X
শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১০ ফাল্গুন ১৪৩০
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৩

এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের: আজমেরী হক বাঁধন

মাহমুদ মানজুর
০৮ মার্চ ২০২৩, ০০:০২আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৩, ১৩:৩৪

বছর ঘুরে ফিরে এলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যথারীতি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দিনটি (৮ মার্চ) পালন করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি নানা আয়োজনের মাধ্যমে। সোশাল হ্যান্ডেলে বয়ে যাচ্ছে নানান আলাপ। এই দিনটিকে একজন নারী তারকা ঠিক কোন দৃষ্টিতে বিবেচনা করেন। তিনি যদি সিঙ্গেল মাদার হন, তাহলে তো তার অভিজ্ঞতা শোনা আরও জরুরি। সেই তারকার গতিবিধি যদি আন্তর্জাতিক হয়, তবে তো দেশের প্রেক্ষাপটে বিদেশের নারীচিত্রটাও তুলে আনা সম্ভব। মূলত এসব ভাবনা থেকেই নারী দিবসের বিশেষ আয়োজনে বিস্তর কথা হলো অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের সঙ্গে-

দিবস দৃষ্টিভঙ্গি

নারী দিবস আমরা উদযাপন করি। একজন এক রকমের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই দিনটিকে পালন করে। অনেকে আবার ইগনোরও করেন। সেটাও তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। হুম, মোটাদাগে আমি ও আমরা সাধারণত এই দিবসটা উদযাপন করি নারী স্বাধীনতা আর অধিকারের গল্পগুলোকে সামনে তুলে ধরার জন্য। এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না, এখনও গোটা পৃথিবীই পুরুষতান্ত্রিক। সেটার প্রভাব কোথাও কম, কোথাও বেশি। 

এই দিবসটি পালনের মাধ্যমে আরও একটি দিক উন্মোচিত হয় আমাদের সামনে। সেটা হলো স্মরণ ও সম্মান প্রদর্শন করা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসংখ্য নারী বা পুরুষ রয়েছেন, যারা নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য লিখেছেন, আন্দোলন করেছেন, জীবন দিয়েছেন। সেই মানুষগুলোকেও এই দিনটির মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়।

কন্যা সায়রার সঙ্গে মা বাঁধন সিঙ্গেল মাদার

ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সিঙ্গেল মাদার হওয়ার পর সামাজিক প্রেসারের চেয়ে আমার টেনশন ছিল নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধটা নিয়ে। মানে আমি যে ডিভোর্সড, সেটা বলবো কীভাবে- এই দুশ্চিন্তায় আমি মরে গিয়েছিলাম। তিন বছর আমি ডিভোর্সের বিষয়টি কাউকে বলতেই পারিনি। কারণ, আমার মনে হয়েছে এই তথ্যটি প্রকাশ করলেই আমার সন্তানের ওপর বাজে প্রভাব পড়বে। মিডিয়ায় নিউজ হবে। পাড়া-প্রতিবেশী কী বলবে? তাছাড়া ওই সময়টাতে আমি অনেক ভীতু ছিলাম!

যখন ভাবলাম একটা অ্যাবিউসড রিলেশনের চেয়ে একা থাকা ভালো, সেটা সবাইকে জানিয়ে দেওয়াটা আরও ভালো- তখনই আসলে আমি ওপেন করি বিষয়টা। তখনই আসলে মুক্ত হই। নিজেকে হালকা অনুভব করি।

বাবা-মা আলাদা হতেই পারে। অথবা একসঙ্গেও থাকতে পারে। কিন্তু বাচ্চার দায়িত্বটা যদি দুজনেই পালন করে বা ভাগাভাগি করে নেয়, তাহলে কিন্তু কঠিন কিছু না। জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত সায়রার সবকিছু আমাকে একা করতে হয়েছে। এখনও করছি। ওর আর্থিক, সামাজিক, মানসিক- সব সাপোর্ট আমার। এতে ওর বাবার এক চুলও কনট্রিবিউশন নেই। এমনটা না হলে, সায়রা এবং আমার জীবনটা আরও স্বচ্ছ হতে পারতো।

দুটো মানুষ একসঙ্গে নাই থাকতে পারেন। কিন্তু বাচ্চাটা তো দুজনেরই। সেই দায়িত্বটা সবারই পালন করা উচিত বলে মনে করি। এটা না করাটা আরও ভয়ংকর। যেটা আমার বেলায় ঘটেছে।

আমাকে মা হিসেবে যে কথা শুনতে হতো- পারবো কিনা মেয়েকে মানুষ করতে। নিজে চলতে। আমি এখন যে অবস্থানে আছি তাতে হয়তো এসব কথা এখন কম শুনতে হয়। বাট একটা সময় শুনতে হয়েছে প্রচুর। অনেক কেঁদেছি তখন।

এটা ঠিক, আমার বাচ্চার প্রতি যা যা করণীয় তার কিছুই ত্রুটি থাকছে না। আমি চেষ্টা করছি ওর জন্য সর্বোচ্চটা করতে। কিন্তু সেটা তো সব সিঙ্গেল মাদারের জন্য সম্ভব হয় না। তাদের বিষয়টা আমাদের ভাবা উচিত।

কন্যা সায়রার সঙ্গে মা বাঁধন যৌথ জীবন
 
আমি যেহেতু অ্যাবিউসিভ বা অসুস্থ রিলেশনশিপে ছিলাম, ফলে যৌথ জীবনে কোনও লাভ হয়নি। আমার সন্তানের বাবা সুস্থ মানসিকতার ছিল না। যার কারণে, একঘরে থেকেও দায়িত্ব পালন করেনি। সিঙ্গেল হওয়ার পরে তো সেটা স্বপ্ন। 

এমন যদি হয়, একসঙ্গে ভালোবাসার মধ্যে আছে স্বামী-স্ত্রী। সেটা তো যেকোনও সংসারের জন্য দারুণ বিষয়। আমি তো সেই সুখ বা অভিজ্ঞতা পাইনি। ডিভোর্সের পরেও যদি বাচ্চার কথা ভেবে কানেকটেড থাকে কোনও বাবা-মা, সেটাও কিন্তু বড় হেল্প। সেটাও আমি পাইনি। 

এ ক্ষেত্রে আমার বাবা-মা আর ভাই-ভাবিরাই আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে। দিচ্ছে এখনও।

কন্যা সায়রার সঙ্গে মা বাঁধন নারী অভিনেত্রী 

মিডিয়া অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই একটা অংশ। সে অংশ হিসাবেই এখানে এখনও মেইল প্রোটাগনিস্টকে ফোকাস করা হয়। নারী ডিরেক্টর, প্রডিউসার, নাট্যকার খুঁজে পাওয়া যায় না। খুব বেশি হলে কস্টিউমে কাজ করছেন কয়েকজন নারী। অনেক স্ট্রাগল করে দুই একজন ডিরেক্টর-প্রডিউসার আছেন। অথচ কত বড় ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু ইনসিকিউরিটি এবং অসহযোগিতার কারণে নারীর সংখ্যা আর বাড়ে না।

অভিনেত্রী হিসেবে যা দেখছি, অবশ্যই নারীপ্রধান গল্পের ঘাটতি আছে এখানে। মধ্যবয়সের নারীদের জন্য গল্প আরও কম। ইয়াংদের জন্য খানিকটা আছে বটে। এগুলা স্লো পয়জনিংয়ের মতো সোসাইটিতে প্রভাব ফেলে।

দিবসের প্রভাব

আমি আসলে জানি না নারী দিবসটি পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে প্রভাব ফেলছে কিনা। ডেফিনেটলি এই দিনটিকে সামনে রেখে আমাদের যে মেয়েরা বাইরে আসছে, কথা বলছে, সচেতন হচ্ছে- এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে কিছুটা হলেও হুমকিতে ফেলছে। আমাদের সমাজের ১২ মাসের প্রবণতা হচ্ছে- তুমি যা আছো তা নিয়ে খুশি থাকো। ঘরে থাকো। সেই হিসাবে এমন একটি দিবস তো দরকারি। এই দিনটাতে পুরুষরাও আমাদের সাহস দেয়, পাশে দাঁড়ায়। মিডিয়া কথা বলার সুযোগ করে দেয়। এটাও তো কম নয়।

বাস্তবে আজমেরী হক বাঁধন দুনিয়ার চিত্র

অবশ্যই দুনিয়ার চিত্র এখান থেকে অনেক আলাদা। বিশেষ করে ইউরোপে।

বাংলাদেশ থেকে দুনিয়া ঘোরার পর চোখ আরও খুলে গেছে আমার। এখন আমি আরও স্বাধীন। এখন আর বোকার রাজ্যে নেই আমি। স্পেনের ভেলেন্সিয়াতে গিয়েছিলাম একটি চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে রেহানার জন্য বেস্ট অ্যাকট্রেস অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছি। পাঁচ দিন ছিলাম। একা একা ঘুরেছি। কোনও এশিয়ান মানুষ পাইনি সেখানে। বাসে-ট্রেনে ঘুরেছি। রাস্তা হারিয়েছি। একাই খুঁজে নিয়েছি। রাস্তায় ওরা গান করে, পরিচয় ছাড়াই ওদের পাশে বসে গান শুনেছি। ছিলাম ওল্ড টাউনে। শত বছর আগের স্ট্রাকচার। এই সফরটা আমার পৃথিবী বদলে দিয়েছে।

ওখান থেকে ফিরে আমি প্রমিজ করেছি সায়রার কাছে। ১৮ বছর হলে ওকে আমি এমন একটা সিঙ্গেল ট্রিপে পাঠাবো। আমি চাই আমার মেয়ে তার জীবন ও পৃথিবীটাকে চোখ মেলে দেখার সুযোগ পাক।

হুম, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- বাংলাদেশ একজন নারীর জন্য নিরাপদ নয়। সিঙ্গেল নারী হলে তো আরও নয়। রাস্তায়, বাসায়, টুরিস্ট জোন- কোথাও নিরাপদ নই আমরা। অথচ এটা আমারই দেশ। এগুলা আসলে মেনে নেওয়ার বিষয় না। যেটা সবাই নারীদের শেখায়- মেনে নাও। আমি মনে করি, এগুলা নিয়ে কথা বলা দরকার। এটা আমার মৌলিক অধিকার। এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র আমাকে কেন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হবে? ইউরোপ ঘুরে সেটাই ফিল হলো। অসংগতি ওখানেও আছে, কিন্তু এতটা না।

আমার মনে হয় বছর ঘুরে নারী দিবস (৮ মার্চ) এলে, অন্তত এই কাথাগুলো আমরা যেন বলি। সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। পর্দায় আজমেরী হক বাঁধন

 

/এমএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিচারক বাঁধন
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিচারক বাঁধন
‘আমি একটু অবাক’
‘আমি একটু অবাক’
‘খুফিয়া’ বিতর্কে বাঁধনের ব্যাখ্যা, সঙ্গে নতুন খবর
‘খুফিয়া’ বিতর্কে বাঁধনের ব্যাখ্যা, সঙ্গে নতুন খবর
‘তাদের চেয়ে কি আমরা ক্রিকেটটাকে বেশি বুঝি’
বিশ্বকাপ বিশেষ‘তাদের চেয়ে কি আমরা ক্রিকেটটাকে বেশি বুঝি’
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
মাতৃভাষা জানেন না জাহ্নবী!
মাতৃভাষা জানেন না জাহ্নবী!
ফের ক্যানসার, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন সাবিনা ইয়াসমিন
ফের ক্যানসার, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন সাবিনা ইয়াসমিন
একটি অদ্ভুত ছবি এবং মিক্সড অ্যালবাম সৃষ্টির ইতিহাস
একটি অদ্ভুত ছবি এবং মিক্সড অ্যালবাম সৃষ্টির ইতিহাস
‘আমরা ঢাকার লোকজনও এতো লম্বা আয়োজনের কথা ভাবতে পারি না’
যশোরে শুরু হলো ১৭ দিনব্যাপী নাট্যোৎসব‘আমরা ঢাকার লোকজনও এতো লম্বা আয়োজনের কথা ভাবতে পারি না’
কৃষিবিদে আজ বাপ্পার দিন
কৃষিবিদে আজ বাপ্পার দিন