X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
২০ আষাঢ় ১৪২৯
কান ডায়েরি-১

‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ১২:০৮

কান আবারও টানছে! একবছরেরও কম সময় আগে রেহানা মরিয়ম নূর ফরাসি উপকূলে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশের প্রথম ছবির সম্মান বয়ে এনেছে এটি। এবার স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন কানে টেনে নিলো। কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির বায়োপিক ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’-এর ট্রেলার প্রকাশ হবে।

১৪ মে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন লাউঞ্জে চোখে পড়লো বঙ্গবন্ধু কর্নার। তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই আছে এখানে। বিদেশগামী অপেক্ষমাণ বেশ কয়েকজন যাত্রীকে বই পড়তে দেখা গেলো। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। বিমানবন্দরে ডিজিটাল ডিসপ্লের মাধ্যমে প্রদর্শনের জন্য ইতোমধ্যে দুই মিনিটের ভিডিও ক্লিপ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া লাউঞ্জে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এবং মুক্তিসংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন কার্যক্রম প্রদর্শন হচ্ছে। ‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে

ইতিহাদ এয়ারওয়েজের ফটকে চেক-ইনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আকাশযানে ওঠার বোর্ডিং ব্রিজের শুরুতে চোখে পড়লো বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও জীবনচিত্র এবং তাঁর ব্যবহৃত চশমার বিশাল একটি আদল। কানে যাওয়ার মূল লক্ষ্যের সঙ্গে এসব আয়োজন মিলে যাওয়ায় ডায়েরিতে লেখার রসদ পেয়ে গেলাম।

‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ফ্লাইট ছাড়ার কথা থাকলেও ৫৩ মিনিট দেরি হলো। তবে এই বিমান সংস্থার ইনফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট এককথায় দারুণ। সাম্প্রতিক সময়ের ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত অনেক চলচ্চিত্র আছে এতে। ঢাকা থেকে আবুধাবি যাওয়ার ফ্লাইটে দেওয়া খাবারের তালিকা জিহ্বায় জল এনে দেয়! ডাল মাখানি, পরোটা, বাসমতি চালের ভাত, চিকেন কোপ্তা, রসগোল্লা, টক দই ও কমলার জুস একে একে সাবাড় করতে বেশি সময় লাগলো না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে রাত ৯টা ৩০ মিনিটে পৌঁছানোর কথা। ঢাকা থেকে দেরিতে ছাড়লেও ঠিক সময়ে আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইওয়াই২৪৫ ফ্লাইট অবতরণ করলো। দুবাইয়ের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর আবুধাবি। এখানে টার্মিনাল তিনটি। ৮ হাজার ৫০০ একর জায়গার ওপর এটি গড়ে উঠেছে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি এর উদ্বোধন হয়।

‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে আবুধাবি থেকে প্যারিসের কানেক্টিং ফ্লাইট ১৪ মে দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিটে। এদিক-ওদিক ঘুরে সময় কেটে গেলো। ইওয়াই০৩১ ফ্লাইট ছাড়লো সময় মেনে। ক্লান্তিতে ঘুম চলে এলো। ঘণ্টাখানেক পর ঘুম ভাঙতেই দেখি আসনের সামনে ট্রেতে খাবারের প্যাকেট। ইতিহাদ এয়ারওয়েজের কেবিন ক্রুরা কতোই না ভালো! প্যাকেটের ভেতর বার্গার ও পানি। খাওয়ার পর ছবি দেখায় ডুব দিতে ইচ্ছে হলো। ঘেঁটে ঘেঁটে উইল স্মিথের ‘কিং রিচার্ড’ ছবিটি পছন্দ হলো। এর আগেও দেখেছি ছবিটি। আবারও দেখতে ইচ্ছে হলো। উইল স্মিথ বলে কথা! অস্কারে তার চড়-কাণ্ড বাদ দিলে মানুষটা বেশ চনমনে। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭০তম আসরে মূল প্রতিযোগিতা শাখার বিচারক প্যানেলে তাকে সামনে থেকে দেখেছিলাম। বেশ হাসিখুশি ও রসিকই লেগেছিল।

১৫ মে সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে সময়মতোই উড়োজাহাজ নামলো ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের শার্ল দ্যঁ গল বিমানবন্দরে। এটাই দেশটির সবচেয়ে বৃহৎ বিমানবন্দর। ১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ এর উদ্বোধন হয়েছিল। ৩২ বর্গকিলোমিটারের বেশি জায়গা জুড়ে এটি অবস্থিত। এর নামকরণ হয়েছে প্রয়াত ফরাসি সেনা কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রনায়কের নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে ফ্রান্সকে মুক্ত করার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

বিমানবন্দরের বেল্ট থেকে লাগেজ নেওয়ার পর মোবাইল ফোনে তাকিয়ে দেখি এখানকার তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাংলাদেশের দুই সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী ও নিপু বড়ুয়া সঙ্গী। বিমানবন্দরে আতিথেয়তা দিলেন নিপুর বড় ভাই বিপ্লব বড়ুয়া। ট্রেনের টিকিট কাউন্টারে যেতে অনেকটা পথ হাঁটতে হলো। এখানে একটি অলিভ গাছ চোখজুড়ানো। এর সামনে পিয়ানো রাখা। যার খুশি বাজাতে পারে!

‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে শার্ল দ্যঁ গল বিমানবন্দর থেকে আরইআর-বি ট্রেনে চড়ে শহরের দিকে যেতে হয়। দঁনফের হোশোঁ ট্রেন স্টেশনে নেমে যাচ্ছি মঁপারনাস। সেখান থেকে ট্রেন বদলে ধরলাম প্লেজোঁ স্টেশনের পথ। প্যারিস-১৫ হিসেবে জায়গাটি পরিচিত। ঢাকার গুলশান-বনানীর মতো ছিমছাম। এখানে প্রবাসী আহামেদ ফরিদ ও তার স্ত্রী কাজী নিপা ঘরের টেবিলে বাঙালি খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। গরুর মাংস, রুই মাছ, আলু ভর্তা, ডাল, ডিম ভুনা, সালাদসহ আরও কতো কী! ভরপেট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম আইফেল টাওয়ারের দিকে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যের মধ্যে অন্যতম এটি। পাশেই সেন নদী। নদীর বুক চিরে কিছুক্ষণ পরপর পর্যটকদের নিয়ে ভেসে যাচ্ছে প্রমোদতরী।

‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে আইফেল টাওয়ারের সামনে জুয়া খেলে টাকা আয়ের লোভ দেখাচ্ছে একদল। তিনটি ছোট গ্লাস নিয়ে নাড়াচাড়া করছে একজন। কোনটার ভেতর টাকা আছে জানাতে পারলেই মিলবে ১০০ ইউরো! এক তরুণ ৫০ ইউরো দিলো। আরেক নারী ১০০ ইউরো দিলো। জুয়াড়ি এদিক-ওদিক তাকিয়ে প্রলোভনের ডাক দিচ্ছে। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে সেখান থেকে দ্রুত গুটিয়ে চলে গেলো। আদতে জুয়া খেলতে টাকা দেওয়া ওই তরুণ-তরুণী দলটিরই সদস্য। এসব খেলায় ভিড় হয় বলে পকেটের মানিব্যাগ উধাও হতে বেশিক্ষণ লাগে না। তাই সদা সতর্ক থাকা চাই। 

রাত ৯টা ২৫ মিনিটে কানে যাওয়ার ট্রেন। সেদিক যেন ভুলে বসে আছেন নিপু ও রাব্বানী। তাদের ছবি তোলা আর শেষ হয় না! রাত ৮টায় আহামেদ ফরিদের বাসায় চারটা ডাল-ভাত খেয়ে রীতিমতো ভো-দৌড় সবাই! আইফেল টাওয়ার থেকে সঙ্গ দিচ্ছেন প্রবাসী আশরাফউদ্দিন চয়ন। হঠাৎ বলা নেই-কওয়া নেই নেমে এলো বৃষ্টি। ছাতা সমেত দে ছুট! কারণ প্লেজোঁ থেকে যেতে হবে মঁপারনাস। তারপর বারসি। শেষমেষ ট্রেন ধরা গেলো।

সকাল ৮টা ৩৮ মিনিটে কান স্টেশনে পৌঁছানোর কথা। প্যারিস থেকে কান ট্রেনের টিকিট লেগেছে জনপ্রতি ১১০ ইউরো। রাতের বেশিরভাগ সময় নিপু ও রাব্বানীর ঘুমিয়ে কাটলো। খুব নিশ্চিন্ত! কে জানতো সকালে ভীষণ এক ধাক্কা খেতে হবে সবাইকে। ব্রাসিওঁ নামের একটি ট্রেন স্টেশনে থামার পর আমরা তিন জন ছাড়া আর কোনও যাত্রী নেই। ভাবলাম রাজার হালে বাকিটা পথ যাবো! হঠাৎ বগিতে এসে ড্রাইভার জানালেন, এটাই শেষ গন্তব্য! মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। বলে কী! আমরা তো যাবো কান, তাহলে এই কথার মানে কী? ইংরেজি বোঝে না লোকটা। টিকিট দেখানোর পর স্টেশনের ভেতরে নিয়ে গেলেন। কাউন্টারে ভদ্রমহিলাকে কী যেন বোঝালেন। এরপর কাউন্টারে টিকিট বিক্রেতা উপায় বলে দিলেন। ব্রাসিওঁ থেকে যেতে হবে মারসাই। তারপর আরেক ট্রেন ধরে কান যাওয়া যাবে। তা না হয় ঠিক আছে। কিন্তু মারসাই যাওয়ার ট্রেন ছাড়বে দুপুর ১টায়। সেখান থেকে কানে পৌঁছানোর ট্রেন ছেড়ে যাবে বিকাল সোয়া ৫টায়। এরপর আর কারও মুখে কোনও কথা নেই। তাও ভালো ভদ্রমহিলা নতুন টিকিট দেওয়ার বিনিময়ে এক পয়সাও নেননি।

‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে ব্রাসিওঁ জায়গাটি আল্পস পর্বত ঘেঁষা। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়নাভিরাম। দূরে বিশাল পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকে! ভালোই সময় কেটে গেলো। কিন্তু মারসাই যাওয়ার পর আরেক ভেজাল! সন্ধ্যা ৬টার ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে। তাতে করে আমাদের টিকিটও বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। তবে স্টেশনে দায়িত্বরত ভদ্রমহিলা বিনামূল্যেই পরের ট্রেনের টিকিট হাতে দিলেন। কিন্তু সেটি ছাড়বে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। ঝামেলা যেন কাটছেই না। ট্রেন নির্ধারিত সময়ে থেকে একঘণ্টা পরে ছেড়ে যাবে। ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে গেলো।

শেষমেষ মারসাই প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এলো। কানে পৌঁছে মোবাইল ফোনে তাকিয়ে দেখি সাড়ে ৯টা বেজেছে। প্রবাসী রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সেজান চৌধুরী স্টেশনে আগেভাগে এসে বসে আছেন। তিনি স্বাগত জানালেন। গত ছয়বার কান উৎসব কাভার করতে এসে একই জায়গায় দুইবার থাকিনি। কিন্তু গতবারের মতো এবারও মোজা গ্রামে আতিথেয়তা দিতে নিয়ে গেলেন সেজান ভাই। বিখ্যাত চিত্রকর পিকাসোর গ্রাম হিসেবে পরিচিত। গ্রামে ঢোকার পরই মন ভরে গেলো নানান শিল্পকর্মে। ‘মুজিব’ টেনে নিলো কানে

/এমএম/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বজ্রাঘাতে প্রাণ গেলো ২ জেলের
বজ্রাঘাতে প্রাণ গেলো ২ জেলের
সমবায় ব্যাংকে চাকরির সুযোগ
সমবায় ব্যাংকে চাকরির সুযোগ
ডেনমার্কে শপিং মলে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৩
ডেনমার্কে শপিং মলে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৩
ট্রেনের ‌'টিকিটযুদ্ধে' নারীরাও
ট্রেনের ‌'টিকিটযুদ্ধে' নারীরাও
এ বিভাগের সর্বশেষ
কানে এবার সেরা কারা
কান উৎসব ২০২২কানে এবার সেরা কারা
স্বর্ণপাম জিতলো সুইডেনের ‘ট্রায়াঙ্গেল অব স্যাডনেস’
কান উৎসব ২০২২স্বর্ণপাম জিতলো সুইডেনের ‘ট্রায়াঙ্গেল অব স্যাডনেস’
কে জিতবে স্বর্ণপাম, সমাপনী অনুষ্ঠান শুরু
কান উৎসব ২০২২কে জিতবে স্বর্ণপাম, সমাপনী অনুষ্ঠান শুরু
ফিপরেস্কি পুরস্কার জিতলো ইরান
কান উৎসব ২০২২ফিপরেস্কি পুরস্কার জিতলো ইরান
তেলের দাম আর কাকে বলে!
কান ডায়েরি-২তেলের দাম আর কাকে বলে!