বাবাকে মানুষ নিজের ‘ফ্যামিলি’ ভাবে, সন্তান হিসেবে এটা দারুণ অনুভূতির: নুহাশ হুমায়ূন

বিনোদন রিপোর্ট
০৬ জুন ২০২৬, ১৪:৪২আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ১৮:১৮

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্ম, তাঁর জীবনদর্শন এবং একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর কঠোর পরিশ্রমের স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত 'হুমায়ূন স্মরণ' অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদকে মানুষ কেবল একজন লেখক বা নির্মাতা হিসেবেই নয়, বরং নিজেদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন।

বাবার কথা বলা মানুষের এক ধরণের 'অ্যামিউজমেন্ট'
অনুষ্ঠানে এবং নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে নুহাশ বলেন, “খুব ভালো লাগে যে মানুষ যেকোনো সময়ে এসে আমার কাছে বাবার কথা বলতে পারে। কারণ মানুষ আসলে হুমায়ূন আহমেদকে নিজের ফ্যামিলি মেম্বার হিসেবে দেখে। আর তারই এক্সটেনশন হিসেবে আমি, আমার বোন, আমার মা—আমাদের সবার জন্যই মানুষের হৃদয়ে একটা স্পেশাল জায়গা তৈরি হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “বাবা আমাদেরকে নিয়ে এত লিখেছেন যে, মানুষ যখন আমাদের সাথে কথা বলে, তখন মনে হয় যেন তারা কোনো বইয়ের চরিত্রের সাথেই কথা বলছে! মানুষের মধ্যে আমাদের নিয়ে এই যে আগ্রহ বা ভালোবাসা, এটা তাদের এক ধরণের অ্যামিউজমেন্ট (আনন্দ)। পৃথিবীর যত দেশে গিয়েছি, দেখেছি বাবাকে নিয়ে আলোচনা হয়। সন্তান হিসেবে আমার কাছে এটা এক অন্যরকম অনুভূতি, যা ভাষায় বলে বোঝানোর মতো নয়।”

কোনো বিশেষ জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী ছাড়াই এই ধরণের আয়োজন করায় শিল্পকলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে নুহাশ বলেন, “আজ এখানে আসার আগে একজনকে দেখলাম, যিনি বৃষ্টিতে ভিজে এসে পঞ্চমবারের মতো 'শ্রাবণ মেঘের দিন' চলচ্চিত্রটি দেখলেন এবং আমার সাথে সেই ভালোলাগা শেয়ার করলেন। এটাই প্রমাণ করে, মানুষ বাবাকে কতটা আপন করে নিয়েছে।”

হুমায়ূনের স্মৃতিতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন
'আর্টিস্ট হওয়া মানেই কঠিন পরিশ্রম'

শৈশবে বাবাকে কাছ থেকে দেখার স্মৃতি রোমন্থন করে নুহাশ বলেন, “অনেকে ভাবেন 'দ্য লাইফ অফ অ্যান আর্টিস্ট'—লেখক বা পরিচালক হওয়া বুঝি খুবই সহজ। কিন্তু আমি খুব ছোট বয়সেই ডিসকভার (আবিষ্কার) করেছি যে, লেখালেখি বা সৃষ্টিশীল কাজ আসলে কতটা কঠিন ও পরিশ্রমের।”

বাবার কাজের প্রতি নিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাবা ভোরবেলা থেকে লেখালেখি শুরু করতেন এবং দুপুর পর্যন্ত জাস্ট টানা লিখে যেতেন। সারাদিন লেখার পর বাসায় খুব করুণ চেহারা করে চিন্তিত মুখে হাঁটাহাঁটি করতেন। আবার লিখতেন, পছন্দ না হলে সেই লেখা কুঁচকে ফেলে দিয়ে নতুন করে শুরু করতেন। একজন ক্রিয়েটিভ মানুষকে যে কত পরিশ্রমী এবং সিরিয়াস হতে হয়, তা খুব অল্প বয়সেই বাবাকে দেখে বুঝেছি।”

স্মৃতিচারণের পাশাপাশি নুহাশ তাঁর নির্মাণাধীন বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘ম্যুভিং বাংলাদেশ’-এর বর্তমান অগ্রগতি ও খবর সবার সাথে ভাগ করে নেন এবং উপস্থিত সবার কাছে শুভকামনা প্রত্যাশা করেন।

হুমায়ূন স্মরণে শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনচিত্র
হুমায়ূন আহমেদের নির্মাণশৈলী ও শিল্প দর্শন নিয়ে আলোচনা

জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে মনিষীদের স্মরণমালা অনুষ্ঠানমালার শেষ এই আয়োজনে ‘হুমায়ূন আহমেদ: নির্মাণশৈলি ও শিল্প দর্শন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন চলচ্চিত্র গবেষক ড. শাহাদৎ রুমন।

তিনি বলেন, “হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তৎকালীন শিল্প মাধ্যমে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী, যিনি মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টিতে হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও দর্শনের এক অপূর্ব সমাহার ছিল। তিনি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে হালকাভাবে এবং হালকা ঘটনাকে বড় ক্যানভাসে উপস্থাপন করতে পারতেন।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. মতিন রহমান বলেন, “চলচ্চিত্রের এক চরম সংকট ও কঠিন সময়ে হুমায়ূন আহমেদ সিনেমা নিয়ে এসেছিলেন এবং দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। শুরুর দিকে তাঁর সিনেমাকে 'নাটক হয়ে যাচ্ছে' বলে অনেকে সমালোচনা করলেও তিনি থেমে থাকেননি; একের পর এক সফল সিনেমা বানিয়েছেন। তাঁর নির্মাণ ও সংলাপ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও জীবন্ত। তিনি লোকজ সংস্কৃতি ও লোকায়ত জীবনকে তাঁর সৃষ্টিতে প্রাণবন্ত করেছেন।”

সভাপতির বক্তব্যে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, “হুমায়ূন আহমেদ একাধারে রসিক মানুষ ছিলেন এবং একই সাথে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে কেবল সৃজনশীলতা দিয়েই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। অর্থাৎ, তিনি দেশে একটি 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি' বা সৃজনশীল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।”

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. মিজানুর রহমান।

হুমায়ূনের গান শিল্পীদের কন্ঠে
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও কালজয়ী গানের আসর

স্মরণানুষ্ঠানের শুরুতেই বিকাল ৪ টায় হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ প্রদর্শিত হয়। এরপর আলোচনা পর্ব শেষে প্রদর্শিত হয় তাঁর শেষ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ এবং তাঁকে নিয়ে নির্মিত বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘হুমায়ূন সাগরে কিছুক্ষণ’।

বিকেলের এই আয়োজনে অন্যতম আকর্ষণ ছিল হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ও তাঁর প্রিয় গানের সুরমূর্ছনা। শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা একে একে গেয়ে শোনান ‘যদি মন কাঁদে’, ‘কে আইসা দাঁড়াইছে গো’, ‘আমার ভাঙা ঘরে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ’, ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘আমার আছে জল’, ‘দুঃখটুকু দিলাম ছুটি’, ‘মানুষের ভেতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন’ এবং ‘মরিলে কান্দিসনা আমার দায়’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো, যা মিলনায়তনে উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গাজা নিয়ে নির্মিত ‘নাজা’ প্রশংসিত, ২৫ মিনিটের রেকর্ড স্ট্যান্ডিং ওভেশন
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গাজা নিয়ে নির্মিত ‘নাজা’ প্রশংসিত, ২৫ মিনিটের রেকর্ড স্ট্যান্ডিং ওভেশন
সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি: আনু মুহাম্মদ
সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি: আনু মুহাম্মদ
‘বিগ বস’র ঘরে বাদশাহকে নিয়ে ইশার বিস্ফোরক মন্তব্য
‘বিগ বস’র ঘরে বাদশাহকে নিয়ে ইশার বিস্ফোরক মন্তব্য
মার্ভেলের নতুন সিনেমায় ‘জেন ভি’ তারকা আসা জারম্যান
মার্ভেলের নতুন সিনেমায় ‘জেন ভি’ তারকা আসা জারম্যান
‘সাত ভাই চম্পা’ গানে কবরীর পরা শাড়ির প্রেমে নূতন, কিনেছিলেন ৭ টাকায়
‘সাত ভাই চম্পা’ গানে কবরীর পরা শাড়ির প্রেমে নূতন, কিনেছিলেন ৭ টাকায়