রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুগদা শাখায় ‘কিশোর গ্যাং’য়ের আধিপত্যের অভিযোগ তুলেছেন নির্যাতিত এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। একাধিকবার প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা নামে ওই অভিভাবক দুই দফায় মুগদা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। সবশেষ তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক এবং ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে ‘কিশোর গ্যাং’য়ের সদস্য উল্লেখ করে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী (১৫) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জন কিশোর মুগদা শাখার ইংরেজি ভার্সনের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ওই শিক্ষার্থীকে গত ২০ মে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের এক শিক্ষকের সহযোগিতার অভিযোগও করা হয়েছে। এর আগেও ‘কিশোর গ্যাং’য়ের সদস্যরা ওই শিক্ষার্থীকে বিভিন্নভাবে বুলিং করতো বলে অভিযোগ করেছেন তার অভিভাবক।
নির্যাতিত শিক্ষার্থীর মা আয়েশা সিদ্দিকা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সবশেষ ঘটনার দিন ক্লাসের বাচ্চারা আমাকে বলেছে, মাহমুদ স্যার আমার ছেলেকে পেটাতে নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের দিন আমি বিষয়টি পুলিশকেও জানিয়েছি। শিক্ষক হয়ে কেন কিশোরদের দিয়ে আমার ছেলেকে পেটাতে বলবেন? আমি যদি আগে জানতাম, তাহলে কোনও দিন আমার ছেলেকে ওই স্কুলে দিতাম না। লেখাপড়া দিয়ে কী করবো, আমার ছেলে যদি বেঁচেই না থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এই স্কুলে কিশোর গ্যাং আগেও ছিল। শিক্ষকরা তাদের ভয় পান। মাহবুব স্যার বলছেন, পেটের মধ্যে চাপাতি ঢুকিয়ে আমাকে ফেলে দেবে। ঘটনার সময় ওই শিক্ষার্থী ছাড়াও আরও ১০-১২ জন কিশোর ছিল। শিক্ষকরাই বলছেন, সেই শিক্ষার্থী কিশোর গ্যাংয়ের লিডার। আমার ছেলে স্কুলের ক্যাপ্টেন থাকা অবস্থায় ওদের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়েছিল।’
আয়েশা সিদ্দিকা অভিযোগ করেন, ‘অধ্যক্ষের কাছে তো আমি বহুবার গেছি। তিনিও আমাকে বলেছেন—আমরা অনেক ভয়ে আছি। বেশি বললে আপনাকে এবং বাইরে পেটের মধ্যে পোচ দেবে। সেই শিক্ষার্থী নাকি চাপাতি গ্রুপের লিডার।’
মামলায় আসামি করা হয়েছে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান, প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান এবং মুগদা শাখার অষ্টম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জন কিশোরকেও আসামি করা হয়েছে বলে জানান আয়েশা সিদ্দিকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম ঘটনা ঘটে গত ১৫ জানুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে। সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ২০ মে বেলা আড়াইটার দিকে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়েশা সিদ্দিকার ছেলে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুগদা শাখার চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী। একই প্রতিষ্ঠানের বাংলা মাধ্যমের অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্র তাকে বিভিন্ন সময় তাকে বুলিং এবং র্যাগিং করতো। বিভিন্ন অজুহাতে তাকে মারধরও করা হতো।
গত ১৫ জানুয়ারি আরাফাত নাসিম ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ করা হলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রকে কিল-ঘুষি মারে। এছাড়া তার গলা চেপে ধরে এবং হুমকি-ধমকি দেয়। এ ঘটনায় আয়েশা সিদ্দিকা মুগদা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর-৯০৭, তারিখ ১৫/০১/২০২৬) করেন।
আদালতে দায়ের করা মামলা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই জিডির পর স্কুলের বদনাম হওয়ায় অধ্যক্ষ শারীরিক শিক্ষকের মাধ্যমে আয়েশা সিদ্দিকাকে স্কুলে ডেকে নেন। সেখানে শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষকের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। এর জের ধরে গত ৬ মে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং ওই ছাত্রকে বলেন, তাকে (ভুক্তভোগী) লাত্থায়ে পিটায়ে নিচে নিয়ে আয়।’
অধ্যক্ষ ও শারীরিক শিক্ষকের প্ররোচনায় ওই শিক্ষার্থীসহ ১০ থেকে ১২ জন কিশোর ওইদিন বিকাল ৩টার দিকে ভুক্তভোগীকে স্কুলের পঞ্চম তলা থেকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি দেখে আয়েশা সিদ্দিকা অধ্যক্ষ ও শারীরিক শিক্ষকের কাছে গেলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আকাশ কিশোর গ্যাংয়ের লিডার। ওর চাপাতি গ্রুপ আছে। স্কুল থেকে আকাশের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিলে স্কুলের বাইরে সে আয়েশাকে আক্রমণ করতে পারে।’
এ পরিস্থিতিতে আয়েশা সিদ্দিকা কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে ওই ছাত্রকে ‘ভালো হয়ে যাওয়ার’ পরামর্শ দেন এবং তার ছেলের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেন।
তার অভিযোগ, ওই ঘটনার পর শারীরিক শিক্ষকের প্ররোচনা এবং অধ্যক্ষের নির্দেশে ‘কিশোর গ্যাংয়ের লিডার’ ওই ছাত্রসহ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন কিশোর গত ২০ মে দুপুর আড়াইটার দিকে টিফিন ও নামাজের সময় ক্লাসরুমে ঢুকে চাপাতি দিয়ে তার ছেলের চোখের বাম পাশ ও কপালে আঘাত করে। পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মারতে মারতে নিচে নিয়ে যায় এবং গলা টিপে ধরে।
সহপাঠীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসা শেষে তাকে বাসায় নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরে ইসলামিক ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চোখের চিকিৎসা শেষে আবার তাকে বাসায় নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২১ মে মুগদা থানায় আরেকটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর-১৪৫৬) করেন আয়েশা সিদ্দিকা।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য শাহাদত ঢালী অভিযোগ করে বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের কাছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জিম্মি। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয় না। স্কুলে লেখাপড়ার পরিবেশ নেই। অভিভাবকরা এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে অধ্যক্ষ বা কর্তৃপক্ষ সময় দেন না। বিষয়টি সবার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করলেও ভয়ে কেউ কিছু বলেন না।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে টাকার বিনিময়ে মতিঝিলের মূল ক্যাম্পাসে আনা হয়েছে। সেই স্বার্থ না থাকায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে আনা হয়নি।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দিচ্ছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এই পরিস্থিতি অনেক আগে থেকেই চলছে।’
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এখন এই মুহূর্তে কিছু বলতে চাই না। কারণ আমি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কমিটি একটি প্রতিবেদন দেবে।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রওশন জাহান বলেন, ‘এখন প্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্টেটমেন্ট নিতে হবে। বলা হচ্ছে, চাপাতি নিয়ে ঢুকেছে। আমি খোঁজ নিয়েছি, এগুলো সব মিথ্যা কথা। তবে এই ছেলেটার সঙ্গে অভিযুক্ত ছাত্রের অনেক দিন ধরেই কিছু ঝামেলা চলছে। অভিভাবক আমাকে আগে জানাননি। আমার আগে যিনি প্রিন্সিপাল ছিলেন, তাকে জানিয়েছেন। তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। মার্চ মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আমাকে একটি আবেদন দিয়েছিলেন।’
‘এই ছেলেটা (ভুক্তভোগী) একসময় ক্যাপ্টেন ছিল। তখন সে অন্য বাচ্চাদের নাম লিখতো, ক্লাসে কেউ কথা বললে শাস্তিও দিতো। এ কারণে অন্য ছেলেরা তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এখন সে ক্যাপ্টেন নয়। তাই অন্য ছেলেরা তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এ কারণেই তার মা মুগদা থেকে মতিঝিলে স্থানান্তর করতে চেয়েছিলেন। আবেদনও করেছিলেন। আমি বিষয়টি গভর্নিং বডিতে তুলেছিলাম। তারা বলেছে, এটি কোনও সমাধান নয়। যারা এসব করে তাদের ও তাদের অভিভাবকদের ডাকতে হবে, পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তার মা আয়েশা সিদ্দিকাকেও ডাকতে হবে।’
‘কিন্তু আয়েশা সিদ্দিকা কোনোভাবেই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজি নন। আমি চিঠি দিতে পারি, ক্লাস সাসপেন্ড করতে পারি, কিন্তু তিনি চান না। তার বক্তব্য ছিল— এটা করা যাবে না। করলে ওরা তার ছেলের ওপর আরও ক্ষেপে যাবে, রাস্তাঘাটে যেকোনও সময় মেরে ফেলতে পারে। গভর্নিং বডিও বলেছে, তাকে ট্রান্সফার করেও আনা যাবে না। এই অবস্থার মধ্যেই ২০ মে একটি ঘটনা ঘটে। আমি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছি। শ্রেণিশিক্ষকেরও একটি প্রতিবেদন আছে। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মুগদা শাখায় ‘কিশোর গ্যাং’য়ের আধিপত্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী যদি অন্যায় করে, তাকে শাস্তি না দিলে সে বারবার অন্যায় করবে। প্রয়োজনে তাকে টিসি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। যদি আমি মনে করি, সত্যিই সে ‘কিশোর গ্যাং’য়ের সঙ্গে জড়িত, তাহলে তাকে টিসি দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারি। কিন্তু ওই ভদ্রমহিলা (অভিযোগকারী অভিভাবক) সবসময় বলেন, কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।’
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুগদা শাখার দায়িত্বে যিনি আছেন, মামলা করলে তার নামে করা উচিত ছিল। আমার নামে কেন করা হলো, তা বুঝতে পারছি না। আমি কি সারাক্ষণ সেখানে থাকি? প্রতিটি শাখার জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আছেন। তিনি আগে বিষয়টি দেখবেন, তারপর আমরা দেখবো।’
কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ প্রসঙ্গে মুগদা শাখার ইংরেজি মাধ্যমের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এর পেছনে একটা কারণ আছে। উনি (ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক) শাখা পরিবর্তন করাতে চাচ্ছিলেন। কোনোভাবেই পারছিলেন না। শুনেছি, উনি কোনও একটা উসিলা খুঁজছিলেন। আমাদের স্কুলে কখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটে না।’
মুগদা শাখার প্রধান সহকারী প্রধান শিক্ষক (ডে শিফট, ইংরেজি ভার্সন) আবু বকর সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওইদিন আমি বিশেষ দায়িত্বে মতিঝিলে ছিলাম। প্রিন্সিপাল আপা আমাকে একটি কাজে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। পরে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারি। যতটুকু জেনেছি, তা প্রিন্সিপাল আপাকে জানিয়েছি এবং লিখিত প্রতিবেদনও দিয়েছি। এর বেশি কিছু জানি না।’
কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে কোনো ভূমিকা নিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাং বলতে মূলত বাংলা মাধ্যমের কিছু শিক্ষার্থীকে বোঝানো হচ্ছে। আগেও তারা বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিয়েছিল।’









