেই ৭০০ তিমি ও ডলফিন হত্যা
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান