সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ভাইবোনের মধ্যকার বিরোধের জেরে আটকে গিয়েছিল বাবার জানাজা ও দাফন। সম্পত্তির ন্যায্য অংশ বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত বাবার মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন মেয়ে। অবশেষে মৃত্যুর ১৬ ঘণ্টা পর স্থানীয়ভাবে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধের অবসান হয়েছে।
বোন হালিমা বেগমকে জমিজমা বাবদ দেড় লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তে সম্মত হন ভাই ইদ্রিস আলী। পরে হালিমার হাতে ওই টাকার একটি ব্যাংক চেক তুলে দেওয়া হলে বাবার মরদেহ দাফনের অনুমতি দেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুর প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর জানাজা ও দাফনের সিদ্ধান্ত হলো।
ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বোয়ালিদহ বকশিগঞ্জ গ্রামে। মৃত ব্যক্তির নাম নাজির উদ্দিন ব্যাপারী (৭৫)। তিনি পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার দিকে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল ১০টায় নিজ বাড়ির আঙিনায় নাজির উদ্দিনের জানাজার সময় নির্ধারণ করে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল। কিন্তু জানাজা ও দাফনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্তে বাধা দেন নাজির উদ্দিনের মেয়ে হালিমা বেগম। তার অনড় অবস্থানের কারণে নির্ধারিত সময়ে জানাজা হয়নি। বাবার সম্পত্তিতে নিজের ন্যায্য অংশ বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত জানাজা ও দাফনের অনুমতি দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। এ অবস্থায় দিনভর বাড়ির উঠানেই খাটিয়ায় পড়ে থাকে বাবার মরদেহ।
হালিমা বেগমের অভিযোগ, তার বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার সুযোগে ভাই ইদ্রিস আলী কৌশলে সব সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। এর ফলে তিনি পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন। এ অবস্থায় হালিমা সাফ জানিয়ে দেন—বাবার সম্পত্তিতে তার আইনি ও শরীয়তসম্মত অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনোভাবেই দাফনের অনুমতি দেবেন না।
এ নিয়ে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিরোধ মেটাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উদ্যোগ নেন। প্রথম দফায় সমঝোতার চেষ্টা সফল না হওয়ায় সোমবার বিকাল ৫টার দিকে উভয় পক্ষকে নিয়ে আবারও বৈঠক হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য জিল্লুর রহমান, ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন, ধাপেরহাট পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রেজাউল করিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বৈঠকে বাবার সম্পত্তি বাবদ বোন হালিমা বেগমকে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন ভাই ইদ্রিস আলী। পরে তাকে একটি ব্যাংক চেক দেওয়া হলে বাবার মরদেহ দাফনের অনুমতি দেন। সমঝোতার পর বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মরদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ভাইবোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক হয়। আলোচনার একপর্যায়ে ইদ্রিস আলী তার বোনকে বাবার সম্পত্তি বাবদ দেড় লাখ টাকা দিতে রাজি হন। পরে একটি ব্যাংক চেক দেওয়া হলে বাবার মরদেহ দাফনের অনুমতি দেন হালিমা।’
ধাপেরহাট পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই রেজাউল করিম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান হয়েছে। বাদ মাগরিব জানাজা শেষে মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।’
এদিকে, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে বাবার জানাজা ও দাফন দীর্ঘ সময় আটকে থাকার ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধের অবসান হওয়ায় সেই ক্ষোভ কেটেছে।
সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং এ নিয়ে বিরোধের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ছেলে ইদ্রিস আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
৬ ঘণ্টা ধরে উঠানে বাবার লাশ, দাফনে বাধা: মেয়ে বললেন ‘ভাই সব সম্পত্তি একাই নিয়েছেন’