কেমন আছেন আবু সাঈদের বাবা-মা, কতটুকু পূরণ হলো তার স্বপ্ন

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১ আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১

জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম এখনও শোকে দিন কাটাচ্ছেন। ছেলে হারানোর গভীর শোক ও শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছেন। সেইসঙ্গে ছেলে হত্যার রায় কার্যকর দেখার অপেক্ষায় আছেন। যদিও এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি তারা। বাবা-মা জানিয়েছেন, আবু সাঈদের বৈষম্যহীন স্বপ্নের বাংলাদেশ এখনও গড়ে উঠেনি। কবে তার সেই স্বপ্নপূরণ হবে, তাও জানা নেই তাদের।

২০২৪ সালের এই দিনে (১৬ জুলাই) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেন। তার মৃত্যুর পর আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটায়। 

বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে সন্তান হারানোর গভীর শোক ও শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছেন তারা। সন্তান হত্যা মামলার কাঙ্ক্ষিত রায় না পাওয়ায় তারা হতাশ। আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তাদের বাড়িতে আসেন। কিন্তু মানুষের এই ভিড়ের মাঝেও তারা সন্তান হারানোর এক চরম হাহাকার ও শূন্যতা অনুভব করেন। নয় সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ও আদরের সন্তানকে হারিয়ে এখনও নীরবে কাঁদেন। ছেলের ব্যবহৃত বই, টেবিল, চেয়ার ও জামাকাপড় এখনও ঘরে একইভাবে সাজানো রয়েছে।

বিচার নিয়ে অসন্তোষ

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। মামলার মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে মাত্র দুজনের মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় আবু সাঈদের বাবা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি এই রায় পুনর্বিবেচনা করে ঘটনার মূল নির্দেশদাতা ও হুকুমদাতাদেরও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

ছেলের স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা

আবু সাঈদের মা জানান, তার একমাত্র ইচ্ছা—ছেলে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে জীবন উৎসর্গ করেছে, তিনি যেন মৃত্যুর আগে সেই বৈষম্যহীন, ফ্যাসিবাদমুক্ত ও রক্তপাতহীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেন।

বুধবার রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে আবু সাঈদের বাড়িতে গেলে ক্ষোভ আর হতাশা ব্যক্ত করেছেন বাবা-মা। বাবা মকবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যাকে হত্যার হুকুমদাতাসহ যাদের সাজা হয়েছে, গত দুই বছরেও তারা কেউ গ্রেফতার হলো না। মামলার রায় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাজা কার্যকর কবে হবে তা জানি না। আমি বেঁচে থাকতে ছেলের হত্যাকারীদের সাজা কার্যকর দেখে যেতে পারবো বলে মনে হয় না। তবে আমি ছেলের হত্যাকারীদের সাজা কার্যকর দেখে যেতে চাই। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ এখনও গড়ে উঠেনি। আমার ছেলের স্বপ্নও পূরণ হয়নি।’

মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে আন্দোলন করে জীবন দিলো, আমার বুক খালি হলো। পরে এ ঘটনায় হত্যা মামলার রায় হলো। অথচ এখনও হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। আমি হত্যাকারীদের সাজা দেখে মরতে চাই। এ ছাড়া আমার কোনও চাওয়া নেই।’

যা বলছেন সহযোদ্ধারা

বেরোবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব, জাহিদ হাসান জয়, আশিকুর রহমান জানান, আমরা যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম, যে স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। আদৌ পূরণ হবে কিনা জানা নেই। সেইসঙ্গে আবু সাঈদের স্মতি সংরক্ষণে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আহসান হাবিব বলেন, ‘এত রক্তের বিনিময়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেলাম। কিন্তু যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করলাম, তার কোনোটি দূর হয়নি। এখনও কোটার ভিত্তিতে বেরোবিতে ভর্তি চলছে। ড. ইউনূস বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন। তার কোনও কথার বাস্তবায়ন হয়নি। আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, জাদুঘর, গেট নির্মাণ এসবের কিছুই হয়নি। আজো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক কম অর্থ বরাদ্দ পায়। আমরা এসব বৈষম্যের অবসান চেয়েছিলাম।’

বৈষম্য কতটুকু দূর হলো প্রশ্ন অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদীরক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবে গতি সঞ্চার করেছে শহীদ আবু সাঈদের বীরত্বপূর্ণ জীবনদান। সেই আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবে পরিণত হয়েছিল। সেই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আমরা সবাই তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। এখন আমার প্রশ্ন হলো যেসব বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করলাম, আবু সাঈদ জীবন দিলো। শত শত শিক্ষার্থী শহীদ এবং গুরুতর আহত হলো, যেসব বৈষম্য গত দুই বছরে কতটুকু দূর হলো। গত দুই বছরে আমরা কী পেলাম। তাহলে আমরা কী বৈষম্যের শিকার হতেই থাকবো। আমরা চাই সব বৈষম্যের অবসান হোক।’

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
জুলাই আন্দোলনের প্রথম কোনও মামলার আসামি কারামুক্ত
সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে হিরো আলমের মামলা, চাঁদা দাবির অভিযোগ
রিজার্ভ চুরি: ৯৯ বারের মতো পেছালো তদন্ত প্রতিবেদন
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন