করোনা আর বন্যায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার মানুষ। দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে প্রত্যন্ত হাওর এলাকার শত শত নারী-পুরুষ বাড়িতে বেকার দিনযাপন করছেন। তিন দফা বন্যায় নষ্ট হয়েছে জমির ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। বন্যার পানি সরে গেলেও হাওরবাসীর বুকে রেখে গেছে গভীর ক্ষত চিহ্ন।
অন্য বছর এমন দিনে হাওর এলাকার হাজার হাজার নারী-পুরুষ কাজের সন্ধানে বড় বড় শহরগুলোতে চলে যেতেন। কেউ কেউ আবার সিলেটের ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি, জৈন্তাসহ বিভিন্ন পাথর কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন করে আয়-রোজগার করতেন। করোনার কারণে সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বালু পাথর মহালগুলো থেকে বালু পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।
এদিকে পুরোদমে আমন মৌসুম শুরু হলেও হাওর এলাকার হতদরিদ্র মানুষ আমন অধুষ্যিত জেলাগুলোতে যেতে পারছেন না। কারণ সেখানে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কমে গেছে কৃষি শ্রমিকের চাহিদা। হাওরগুলো এখনও পানিতে ভরপুর থাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না পর্যাপ্ত মাছ। কৃষি ও মাছ ধরা ছাড়া হাওর এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের উৎস না থাকায় দরিদ্র হাওরবাসী পড়েছে জীবন ও জীবিকার গভীর সংকটে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের মৎস্যজীবী জানকি বিশ্বাস বলেন, সারা দিনরাত হাওরে নদীতে জাল ফেলে ৩০০ টাকার মাছও ধরা যায় না। প্রতিটি নৌকায় মাছ ধরতে দুজন জেলে লাগে। এরকম আয়-রোজগার দিয়ে সংসার চলে?
বাহাদুরপুর গ্রামের সত্যবান বিশ্বাস বলেন, বৈশাখ মাসে হাওরে ধান কেটে কিছু ধান আয় করেছিলাম খোরাকির জন্য, সে ধানও শেষ হয়ে গেছে। এখন আর খাওনের মতো ধান, চাল ঘরে নাই। বন্যার কারণে ধান চালের দাম অনেক বেড়েছে, আয়-রোজগারের সঙ্গে খরচের কোনও মিল নাই।
একই ইউনিয়নের চান্দারগাঁও গ্রামের সবুজ বিশ্বাস বলেন, চট্টগ্রামের একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। করোনা শুরুর পরপরই ফ্যাক্টরির মালিক কারখানা বন্ধ করে দেয়। এরপর বাড়িতে চলে আসি।
বাদুরপুর গ্রামের অঞ্জলি বিশ্বাস জানান, সরকার বন্যা আর করোনার জন্য কত পরিবারকে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু তাদের পরিবারের নাম সরকারের কোনও তালিকায় নেই।
ফতেহপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রনজিত চৌধুরী রাজন বলেন, হাওর এলাকায় দরিদ্র মানুষের বসবাস। ধান একমাত্র প্রধান ফসল। আয়-রোজগারের বিকল্প পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ এখন কষ্টে আছে। তবে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু লোক সহযোগিতা পাচ্ছেন ঠিকই এর পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, হাওর এলাকায় এখন আয়-রোজগারের কোনও উৎস নেই। বৈশাখ মাসে মানুষ যে ধান উৎপাদন করেছে সে ধান বিক্রি করে এখন সংসার চালাচ্ছে। দুই মাস পর আবার শুরু হবে বোরো আবাদ। তখন সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
তবে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, বন্যার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত হাওর এলাকায় সরকারের ত্রাণ সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, ঢেউটিন শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণের কোনও ঘাটতি নেই।








