পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল। বুধবার (৮ মার্চ) বিকালে জেলার আহমদনগর ও শালশিরি এলাকায় তারা পরিদর্শনে যান।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন প্রতিনিধি দলের প্রধান কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দীন আহমেদ বীর বিক্রম।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ১৭৯টি বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, শতাধিক আহত হয়েছেন। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে জনমনে তার স্পষ্ট ধারণা আছে।
সরকারি অনুমতি নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের বাৎসরিক জলসার আয়োজন করেছিল উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, ‘যখন আক্রমণ করা হয়, বাড়িঘর পোড়ানো হয়, বারবার প্রশাসনকে ফোন করলেও তারা এগিয়ে আসেনি। বরং পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম দৃশ্য অবলোকন করছে। তিনঘণ্টা পর ডিসি এসপি এসে দুষ্কৃতকারীদের খানিকটা প্রতিরোধ করেছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব আলামত দেখে আমাদের মনে হয়েছে, এর মূল কারণ দেশে গণতন্ত্র নাই, আইনের শাসন নাই, গণমানুষের কোনও অধিকার নাই।’
তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘দেরিতে হলেও এই সরকার একটি বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি করে ঘটনার কারণ উদঘাটিত করবে এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনবে, এটা আমরা আশা করি।’
সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বিএনপি-জামায়াত এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশে সাইক্লোন হলেও বিএনপির ওপর দায় চাপায় সরকার।’
প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ, দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, জেলা বিএনপির নেতা ফরহাদ হোসেন আজাদ, সাবেক মেয়র তৌহিদুল ইসলাম, আখতারুজ্জামান শাহজাহান, অ্যাডভোকেট মির্জা নাজমুল ইসলাম কাজল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রতিনিধি দলটি আহমদনগর ও শালশিরি এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান। সেখানে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। কারা কীভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সহিংসতার বর্ণনা তাদের মুখ থেকে শোনেন।
পরে নেতাকর্মীরা স্থানীয় জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষে নিহত আরিফুজ্জামান আরিফের বাসায় যান। সেখানে তারা তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
এর আগে দুপুরে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজাহারুল হক প্রধান আহমদিয়া মুসলিম জামাতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। আহমদিয়া মুসলিম জামাতের আহমদ তফশির চৌধুরী, মাহমুদ হাসান সুমন, ইমাম সালাহউদ্দিনসহ ক্ষতিগ্রস্তদের কথা শোনেন। এসময় তার সাথে আওয়ামী লীগ নেতা আবু তোয়বুর রহমান, পৌরসভার মেয়র জাকিয়া খাতুন, মকলেছার রহমান মিন্টু, বিপেন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ সভাপতি আবু মো. নোমান হাসান প্রমুখ নেতা উপস্থিত ছিলেন। পরে এমপি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের মাঝে একটি করে শাড়ি, লুঙ্গি ও কম্বল বিতরণ করেন।
আহমাদিয়া মুসলিম জামাতের গণসংযোগ ও প্রেস বিভাগের প্রধান আহমদ তফশির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কারও সাহায্য সহযোগিতা চাই না। আমরা শুধু নিরাপদে বসবাস করতে চাই। নিজেদের যান-মালের নিরাপত্তা চাই। নাম উল্লেখসহ ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করেছে। পুলিশও মামলা করেছে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। আহমদিয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত দুটি গ্রামে ও পঞ্চগড় শহরের আহমদিয়াদের দুই শতাধিক বাড়িঘর, দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। ৭০ জন সদস্য আহত হয়েছে। একজনকে পিটিয়ে মেরেছে। দীর্ঘ তিনঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালায়। কিন্তু বিজিবি ও পুলিশ কোনও অ্যাকশনে যায়নি; যা আমাদের বিস্মিত ও হতবাক করেছে। তিনঘণ্টা পর অ্যাকশন শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ততক্ষণে সব শেষ। এলাকার চিহ্নিতদের নাম পুলিশকে জানানো হয়েছে। ঘটনাটিকে কেউ কেউ রাজনীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, যা মোটেও কাম্য নয়। ’
মামলা ও গ্রেফতার
ঘটনাস্থলের আশপাশে ও পঞ্চগড় শহরের মোড়ে মোড়ে পুলিশ-বিজিবির টহল অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার আতঙ্কে অনেকেই বাড়ি ছাড়া। উসকানিদাতা হিসেবে তেঁতুলিয়া উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. নাছিরউদ্দিনসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও তিনটি মামলা হয়েছে। এ নিয়ে মামলার সংখ্যা দাঁড়াল ১৩টি। এসব মামলায় নামে উল্লেখ করা ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১০ থেকে ১১ হাজার। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে গ্রেফতারের সংখ্যা ১৩৬ জন।
পুলিশ সুপার এসএম সিরাজুল হুদা বলেন, ‘বুধবার সকাল পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আইন ও ধারায় মোট ১৩টি মামলা করা হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত ১৩৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা তদন্তের মাধ্যমে, ভিডিও ফুটেজ দেখে, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করছি।’








