X
মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
১১ আশ্বিন ১৪২৯
আইয়ুব বাচ্চু স্মরণে বাপ্পী খান

‘আমার মৃত্যুর সাথে এই তথ্যটাও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে’

বিনোদন রিপোর্ট
১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০৭আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:৫৪

আইয়ুব বাচ্চু ও এলআরবি’র জন্য শতাধিক গান রচনা করেছেন বাপ্পী খান। সফলতা ও সংখ্যার বিষয়েও এই জুটি এগিয়ে সবচেয়ে। নব্বই দশকের সংগীতাঙ্গনে বাচ্চু-বাপ্পী ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে থাকলে আজ (১৬ আগস্ট) তাঁর ৬০তম জন্মদিনের কেক কাটা হতো। নিশ্চিত পাশে থাকতেন তাঁর নিকটতম গানসঙ্গী বাপ্পী খান। সেই অভাব ঢেকে রাখতে বাংলা ট্রিবিউন-এর অনুরোধে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিলেন তিনি। বললেন, তাদের পরিচয় পর্ব আর পথচলার গল্প-

আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে ভেতর থেকে একটা চাপ অনুভব করি। অসহায় লাগে। কারণ, মানুষটা যে পাশে নেই- সেটা মনে পড়ে বারবার। তারপরেও আজ কিছু লিখবো। লিখলে যদি হালকা লাগে, ক্ষতি কী। যদিও খুব ভেবেচিন্তে লিখতে বসেছি তাও নয়। খণ্ড খণ্ড কিছু স্মৃতিচারণ করবো; যেটুকু মাথায় আসে।

আইয়ুব বাচ্চু একজন প্রয়াত মানুষ (আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন)। তাই তার জাগতিক সাফল্য, প্রতিষ্ঠা, জনপ্রিয়তা এর কিছুই আমার লেখার উদ্দেশ্য না। এই লেখা আমার মগজে বাস করা নিছক কিছু স্মৃতিচারণ। 

১৯৯০ সালের শুরুর দিকে গাইড হাউজ অডিটোরিয়ামে সোলস ব্যান্ডের শো দেখতে গেলাম। তখন বাচ্চু ভাইর একক অ্যালবাম ‘ময়না’ রিলিজ হয়েছে। আইয়ুব বাচ্চুর লেখা, গাওয়া ও সুর করা একটা গান আমার খুব মনে লেগেছিল সেই অ্যালবামের। ‘ও বন্ধু তোমায় যখনই মনে পড়ে যায়/ বুকেরই মাঝে বড় বেশি ব্যথা বাজে/ আমার ইচ্ছে করে প্রাণ ভরে তোমায় দেখি/ আমায় কথা দাও কখনও ছেড়ে চলে যাবে না...’।

কি অসাধারণ কথা! কি মর্মস্পর্শী সুর! কি আবেগঘন কম্পোজিশন, গিটার, গায়কী। এই গান শুনেই একজন মিউজিশিয়ান আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি আসক্ত হয়েছিলাম প্রথম। আমি ভেবেছিলাম এই গানটি তিনি সেদিন গাইবেন। কিন্তু এত উত্তেজনায় সোলসের শো দেখছিলাম যে গানটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ যখন শো শেষ হলো, তখন খেয়াল হলো গানটির কথা। ততক্ষণে যন্ত্রপাতি খোলা শুরু হয়েছিল। লোকজন প্রায় সবাই চলে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে স্টেজের সামনে এসে বললাম, ‘‘বাচ্চু ভাই, ‘ও বন্ধু তোমায়’ গানটার দুটো লাইন শোনাবেন?’’ তিনি অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে। তারপর শুধু গিটারেই গানটার প্রথম চার লাইন শোনালেন। আমি মুগ্ধতার সাথে তার লেখা, সুর আর গানের প্রেমে আবদ্ধ হলাম। 

আইয়ুব বাচ্চু ও বাপ্পী খান পরে একবার আমি তাকে সেদিনের ঘটনা মনে করিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, আমার গানের অনুরোধে এত অবাক হয়েছিলেন কেন? তিনি বলেছিলেন, ‘‘মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে অ্যালবাম বের হলো। কেমন চলবে তখনও বুঝতে পারছিলাম না। প্রোডিউসার বলছিলেন, ‘ময়না’ গানটা হিট হতে পারে (আমি হিট শব্দটি ব্যবহার করি না, বাণিজ্য সম্ভাবনার খাতিরে লিখলাম)। কিন্তু সেই অ্যালবাম থেকে ‘ও বন্ধু তোমায়’ গানটা তখন কেউ অনুরোধ করতে পারে, ভাবতেই পারিনি। ভালো একজন শ্রোতাকে পেলে যেমন ভালো লাগে, সেদিন তেমন করেই তাকিয়েছিলাম তোর দিকে।’’

অনেকেই জানেন না এখন, আমি কিন্তু গায়ক থেকে গীতিকার। ৯০ সালের দিকেই আশিকুজ্জামান টুলুর সংগীতে আমার প্রথম সেলফ টাইটেল সলো অ্যালবামের কাজ শুরু হয় সারগাম স্টুডিওতে। সারগাম তখন গানের মানুষের মিলনমেলা। আমার বাসা ছিল পল্টন। আর সারগাম ছিল কাকরাইল। প্রতিদিনের বিকাল আর সন্ধ্যার সময়টা তখন সারগামের জন্য বরাদ্দ। কত মানুষের সাথে পরিচিত হলাম সেখানে। আইয়ুব বাচ্চু তখন প্রায়ই আসতেন নানা কাজে। সেই সুবাদে পরিচয়। তেমন ঘনিষ্ঠ কিছু নয়। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর ছিল মানুষকে মনে রাখার সাংঘাতিক ক্ষমতা। আমি একদিন সারগামে জানালাম, আমার বাসায় জৈনপুরের একজন পীর সাহেব আসবেন। বাচ্চু ভাই আমাকে বললেন, উনি দেখা করতে চান। পরের দিন তিনি আমার বাসায় চলে এলেন। সবার সাথে পরিচিত হলেন। তিনি খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তিনি নিয়মিত মাজার জিয়ারত করতেন। আমি বাংলাদেশের যত জায়গায় তার সাথে গিয়েছি, কোনও মাজার চোখে পড়লেই সালাম দিতে দেখেছি।

যাহোক, বাংলা ১৩৯৮ এর পহেলা বৈশাখ। আমি মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ভর্তি হয়েছি (তিন মাস মাত্র সেখানে ছিলাম)। কলাভবনের পাশের মাঠে বিরাট বৈশাখী কনসার্ট হবে। উত্তেজনার শেষ নাই। বন্ধুরা মিলে কনসার্টে গেলাম। অনেক অনেক মজা হলো। তখনও সোলস স্টেজে ওঠেনি। আমি উৎসুক হয়ে স্টেজের পেছনে গেলাম। হঠাৎ দেখলাম আইয়ুব বাচ্চু একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবছেন। আমি দৌড়ে গিয়ে সালাম দিলাম। উনি আমাকে চিনতে পারলেন। বললেন, ‘কেমন আছিস?’ সেদিন সাথে কে কে ছিল এখন মনে আসছে না। আমি বললাম, বাজাবেন না? উনি বিষণ্ণ একটা হাসি দিয়ে আমার কাছে ঝুঁকে বললেন, ‘আমি সোলস ছেড়ে দিলাম রে!’ 

আমার মাথায় বৈশাখের তপ্ত আকাশটা ভেঙে পড়তে শুধু বাকি ছিল। সোলস ছাড়া আইয়ুব বাচ্চু আর আইয়ুব বাচ্চু ছাড়া সোলসের কথা ভাবতেই কেমন উথাল-পাথাল শুরু হয়েছিল বোঝাতে পারবো না। এক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি চেতনায় ফিরে আসলাম। এরমধ্যেই ভেবেছি অনেক প্রিয় বিদেশি ব্যান্ড ভেঙে যাবার ঘটনা। নতুন করে শুরু করার ঘটনা। আমি অসংলগ্ন সান্ত্বনা দেবার জন্য তাকে বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি হাসলেন। বললেন, ‘আমি একটা ব্যান্ড করেছি, ইয়েলো রিভার ব্যান্ড (পরে লিটল রিভার ব্যান্ড)। আজকে প্রথম শো একটা বিদেশি ক্লাবে। ঢাকার সব ইন্সট্রুমেন্ট এখানে এসেছে। এখানে শো শেষ হলে, কিছু কিছু ইন্সট্রুমেন্ট আমার শোতে যাবে। তাই অপেক্ষা করছি।’ 

বাচ্চু ভাইর চোখে-মুখে একদিকে বিষাদ, অন্যদিকে উদ্দীপনা। কেমন যেন অপার্থিব এক চেহারা সেদিন আমি দেখেছিলাম বোঝাতে পারবো না। একজন মানুষ আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি এই অমোঘ প্রীতির সূচনা বোধহয় তখন থেকেই শুরু। বাচ্চু ভাইয়ের একটা খুব প্রিয় অস্ট্রেলিয়ান ব্যান্ড ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। একসময় ঘোষণা দিয়ে সেটা বন্ধ করা হয়। তখন তিনি নিজের ব্যান্ডের নাম দেন লিটল রিভার ব্যান্ড (এল আর বি)। অনেক দিন এই নামেই চলে। পরে ওই ব্যান্ডটি আবার সংগঠিত হয়। তখন বাচ্চু ভাই অনেক বিবেচনা করে ‘এলআরবি’ ঠিক রেখে ব্যান্ডের নাম রাখেন ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’। 

যাহোক, গান গেয়ে ভেবেছিলাম অনেক কিছু করে ফেলবো। সরকারি টিভির দালালকে উৎকোচ দিতে হবে বিধায়, গান প্রচারিত হলো না। সে সময় এর খুব চল ছিল। যাক, হতাশ হয়ে গান গাওয়া প্রায় বন্ধ করলাম। কিন্তু সারগামে আড্ডা চালু ছিল। টুলু ভাই, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই আর ফান্টি ভাইয়ের সাথে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয় তখন। ৯১ সালের কথা, তখন এলআরবি’র প্রথম ডাবল অ্যালবাম-এর কাজ প্রায় শেষের দিকে। জেমস ভাইয়ের সুরে ‘ম্যানিলা; পেনফ্রেন্ড’ নামে একটা গানের কথা আমি লিখেছিলাম অন্য শিল্পীর জন্য। বাচ্চু ভাই ওই রেকর্ডিংয়ে এসে গানটা শুনলেন। জেমস ভাইকে বললেন, ‘ভালো হইছে তো। এটা কার লেখা?’ জেমস ভাই বললো, ‘এই যে বাপ্পীর লেখা। ব্যাটাকে জোর করে গান লেখালাম। গায়ক থেকে গীতিকার। হা হা হা।’ বাচ্চু ভাই কিছুক্ষণ বসলেন। যাবার আগে আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘‘এলআরবি’র গান রেকর্ড চলছে, তুই গান দে।’ 

আইয়ুব বাচ্চু ও বাপ্পী খান আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমি গান লিখবো? আমি বললাম, গান তো নাই। বাচ্চু ভাই বললো, ‘কবিতা আছে?’ বললাম, ‘আছে কিছু।’ বাচ্চু ভাই বললো, ‘কালকে নিয়ে আয়।’ রাতে আমার অবস্থা খারাপ। বাচ্চু ভাইকে লেখা দিতে হবে! আমার সলো অ্যালবামে আমার লেখা আটটি গান ছিল। সেগুলো প্রয়োজনে বা অতি আবেগে লেখা। কিন্তু বাচ্চু ভাইকে গান দিতে হবে, বিস্ময়কর লাগছিল। যাক, আমার দুইটা কবিতার খাতা ছিল। একটা রোমান্টিক আর অন্যটা সাধারণ। আমি ভাবলাম, সবাই তো রোমান্টিক গান করে, আমি অন্য একটা স্টাইলে গান করি। মানে রোমান্টিক না করাটাই একটা স্টাইল ধরে নিলাম! বাস্তব, জীবনঘন, আত্মিক, কাল্পনিক, কল্পকথা এসবের একটা কবিতার খাতা পরের দিন বিকালে সারগামে নিয়ে গেলাম। বাচ্চু ভাইকে পেলাম না। ফারুক বা ফরিদের কাছে খাতাটা রেখে এলাম। অনেক রাতে বাচ্চু ভাই বাসায় ফোন করে বললেন, ‘এটা তুই কী করলি?’ আমি বললাম, কী? হেসে বললেন, ‘কালকে ছয়টায় সারগাম আয়।’ 

অথচ আমি আবোল-তাবোল অনেক কথা ভাবছিলাম। ভাবলাম লেখা এতই আজব যে বাচ্চু ভাই পছন্দ করেন নাই। পরের দিন সারগাম গেলাম ভয়ে ভয়ে। বাচ্চু ভাই আমার মাথায় আলতো করে হাত দিয়ে হাসলেন। স্বপন ভাই, জয় ভাই আর টুটুল অন্যরকম করে তাকাচ্ছিল। যাক, এলআরবি’র সেশনে ঢোকার সৌভাগ্য হলো। এবার আমার হার্ট ফেইল হবার পালা। সেদিন রেকর্ড হলো, আমার কবিতা ‘পেনশন’। অফিসের দ্বারে দ্বারে দিন প্রতিদিন/ মেলে নাকো পেনশন চলে যায় দিন...।

আমার চোখে তখন ভালোলাগার অশ্রু। আমার কবিতা যে এভাবে গান হতে পারে কখনও ভাবিনি। যাক, সেই থেকে শুরু। ওই অ্যালবামে আরও দুটি গান আমার ছিল, ‘জীবনের মানে’ ও ‘এক কাপ চা’। তারপর দিন কেমন করে কেটেছে বোঝাতে পারবো না। সেই শুরু। এরপর ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৪- এই তিন বছর আমি আর বাচ্চু ভাই প্রায় প্রতিদিনই গান নিয়ে বসেছি। আমাদের একটা সং-ব্যাংক ছিল। গান কে গাবে, কোন প্রোডাকশন করবে এসবের বালাই না রেখে আমরা গান জমাতাম। এই তিন বছরেই আমরা দুজনে প্রায় অর্ধশত গান বেঁধেছিলাম।

১৯৯২ সালের কোরবানির ঈদে এলআরবি’র প্রথম ও ডাবল অ্যালবাম রিলিজ হয়। ক্যাসেট মাস্টার বাচ্চু ভাইয়ের পছন্দ হয়নি। তাই আবার করা হলো। আমার মনে আছে, কোরবানির ঈদের দিন বিকালেও আমরা স্টুডিওতে ছিলাম। আস্তে আস্তে পাড়ায় মহল্লায় ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘মাধবী’, ‘হকার’ বাজতে শুরু করলো। শো আসা শুরু করলো। আমি প্রায় সব শো-তেই যেতাম। 

একটা কনসার্টের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শো। দুপুর বেলার শো। পুরা মাঠভরা দর্শক। এলআরবি’র নতুন গানগুলো তখন গাওয়া হতো। মাঠের একপাশে একটা ছোট রুম ব্যান্ডের জন্য রাখা হয়েছিল। শো-এর পর কোনোভাবে আমরা ওই রুমে গিয়ে বসলাম। এত লোক ছবি তুলছিল যে বেশ ভালো লাগছিল। পাশাপাশি আমরা বসা। সম্ভবত জয় ভাই, স্বপন ভাই, আমি, বাচ্চু ভাই এবং শেষে টুটুল। হঠাৎ স্বপন ভাই আমার দিকে একটা খাতা এগিয়ে দিলেন। আমি প্রথমে বুঝিনি। স্বপন ভাই বললেন, ‘আরে অটোগ্রাফ দাও।’ আমি তো শঙ্কিত হলাম। খানিক লজ্জাও লাগছিল। ভাবলাম কি এমন করলাম যে অটোগ্রাফ চাইছে। এক মিনিট পরে খাতাটা বাচ্চু ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলাম। তিনি বিষয়টা বুঝলেন। মুচকি হেসে বললেন, ‘আরে দে দে, জীবনে আরও দিতে হবে। সবে তো শুরু।’ অবশেষে আমি অটোগ্রাফ খাতায় লিখলাম, ‘আমার অটোগ্রাফ দেবার বয়স হয়নি- বাপ্পী’। 

তখনও শুধু বাপ্পী নামেই লিখতাম। একদিন বাচ্চু ভাইকে বললাম, এক নামে তো আরও বাপ্পী আছে। মানুষ আমাকে আলাদা করবে কী করে? তিনি বললেন ‘বাপ্পী’র সাথে পারিবারিক ‘খান’ লাগিয়ে দে। এরপর ‘সুখ’ ও ‘স্টারস’ অ্যালবাম থেকে বাপ্পী খান হিসেবেই লিখছি। 

আরেকটি প্রসঙ্গ মনে এলো। ‘তুমিহীনা সারাবেলা’ অ্যালবাম-এর কাভার ডিজাইন করেছে অংশু। আমি টুটুলকে বললাম (ও আমার চেয়ে একটু বড়, কিন্তু আমরা তুই-তোকারি দোস্ত), শুধু টুটুল লেখা যাবে না, আলাদা করা যাচ্ছে না। টুটুল বললো, ‘বসকে জিজ্ঞেস কর।’ আমি বসকে বললাম। তিনি হাসলেন। বললেন, ‘তোরা ঠিক কর’। টুটুল আমাকে ইশারায় বোঝালো, আমাকে ঠিক করতে। আমি জানতাম ওর পুরা নাম ‘শহীদুল ইসলাম টুটুল’। মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। বললাম, তোর নাম ‘এস আই টুটুল’। আসল নামের অক্ষর থেকে নাম। মুচকি হেসে বললাম, মানুষ পুলিশ ভেবে হালকা ভয়ও পাবে। টুটুল খুশি হলো। বস ডাকলেন, ‘এস আইইইইইইইইই...’। তখন থেকে আমরা ওকে এস আই বলেই ডাকি। মানুষ ডাকে এস আই টুটুল।

 

১৯৯৭, ১৯৯৮, ১৯৯৯ এই তিন বছর আমি, বস আর এস আই একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছি। ব্যান্ডের কাজে এস আই ছিল বসের সহযোগী আর আমি নানা আইডিয়া বের করতাম। গান-বাজনা ছাড়াও আমাদের তিন জনের ব্যক্তিগত জীবন এক সুরে বাজতো। এস আই টুটুল বাচ্চু ভাইকে এত সম্মান করতো যে সেটা ভয়ের পর্যায়ে থাকতো। আমি সম্মান করতাম ঠিকই, কিন্তু আমি ছিলাম ঠোঁটকাটা। আমার গঠনমূলক সমালোচনা বাচ্চু ভাই ভালবাসতেন এবং মানতেন। সমবয়সী বন্ধুর মতো তিনি আমার সাথে মিশতেন। আমার মনে আছে, কোনও নতুন গান ভালো লাগলে আমি বলতাম, ‘thank you ayuuubbb’, বস বাচ্চাদের মতো খুশি হতেন। ভয়েস দেবার সময় আমাকে প্যানেলে বসাতেন, যাতে উচ্চারণের সমস্যা হলে আমি বলি। এমন অনেক গান আছে, আমার অনুপস্থিতিতে ওকে হবার পরেও, আমি পরে যখন কোনও সমস্যা পেয়েছি, বাচ্চু ভাই হাসিমুখে আবার করেছেন। 

তখন আমরা খুব পিংক ফ্লয়েড শুনতাম। স্টেজেও এলআরবি কাভার করতো ‘ওয়াল’, ‘মানি’ ও ‘টাইম’। আমি একদিন বাচ্চু ভাইকে খুব ধরলাম ‘সাইন অন ইওর ক্রেজি ডায়মন্ড’ করার জন্য। বাচ্চু ভাই বললেন, ‘মানুষ তো ঝিমিয়ে যাবে রে’। আমি বললাম, সাউন্ড ব্যালেন্স করতেও তো কিছু সময় লাগে। এটা দিয়ে কনসার্ট শুরু করলে কেমন হয়? বাচ্চু ভাই শুনলেন আমার কথা। তারপরে অনেক শোতে এই গান দিয়েই এলআরবি শো শুরু করতো। আরেকটা বিষয় ছিল। যেহেতু আমরা ক্রমাগত নতুন গান বানাতাম, প্রতি শোতে আমরা একটা নতুন গান করে দর্শকদের শোনাতাম তাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য। 

যাক, মূল প্রসঙ্গে আসি। শিশু একাডেমির একটা শো। এলআরবি এবং আরেকটি ব্যান্ড। যথারীতি প্রথম ব্যান্ডের শো শেষ। এলআরবি স্টেজে উঠে ‘সাইন অন ইওর ক্রেজি ডায়মন্ড’ মাত্র শেষ করেছে। হঠাৎ চার-পাঁচ জন পুলিশ বাঁশি বাঁজাতে বাজাতে স্টেজে উঠে গেলো। তারা সোজা বাচ্চু ভাইকে ঘিরে ধরে টানাটানি শুরু করলো। ব্যান্ডের অন্য তিন জন ভয়ে পাথর হয়ে গেছে। আমার মাথায় বজ্রপাত আঘাত করলো। ততক্ষণে বাচ্চু ভাইয়ের শার্ট ছিঁড়ে গেছে। সাদার মধ্যে কালো বল প্রিন্টের একটা শার্ট ছিল। ওই শার্টটা অনেক বছর বস যত্ন করে রেখেছিলেন। সেদিন আমার পাশে ছিল মির্জা; মিউজিশিয়ান। আমরা দুজন লাফ দিয়ে স্টেজে উঠে গেলাম। আমরা দুজন বাচ্চু ভাইকে সামনে-পিছে জড়িয়ে ধরলাম। পুলিশরা ক্ষেপে আমাদের লাঠি দিয়ে আঘাত করে। আমি চিৎকার করছিলাম, আপনারা কী করছেন? কাকে ধরে টানছেন? গান থামালেন কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। 

সবাইকে সার্চ করে হল থেকে লোক সব বের করে দিলো। কনসার্ট পণ্ড। পুলিশের সাথে আলোচনায় জানা গেলো যে আমাদের গানের জগতের কেউ খবর দিয়েছে যে বাচ্চু ভাই নাকি সন্ত্রাসীদের শেলটার দেয়, আর এই কনসার্টেও নাকি অস্ত্রসহ কেউ কেউ আছে। এজন্য তারা বাচ্চু ভাইয়ের শোতে সার্চ করার নির্দেশ পেয়েছে। কিন্তু বাচ্চু ভাইকে টেনে স্টেজ থেকে নামাবার কোনও কথা ছিল না। পরের দিন আমি আর বাচ্চু ভাই রমনা থানায় গেলাম। ওসি বাচ্চু ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন। দুজন কনস্টেবলকে ডেকে মাফ চাইতে বললেন। তারা যে ঘটনা বললো, শুনে আমরা থ বনে গেলাম। কোনও এক ব্যান্ডের লোকেরা টাকা দিয়ে এই কাজ করিয়েছে। বাচ্চু ভাই আমাকে প্রমিজ করালেন, ওই ব্যান্ডের নাম যেন আমি কখনও না বলি। আমি এই প্রমিজটি রেখেছি। কোনোদিন এই ঘটনা আমি কোথাও শেয়ার করিনি। এখন করলাম একটা কারণে। বাচ্চু ভাই চাইলে তাদের নামে কেস করতে পারতেন। করেননি। এই ঝামেলায় উনি জড়াতে চাননি। সেই ব্যান্ডের কেউ এই লেখা পড়লে, জেনে রাখবেন বাচ্চু ভাই আপনাদের মাফ করেছেন। 

এমনকি আমার প্রবল আপত্তির পরেও একই স্টেজে তাদের সাথে বাজিয়েছেন বাচ্চু ভাই। সবার কাছে অনুরোধ, এই তথ্যটি কেউ আমার কাছে জানতে চাইবেন না। আমার মৃত্যুর সাথে এই তথ্যটাও পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। ওয়াদা আমি অটুট রাখবো শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত, ইনশাআল্লাহ। 

আগে আমাদের সং-ব্যাংক-এর কথা বলেছিলাম। এক বছর কাজ করার পর প্রায় দুই ডজন গান জমা হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় এক ডজনই আমার লেখা গান। ডাবল অ্যালবামে সারগামের কাছ থেকে যেসব প্রতিশ্রুতি ছিল, তারা তা পূরণ করতে পারেনি। তাই আমরা একটু নাখোশ ছিলাম। এরমধ্যে একটা মিক্সড অ্যালবামের দৌলতে সাউন্ডটেকের সুলতান মাহমুদ বাবুল ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। উনি এলআরবি’র একটা অ্যালবাম-এর জন্য বাচ্চু ভাইকে খুব রিকোয়েস্ট করছিল। বাচ্চু ভাই মত দিচ্ছিলেন না। সারগামের বাইরে অ্যালবাম করার জন্য তখন অনেক সাহস দরকার ছিল। আমি বাচ্চু ভাইকে সাহস দিলাম। বললাম, গানতো রেডি। প্রোডিউসার যেই হোক, গান ভালো হলে চলবে। বাচ্চু ভাই রাজি হলেন। একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আমরা বসলাম। বাচ্চু ভাই শর্ত দিলেন, ফোক গান দিবেন না; (তখন প্রতিটি অ্যালবামে একটা ফোক গান থাকা অলিখিত নিয়ম ছিল)। বাবুল ভাই রাজি হলেন। তখনকার সময়ের সবচাইতে বেশি পেমেন্টে সাউন্ডটেকের সাথে কথা ফাইনাল হলো। মুখের কথাই ফাইনাল, কোনও অ্যাগ্রিমেন্ট হতো না।

তারপর শুরু হলো গান বাছাই। সং-ব্যাংকে তখন ইতোমধ্যে দুই ডজন গান জমা পড়েছে। সেখানে অর্ধেকেরও বেশি গান আমার লেখা ছিল। সেখান থেকে একে একে ‘মানুষ বনাম অমানুষ’, তারপরে ট্র্যাকের ওপর প্রথম গান লিখলাম ‘ক্ষণিকের জন্য’। তখন আমরা খুব পিংক ফ্লয়েডের গান শুনতাম। সে কারণে পিংক ফ্লয়েডের একটা প্রচ্ছন্ন প্রভাব এই অ্যালবামে ছিল এবং রজার্স আমাদের খুব প্রিয় গীতিকবি ছিলেন; তার চিন্তাভাবনাগুলো আমাদের প্রেক্ষাপটে লেখার মধ্যে ফুটে উঠুক সেই চেষ্টা করেছি। সেখান থেকে সুর ও সংগীতের দিকে বাচ্চু ভাই যখন মনোনিবেশ করেন তখন আসলে ‘সুখ’-কে শুধু একটা গান বলা যাবে না। এটা বলা যেতে পারে একটা গীতিকল্প। আমাকে যে পরিমাণ স্বাধীনতা আইয়ুব বাচ্চু দিয়েছেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। একদিন প্যাডে প্র্যাকটিস চলছিল। আমি ঢুকে মুচকি হাসছিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, ‘কি এনেছিস দে’, আমি দিলাম। লিখলাম,
‘গতকাল রাতে বিবেক আমার/ স্বপ্নের কড়া নেড়ে করলো জিজ্ঞেস/ আমায় ছাড়া আর কতদিন রবে?’

আইয়ুব বাচ্চু (১৬ আগস্ট ১৯৬২-১৮ অক্টোবর ২০১৮) বাচ্চু ভাই লিরিকটি হাতে নিয়ে চিন্তায় ডুবলেন। আমাকে বললেন, ‘না না বাপ্পী, এটা কেমনে গান হবে? বাদ দে।’ আমি বললাম, হবে, হবে। একটা হাসি দিলাম। দৃষ্টিতে ভরসা দিলাম। বাচ্চু ভাই টুটুলকে বললো, ‘ই মেজর ধর তো।’ আমি চোখ বুজলাম। বাচ্চু ভাইয়ের হাতে যে ম্যাজিক ছিল, আমি এত সুন্দর গিটার বাংলাদেশে আর কাউকে বাজাতে দেখিনি। একঘণ্টায় গান শেষ। রেকর্ড হবে অডিও আর্টে। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার আজম বাবু ভাই। কী এক কারণে মেশিন ড্রামস ইউজ হবে। আমি বাধা দিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, ‘আরে শোন না আগে, মেশিন মনে হলে বাদ দিবো।’ ‘সুখ’ অ্যালবামের পুরা ড্রামসটা একটা ভাড়া করা রোল্যান্ড ড্রাম মেশিনে বাচ্চু ভাই নিজে প্রোগ্রাম করেছিলেন। ‘আমি যে কার’ লিরিকটা বাচ্চু ভাইয়ের এত পছন্দ ছিল যে একটা সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবনে যত লিরিক নিয়ে তিনি কাজ করেছেন, এটা সবচেয়ে প্রিয়।’ 

‘অসুস্থ আমি এক হাসপাতালে’ গানটার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। তখন বাচ্চু ভাইয়ের ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট। ভর্তি ছিল হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। আমরা খুব যাওয়া-আশা করতাম। রাতে আমি, নিলয় দাস যেতাম। একদিন হঠাৎ বাচ্চু ভাই এসে বললেন যে হাসপাতালে এক লোকের সাথে তার কথা হলো। এজন্য তার খুব মন খারাপ। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন? বাচ্চু ভাই বললো, ওই রোগীটাকে ভিজিটিং আওয়ারে কেউ দেখতে আসে না, তারা তাকে ভর্তি করে চলে গেছে। তাই আমার মনটাও খুব খারাপ, বাপ্পী একটা গান করলে কেমন হয়? আমি খুবই বিরক্ত হলাম। বললাম ভাবী যখন-তখন অবস্থা, বাচ্চা হবে, আর আপনে আছেন গান নিয়া? আপনি আজব মানুষ!

বাচ্চু ভাই শিশুদের মতো হাসলেন। কথাটা কিন্তু আমার মাথায় আটকে ছিল। নিজেকে সেই রোগী ভেবে, সেই রাতেই হলি ফ্যামিলির নিচতলার বারান্দায় বসে লিখলাম এই গান। ওই অ্যালবামের ড্রামস মেশিন আর বেইজ বাচ্চু ভাইয়ের বাজানো। পরে জয় ভাই আর স্বপন ভাই স্টেজের জন্য ওগুলো তুলে নিতো। বাচ্চু ভাই এত ভালো বেইজ গিটার বাজাতেন যে বাংলাদেশের হাতেগোনা দুই তিন জন তার কাছাকাছি ছিল। বাচ্চু ভাই অনেক সময় বেসিক কি বোর্ডের কাজও করতেন।

এভাবেই আমরা কখন যেন শতাধিক গান করে ফেললাম দুজনে বসে। এরমধ্যে ৪০টির বেশি এলআরবি’তে। বাকিগুলো বাচ্চু ভাই একক অ্যালবামেরে জন্য করেছেন।

এলআরবি আর আইয়ুব বাচ্চুর সাথে আমার এই ঘনিষ্ঠতার কথকতা আমৃত্যু স্মৃতি হয়ে থাকবে।

/এমএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বঙ্গমাতা সেতুর পিলারে মালবাহী জাহাজের ধাক্কা
বঙ্গমাতা সেতুর পিলারে মালবাহী জাহাজের ধাক্কা
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
এ বিভাগের সর্বশেষ
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
বাঘ যখন সিনেমা হলের সামনে!
অপারেশন সুন্দরবনবাঘ যখন সিনেমা হলের সামনে!
প্রতিদিন মনে হয় আজই প্রথম: মানুষী
প্রতিদিন মনে হয় আজই প্রথম: মানুষী
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তথ্যচিত্র ‘শেখ হাসিনা: আ ট্রু লেজেন্ড’
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তথ্যচিত্র ‘শেখ হাসিনা: আ ট্রু লেজেন্ড’
লাকী আখান্দের শেষ, রন্টির প্রথম
লাকী আখান্দের শেষ, রন্টির প্রথম