‘ঘরে ধান-চাইল কিছুই নাই, সামনে ঈদ। ত্রাণের চাইল ছাড়া তো ঈদ করনের মতো কিছু নাই।’ তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামের জায়েদা খাতুন এভাবেই তার দুর্দশার কথা বলছিলেন। একই গ্রামের পরিস্কার খাতুন বলেন, ‘বৈশাইগা ধান গেল, আগুন মাইয়া ধানও গেল। গত ঈদেও কষ্ট করছি। এই ঈদেও কষ্ট করন লাগবো।কইবারও জায়গা নাই, হুনবারও মানুষ নাই।’
দুইবারের বন্যায় ফসল হারানো এবং যাদুকাটা নদীতে ৩ মাস ধরে বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন স্থানীয়রা।
যাদুকাটা নদী তীরবর্তী এলাকার রুমানা খাতুন বলেন, ‘ঘরে ধান চাইল নাই। গাঙে বালু-পাথর তুইলা কোনও রকমে খেয়ে না খেয়ে চলতাম। এখন পরিবেশওয়ালারা গাঙ থেইক্যা বালু তুলতে দেয় না। গাঙের পাড় নাকি ভাইঙা যাইবো।’
যাদুকাটা নদী থেকে বারকি নৌকা দিয়ে বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও, গোটিলা, কাশতাল, গুড়হারা,আমবাড়ি, চরগাঁও, ছরারপাড়, বিন্নাকুলি, রাজাগাঁও, জামবাঁক, ঘাগড়া, মোল্লাপাড়া, সুন্দরপাহাড়ি, কামরাবন, মল্লিকপুর, সুহালা, কুনাইড়সহ ৫০ গ্রামের ৩০ হাজার বারকি শ্রমিক যাদুকাটা নদী থেকে বালি পাথর উত্তোলন করতে পারছেন না। তাই বেকার শ্রমিকদের পরিবার খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বড়টেক এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পরপর দুইবার বন্যায় ফসলহানির পর এলাকার ঘরে ঘরে অভাব অনটন রয়েছে। জেলার লোকজন কৃষিকাজ ও মাছ ধরা ছাড়াও নদীতে বালি-পাথর উত্তোলন করে এতোদিন জীবিকা নির্বাহ করতো। এখন তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজের সুযোগ নেই। এলাকার মানুষ বাঁচবো কি দিয়া?’
মানিগাও গ্রামের রাষ্ট্র মিয়া বলেন, ‘বালি-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৩০ হাজার বারকি শ্রমিক এখন বেকার।’
কামড়াবন গ্রামের জহুর আলম বলেন, ‘নদীর মাইঝে থাইক্যা বালি তুললেও পুলিশে বাঁধা দেয়। পুলিশ কি মানুষের খাওন থাকনের দায়িত্ব নিবো?’
ঘাগড়া গ্রামের বাহাদুর মিয়া বলেন, ‘বারকি শ্রমিকরা কাজ করতে পারলে ৫০০/৬০০ টাকার বালি-পাথর তুলতে পারে। এই আয়-রোজগার দিয়ে সংসার কোনও রকমে চলে। বন্ধ থাকায় মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। বন্যার কারণে জেলার বাইরেও কোন কাজকাম নাই। কামের লাইগ্যা মানুষ কই যাইবো।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বলেন, ‘হাওর এলাকায় মানুষ এখন খাদ্য ও কর্ম সংকটে আছে। তাই সব বিষয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা দরকার।’
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নন্দন কান্তি ধর বলেন, নদীর তীর কেটে বালি উত্তোলন করলে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু পাড় না কেটে নদীর মধ্যে থেকে বালু তুলতে কোনও বাধা-নিষেধ নেই।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলার বন্যা দুর্গত সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, বিশম্ভরপুর,তাহিরপুর,জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা উপজেলায় ২১০ টন চাল ও প্রত্যেক উপজেলায় নগদ ১ লাখ টাকা করে মোট ৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দিরাই ৬০ টন চাল নগদ ২ লাখ ১০ হাজার,শাল্লায় নগদ ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ৫০ টন চাল,দক্ষিণ সুনামগঞ্জ নগদ ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও ৪০ টন চাল, জগন্নাথপুরে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ৪০ টন জি আর চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া ভিজিডি ও ভিজিএফ অব্যাহত রয়েছে। সরকারে সার্বিকভাবে বন্যা দুর্গতদের সঙ্গে রয়েছে ত্রাণের কোনও অভাব নেই।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চের শেষের দিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান নষ্ট হয়ে যায়। এতে ৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি মাসের বন্যায় ১০ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জবাসী ঘরবাড়ি হারায়। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে দিশেহারা জেলার মানুষ। তবে দুর্যোগের পর থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহযোগিতা করা হচ্ছে।








