‘পরিচয় দিস, তুই কী হয়ে গেছিস’ বলেই আ.লীগ নেতা সোহানকে পিটিয়ে হত্যা ছাত্রলীগের 

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:১২আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:০২

কুড়িগ্রাম পৌর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম সোহানকে বহনকারী জিপ গাড়ির সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মীদের মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগেনি। অতিরিক্ত গতি থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়ে আহত হন মোটরসাইকেলে থাকা তিন যুবক। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা বিন্দু জিপ থামালে নিজের পরিচয় দেন সোহান। এতেই ক্ষেপে গিয়ে তাকে পেটান বিন্দু। দুর্ঘটনায় আহত ছাত্রলীগ কর্মীর পরিবার ও গাড়িতে থাকা সোহানের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে শুক্রবার জেলা সদরের খলিলগঞ্জ এলাকায় অভিনন্দন কনভেনশন সেন্টারের সামনে কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সোহানকে বহনকারী জিপ ছাত্রলীগ কর্মীদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়েছে এমন অভিযোগ তুলে মারধর করেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজভি কবির চৌধুরী বিন্দু ও তার অনুসারীরা। এতে মারা যান সোহান।

সোহানের সঙ্গে জিপে থাকা তার বন্ধু রেদওয়ান মাহমুদ ও জোবাইদুল ইসলাম সুইট জানান, শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে তারা তিন বন্ধু সদর উপজেলা পরিষদের কাছ থেকে শহরে ফিরছিলেন। খলিলগঞ্জ এলাকায় অভিনন্দন কনভেনশন সেন্টারের সামনে অটোরিকশার যানজটের কারণে তারা সড়কের পাশে গাড়ি থামান। বিপরীত দিক থেকে দ্রতগামী একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে পড়ে যায়। মোটরসাইকেলচালকসহ তিন যুবক ছিটকে পড়ে আহত হন। চালকের হাত-পা থেতলে যায়। তারা দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে তাদের উদ্ধার করেন এবং একটি অটোরিকশাযোগে হাসপাতালে পাঠান। এরপর তারা গাড়িতে উঠে শহরের দিকে রওনা হন। খলিলগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে তিন-চারটি মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবক অকথ্য ভাষায় তাদের গালি দিয়ে গাড়ি থামাতে বলেন। বিন্দু মোটরসাইকেল সামনে নিয়ে জিপের গতিরোধ করেন। জিপের চালকের আসনে থাকা রেদওয়ান ও সামনের আসনে থাকা সুইটকে জামার কলার ধরে টেনে নামান। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার জন্য তাদের দায়ী করে জিপ রেখে যেতে বলেন বিন্দু।

রেদওয়ান বলেন, তারা ভেবেছিল আমাদের জিপের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কা লেগে তিন যুবক আহত হয়েছে। আমি তখন বলি তোমরা কারা? প্রয়োজনে কনভেনশন সেন্টারের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তারপর কথা বলো। তখন বিন্দু নিজের পরিচয় দেন। এ সময় গাড়ির পেছনে বসে থাকা সোহান জানালা দিয়ে মাথা বের করে নিজের পরিচয় দিয়ে বিষয়টি ছাত্রলীগ সভাপতিকে জানাতে বলেন। এতেই ক্ষেপে যান বিন্দু। অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করে সোহানকে পেটাতে পেটাতে বলেন, ‘পরিচয় দিস, তুই কী হয়ে গেছিস।’ এমন ঘটনায় আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি।

রেদওয়ান আরও বলেন, বিন্দু হঠাৎ গাড়িতে উঠে চালকের আসনে বসে গাড়ি চালিয়ে সোহানকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হন। তার সঙ্গে স্বাধীন নামে আরেক ছেলে ছিল। তাদের অনুসারীরা মোটরসাইকেলে পিছু নেয়। আমি ও সুইট রিকশায় করে পেছনে পেছনে হাসপাতালে আসি। হাসপাতালে পৌঁছার আগেই বিন্দু, স্বাধীন ও অন্য ছেলেরা সোহানকে আবারও মারধর করেছে বলে উপস্থিত লোকজনের কাছে শুনেছি। আমরা এসে সোহানকে মৃত দেখতে পাই। নিহত সোহান ও হাসপাতাল চত্বরে ভিড় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের

‘নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হচ্ছে। আমরা সঙ্গে থাকার পরও সোহানকে রক্ষা করতে পারিনি। কোনও অপরাধ না করেও শুধু পরিচয় দেওয়ার কারণে একটা ছেলেকে পিটিয়ে মারলো। ওর দুটো সন্তান বাবাহারা হয়ে গেলো।’ কেঁদে কেঁদে বলেন রেদওয়ান। এ সময় তার অপর বন্ধু সুইট ও দুলালের চোখে পানি ঝরছিল।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়ে আহত মোটরসাইকেলচালক যুবকের বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে ওই যুবকের বাবা-মা ও শ্বশুরের সঙ্গে কথা হয়। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে অভিভাবকরা বলেন, বিকালে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে আসার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়ে ওই যুবক ও তার সঙ্গে থাকা দুই কিশোর। এর মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হয়। চালকের হাত-পা থেতলে যাওয়াসহ মাথায় আঘাত পায়। পরে জেনেছি, জিপের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের কোনও ধাক্কা লাগেনি। গাড়িতে থাকা সোহানের বন্ধুরা নেমে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সোহানের মৃত্যুর খবর পায় তারা। পরে নিরাপত্তার কথা ভেবে হাসপাতাল ত্যাগ করে অন্যত্র চিকিৎসা নেয়।

মোটরসাইকেলচালক যুবকের শ্বশুর বলেন, সোহানের বন্ধুরা যা বর্ণনা করেছেন, আমার জামাইও একই কথা বলেছে। সেও বলেছে, কোনও গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগেনি। হঠাৎ ব্রেক করায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়ে আহত হয়। জিপে থাকা দুই ব্যক্তি তাদের রিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠায়। 

তিনি আরও বলেন, ‘আমার জামাই এতটাই গুরুতর আহত হয়েছিল যে, বমি করেছিল। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সোহানের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে যখন ঝামেলা হচ্ছিল, তখন নিরাপত্তার কথা ভেবে জামাইকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে অন্যত্র চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। সে নিজেও জানে না বিন্দু বা অন্য ছেলেদের কে খবর দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে তার কললিস্ট যাচাই করতে পারে।’

‘সোহানের মতো মানুষকে এভাবে পিটিয়ে মারায় আমরা হতবাক হয়ে গেছি। যেই জড়িত থাক, সেটা আমাদের সন্তান হলেও আমরা বিচার চাই।’ যোগ করেন আহত কিশোরের শ্বশুর।

এদিকে, ময়নাতদন্তের পর শনিবার বিকাল ৩টায় জানাজা শেষে সোহানকে শহরের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, বিএনপি, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাড়াও সোহানের বন্ধু, আত্মীয় ও এলাকাবাসী জানাজায় অংশ নেন।

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু 
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
বিক্রির জন্য নিলামে উঠছে এই আধুনিক দুর্গটি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম