X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

লাকসাম থেকে হলিউড

পার্থ সনজয়
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৩৯আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৭:৪৬

কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলায় বেড়ে ওঠা। এরপর দ্রুতলয়ে ঢাকা হয়ে নিউ ইয়র্ক; সেখান থেকে সোজা লস অ্যাঞ্জেলেস। কাজ করছেন মোশন গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে বিশ্বখ্যাত স্টুডিও ওয়াইল্ড কার্ড ক্রিয়েটিভে। সেখানে বসে এরইমধ্যে তৈরি করেছেন হলিউডের মেগা সব কনটেন্টের ট্রেলারের মোশন গ্রাফিক্স। তালিকায় রয়েছে অস্কারজয়ী স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ থেকে শুরু করে মারভেল স্টুডিওসের ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’ ছবির ট্রেলারের মোশন গ্রাফিক্স। লাকসামের তরুণ জিসানের এমন বিশ্বজয়ের বিস্তারিত গল্প জানা যাবে এই আলাপে। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সম্প্রতি জুমে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হলেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: শুরুর দিকে স্বপ্নটা কি এমনই ছিল, যে হলিউডের ছবিতে গ্রাফিক্সের কাজ করবেন! 

কামরুল হাসান জিসান: সত্যি বলতে, আমি কখনও মোশন গ্রাফিক ডিজাইনার হতে চাইনি। চেয়েছি ফিল্মমেকার হতে। একটা সময় মনে হতো, মেকার হতে হলে আমাকে সব জানতে হবে। বাংলাদেশে থাকতে ভিনদেশি ছবি দেখে ইন্সপায়ার্ড হতাম। ওই টাইপের মুভিতে হাই ভিএফএক্স, সিজি’র ব্যবহার দেখতাম। পরবর্তী সময়ে যখন দেখলাম, এটা বাংলাদেশে সম্ভব না, তখন নিজে শেখা শুরু করি। ভাবতাম, যদি সিনেমা বানাতে হয়, তবে নিজেরটা নিজেকেই করতে হবে।

মূলত সেই লক্ষ্য থেকে আমার গ্রাফিক্স শেখা। কোভিডের সময়টায় আমি ভাবছিলাম, দিন চলে যাচ্ছে কিছুই করা হচ্ছে না। কারণ, আমেরিকায় সিনেমা বানানো অনেক কঠিন। ইন্ডাস্ট্রি অনেক টাফ। কোভিডের সময় মনে হলো, আচ্ছা ঠিক আছে, আমি হলিউডে কাজ করতে চাই। তো কোনটা সহজ? দেখলাম মোশন গ্রাফিক্সের লোকের স্বল্পতা রয়েছে। সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলাম।  

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বাংলাদেশ থেকে নিউ ইয়র্ক গেলেন। সেখান থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে। এই জার্নিটার কথা শুনতে চাই।

কামরুল হাসান জিসান: আমি যদি সিনেমায় কাজ করতে চাই, তাহলে লস অ্যাঞ্জেলেসে আসতেই হবে। এবং আমি যখন আসি, আমার মনে আছে, এখন থেকে সাড়ে পাঁচ বছর আগে, আমার পকেটে মাত্র ২০০ ডলার। যা কিছুই নয় এখানকার জীবনযাত্রার পরিমাপে। একদম খালি পকেটে আমি নিউ ইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে আসি। কোথায় থাকবো জানি না। কাজ পাবো কিনা, তাও জানি না।
 
ফিল্ম নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমার কোনও পড়ালেখা নেই। আর্ট নিয়ে কোনও পড়ালেখা নেই। ডিজাইন নিয়ে পড়ালেখা নেই। আমি যা শিখেছি, নিজে নিজেই। ইউটিউব থেকে, গুগল থেকে। এবং এখনও আমি কাজ করছি কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই। আমি দেখেছি, হলিউডে আমার অনেক কলিগ আছে, তারাও আমার মতো। যেমন আমার এক কলিগ, যাকে আমার মেনটর মনে করি, সে হলিউডে কাজ করছে ২৮ বছর ধরে। সেও কিন্তু কোথাও কাগজে-কলমে শেখেনি। অবশ্যই ফিল্ম স্কুলে যদি যেতাম আমি, এই পথচলা হয়তো অনেক সহজ হতো। আবার এটাও সত্য, আর্ট ফর্ম নিয়ে কাজ করতে হলে মনে হয় না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরকার আছে। এটা পুরোটাই আপনার স্বপ্ন আর কল্পনার বিষয়। আপনি তা কতটা অনুবাদ করতে পারছেন, সেটাই আসল। হলিউডের বেশিরভাগ ছবিই ইমাজিনেশন থেকে তৈরি। আপনি ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জে’র কথাই ধরুন না। 

বাংলা ট্রিবিউন: লস অ্যাঞ্জেলেসে আপনার শুরুটা কীভাবে হলো?

কামরুল হাসান জিসান: ২০২১-এর নভেম্বরে আমি কাজ শুরু করি, এখন যে কোম্পানিতে আছি ‘ওয়াইল্ড কার্ড ক্রিয়েটিভ গ্রুপ’-এ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। ওরা প্রথম সপ্তাহে আমাকে কোনও কাজই দেয়নি। শুধু বলেছে, তুমি দেখো আমরা কীভাবে কাজ করি। কাজ করতে এসে দেখেছি, ওরা খুব হেল্পফুল। আমি কোনও কাজ পারছি না বলতেই ওরা আমাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে। অথবা টিউটরিয়াল খুঁজে বের করে দিয়ে বলছে, এভাবে শেখো। 

এর এক সপ্তাহ পর ‘লাস্ট নাইট ইন সোহো’র কাজ করলাম। তখন ছবিটা রিলিজ হয়ে গেছে, কিন্তু টেলিভিশনের জন্য টিভি স্পট বানাতে হয় আমাকে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের। দ্বিতীয় সপ্তাহে করলাম ‘হাউস অব গুচি’র ট্রেলার। তিন সপ্তাহ পর হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলো ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’র কাজ করবো কিনা! আমি সত্যিকার অর্থে রসিকতা ভাবছিলাম। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমার এটাই মনে হয়েছে। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, আর ইউ কিডিং? তারা বললো, নো, ম্যান, সিরিয়াস।

তারপর আমি স্টিফেন স্পিলবার্গের এই কাজটা করি। আমরা এই ছবির বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের কাজও করি। তিন মাস ধরে। এরপর একটা অনলাইন স্ট্রিমিং-এর কাজ এলো। যা আমি একাই করি। এরপর কার্দাশিয়ানের একটা কাজ করি। হলিউডে আমি অনেক টার্মই বুঝতাম না। এই টার্মগুলো হলিউডে কাজ না করলে জানা যায় না। এমনকি আপনি বড় বড় ফিল্ম স্কুলে পড়েও তা বুঝবেন না। কাজ করতে গিয়েই এগুলো শিখতে হয়। আমিও তা-ই। কাজ করতে করতেই শিখেছি। অনেক সময় ওদের একদিনে একশ’টা প্রশ্ন করেছি। ওরা কখনও বিরক্ত হয়নি। 

কার্দাশিয়ানের কাজ যখন করি, এটা বড় বাজেটের ছিল এবং অনেক কঠিন ছিল। সত্যি বলতে কি, আমিও জানতাম না কিছু টার্ম। আমি সারা দিন ৮-৯ ঘণ্টা অফিস করে বাসায় এসে টিউটোরিয়াল দেখে প্র্যাকটিস করে পরদিন অফিসে গিয়ে চেষ্টা করতাম। 

এরপর আমি একটা অন্য ফার্ম থেকে অফার পাই। আমি তখন ফ্রিল্যান্সার। বর্তমান কলিগদের বলতেই বললো, ‘যেও না। তুমি এখানে ফুলটাইম স্টাফ হিসেবে জয়েন করো।’ আমি তখন ফুলটাইমই কাজ করি, কিন্তু আমার পজিশন ছিল ফ্রিল্যান্সার। এরপর থেকে আমি এখানে স্টাফ হিসেবে কাজ শুরু করি।

বাংলা ট্রিবিউন: ওয়াইল্ড কার্ড ক্রিয়েটিভ গ্রুপ কেমন স্টুডিও? মানে এর গভীরতা মাপার জন্য বলছি...
 
কামরুল হাসান জিসান: একটা বিষয় বলি, হলিউডে সিনেমার জন্য আলাদা স্টুডিও, ট্রেলারের জন্য আলাদা। ট্রেলার স্টুডিওগুলো ছবির ট্রেলার, ওপেন ক্রেডিট, ক্লোজিং ক্রেডিটের কাজ করে। আমাদেরটা ট্রেলার স্টুডিও। আমার স্টুডিও ‘অ্যাভাটার’র কাজ করেছে। যে কয়টি ট্রেলার স্টুডিও আছে লস অ্যাঞ্জেলেসে তাদের মধ্যে ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ ওয়ান অব দ্য জায়ান্ট স্টুডিও। গেল ১৫ বছরে ওরা পাঁচশ’রও বেশি ছবির ট্রেলার তৈরি করেছে।
 
বাংলা ট্রিবিউন: এরমধ্যে আর কী কী উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন?

কামরুল হাসান জিসান: আমি বেসিক্যালি এই অফিসে কাজ করি না, কাজ শিখি। আমার এটা শেখার স্কুল। আমি প্রতিদিন শিখি। সম্প্রতি শেষ করলাম অ্যামাজনের একটি সিরিজ। বলা হচ্ছে, এ বছরের সবচেয়ে বড় বাজেটের সিরিজ হতে যাচ্ছে এটি। 

এর আগে আমি ‘মরবিয়স’-এর কাজ করলাম। ব্যাক টু ব্যাক ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’, ‘তেহরান সিজন টু’, ‘সনিক টু’, ‘বসক লিগ্যাসি’র কাজ করলাম। এবং আমার মনে আছে ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’র কাজের সময় আমি সকাল বেলায় অফিস যেতাম, বাসায় আসতাম ভোরবেলায়। কাজ করার যে আনন্দ তা থাকলে যে ক্লান্ত লাগে না তা ওই সময় আমি বুঝতে পারলাম।

স্পিলবার্গের ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ আমার জন্য হিউজ ডিল ছিল। ইউটিউবে প্রথম যে ট্রেলারটি যায়, থিয়েটারে যে ট্রেলারটি দেখানো হয়েছে, ওটাতে আমি কাজ করার সুযোগ পাইনি। এরপরে টেলিভিশনের জন্য যে ট্রেলার তৈরি হয়েছে, তার বেশিরভাগই আমার হাতে তৈরি। এটা ২০২১ সালের কাজ। ২০২২ সালে আমার বড় কাজ ছিল ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’। এটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। কয়েকশ’ প্লাগিংয়ের কাজ করতে হয়েছে। 

বাংলা ট্রিবিউন: ফ্রিল্যান্স থেকে স্টাফ হিসেবে কাজ শুরু করলেন। দুটোর মধ্যে কাজের পরিধির পার্থক্য কেমন?

কামরুল হাসান জিসান: ফুলটাইম ও ফ্রিল্যান্সের মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য পাইনি। তখন যে সময় কাজ করতাম, এখনও তাই করি। হলিউডে একটা ফানি বিষয় আছে, কেউ ফুলটাইমার হতে চায় না। সবাই ফ্রিল্যান্স কাজ করতে চায়। কারণ, এখানে সবাই জব সুইচ করে। 

এখানে আমার দশ-এগারো মাসের কাজের অভিজ্ঞতায় যা শিখেছি, তা হলো- যত সিম্পল তত টাফ। সিম্পল কাজে অনেক খুঁটিনাটি থাকে। তখন অনেক বেশি লাইট, অনেক বেশি এলিমেন্ট। তাতে খুঁটিনাটি ভুলগুলো চোখে পড়ে। ব্যাপারটা সাদা কাপড়ে কলমের দাগের মতো।
 
যখন সহজ কাজ আসে আমি সাবধান হয়ে যাই। আমি জানি এটা খুব সাবধানে করতে হবে। আমাদের ক্যারিয়ারে ভুলের কোনও ক্ষমা নেই।
 
বাংলা ট্রিবিউন: নানা জনরার ছবি-সিরিজের ট্রেলার তৈরি করছেন? বেসিক কোনও পার্থক্য আছে?

কামরুল হাসান জিসান: পার্থক্যটা নির্ভর করে সিনেমার লুক ও ফিলের ওপর। ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ’র কথাই ধরি। এটা মাল্টিভার্স। ফলে পার্থক্যটা নির্ভর করে সিনেমার গল্প, কালার, সাউন্ড, দর্শন এমনকি এটা প্যারামাউন্টের মুভি না টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরির মুভি- এমন অনেক কিছুর ওপর। আমার করা সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্যের ট্রেলারটি ২ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের। এটা করতে আমার তিন মাস সময় লেগেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এখান থেকে স্বপ্নটা সামনে কতদূর দেখতে পারছেন?

কামরুল হাসান জিসান: আমার লক্ষ্য, আর্ট ডিরেক্টর হতে চাই। আমার জার্নিটা অনেক লম্বা ছিল। মফস্বলে বড় হলাম। তারপর ঢাকায়। আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি। তারপর নিউ ইয়র্ক। সেখান থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে।

জীবন থেকে আমি যা শিখেছি, তা হলো স্বপ্নটা বড় করে দেখতে হবে। এরপর অনুবাদ করতে হবে ধাপে ধাপে। আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। যদি ৫-৬ বছর আগে শুরু করতে পারতাম, তাহলে এখন অনেক এগিয়ে যেতাম। আরেকটা কথা, আমি বিশ্বাস করতে চাই, লাইফে যা করবো, সেরাটা করবো।

আগেই বলেছি, আমি প্রতিদিন শিখছি। আগামী পাঁচ বছর শিখবো। এরপর আমি সুইচ করবো। আমার স্বপ্ন আর্ট ডিরেক্টর হওয়া। আমার মনে হয় না আর্ট ডিরেকশনের জন্যও কোনও পড়ালেখার দরকার হবে। হয়তো আমি ভুল। তবে আমি জানি, মোশন গ্রাফিক্সে পড়ালেখা ছাড়াই আমি এতদূর এসেছি।

/এমএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
মেসিকে পরীর চুমু, চঞ্চলের সংলাপ ‘বোঝনাই ব্যাপারটা’!
আর্জেন্টিনার জয়ে ফেরামেসিকে পরীর চুমু, চঞ্চলের সংলাপ ‘বোঝনাই ব্যাপারটা’!
প্রস্থানের দুই বছর: শিল্পকলায় অবিনশ্বর আলী যাকের
মৃত্যুদিনে স্মরণপ্রস্থানের দুই বছর: শিল্পকলায় অবিনশ্বর আলী যাকের
দিল্লি থেকে দোয়া চেয়েছেন শবনম ফারিয়া
দিল্লি থেকে দোয়া চেয়েছেন শবনম ফারিয়া
আবার মঞ্চে ‘ঊর্ণাজাল’
আবার মঞ্চে ‘ঊর্ণাজাল’
দেশের নতুন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘দীপ্ত প্লে’
দেশের নতুন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘দীপ্ত প্লে’