কান কথা-২কিচ্ছু ফাঁস না করার শর্তে চুক্তি

Send
জনি হক, কান (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশিত : ১৬:৫৫, মে ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, মে ১৪, ২০১৯

দক্ষিণ ফরাসি উপকূলের আবহাওয়া কখন কেমন হবে সেই পূর্বাভাস করা মুশকিল। আগের চারবারের অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। তবে কানে এবার দারুণ আবহাওয়া দেখছি। গা-সওয়া তাপমাত্রা। বেশি কনকনে হাওয়া নেই। সকাল থেকে দিনভর রোদ্দুর হাসাহাসি করে! কানের আবহাওয়া নিয়ে অত মাথাব্যথা নেই আমার। যতটা না ইন্টারনেট নিয়ে হচ্ছিল।
১১ মে রাত ৮টায় কানে এসে দেখি মোবাইল ফোনের সিম বিক্রির দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। তার ওপর একটা থেকে আরেকটা দোকানের দূরত্ব হেঁটে কমপক্ষে ১০ মিনিট। ওইদিন লেখালেখির বালাই থাকলেও উপায় ছিল না। পরদিন ঘুম ভাঙার পর কান ট্রেন স্টেশনের কাছেই একটি দোকানে ঢুকে লিবারা সিম নিয়ে স্বস্তি হলো। দাম ২০ ইউরো। ভেতরে ৪ গিগাবাইট ইন্টারনেট আছে। কিন্তু সমস্যা বাঁধালো মোবাইল সেটের হটস্পট। কিছুতেই ল্যাপটপে কাজ করছে না। বাধ্য হয়ে সেজান ভাইয়ের রেস্তোরাঁয় বসে লিখে বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব এন্টারটেইনমেন্টকে ই-মেইল করতে হলো। বাসায় হটস্পট দিয়ে সহযোগিতা করলেন চাঁদপুরের রুবেল।
সোমবার (১৩ মে) খুব সকালেই কান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দে ফেস্তিভালের সামনে অবস্থান নিলাম। প্রেস ব্যাজ তোলার লাইন খুব একটা দীর্ঘ নয়। ভবনের মূল ফটক ঘেঁষেই অ্যাক্রেডিটেশন তাঁবু। জনসমাগম খুব একটা নেই। তবে নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিকতা এতই কড়া, অল্পতেই জনজট লেগে যায়! ব্যাগের ভেতর কী আছে সব খুঁটিনাটি দেখছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, ঘড়িসহ যা কিছু আছে সেগুলো ট্র্রে’তে দিয়ে আর্চওয়ে মেশিন পেরোতে হচ্ছে। তাঁবুর সামনে উৎসবের নিরাপত্তা প্রতিনিধিরা কাজ করেন শিফট অনুযায়ী।
বাইরে ফাঁকা থাকলেও ব্যাজ বিতরণের বিভাগে ঢুকে দেখি ভিড়। লম্বা লাইন। এই ফাঁকে একটা তথ্য দিয়ে রাখি। গত বছর অফিসিয়াল সিলেকশনের ছবিগুলোর প্রেস স্ক্রিনিংয়ের নিয়মাবলীতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কারণ মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের ছবিগুলোর পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণে সত্যিকারের প্রিমিয়ার হয় বলে মনে করেন আয়োজকরা। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তে মনমরা হয়েছেন সংবাদকর্মীরা। উৎসবটি কাভারের ক্ষেত্রে অনেকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই ৭২তম আসরে প্রেস স্ক্রিনিংয়ে ফের পরিবর্তন এসেছে।
গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে সন্ধ্যা ৭টার নির্ধারিত ছবির গালা স্ক্রিনিংয়ের দুই ঘণ্টা আগেই সাংবাদিকদের দুবুসি ও বাজিন থিয়েটারে একইসঙ্গে দেখানো হবে বিকাল ৫টায়। গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে রাত ১০টার নির্ধারিত ছবির গালা স্ক্রিনিং চলাকালে দুবুসি ও বাজিন থিয়েটারে তা দেখতে পারবেন সাংবাদিকরা। পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে তাদের জন্য থাকছে এই সুযোগ। এছাড়া সংবাদকর্মীদের কথা ভেবে এই ভেন্যুতে সকাল ১১টা ও দুপুর ২টায় একটি করে প্রদর্শনী রাখা হচ্ছে।
ভালো কথা। কিন্তু আয়োজকদের একটি শর্ত আছে। ব্যাজ দেওয়ার আগে দায়িত্বরত তরুণী একটি ফর্ম দিয়ে তা দেখালেন। আগের চারবার এমন অভিজ্ঞতা ছিল না। ফর্মে স্বাক্ষর করার সঙ্গে নিজের পুরো নাম, সংবাদমাধ্যমের নাম আর তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে। ফর্মটা পড়ে বুঝলাম, কান উৎসব কর্তৃপক্ষ অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া সাংবাদিকদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। তাদের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে অনুরোধও করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাগুলো হলো— গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে বিকাল ৪টা কিংবা সাড়ে ৪টা, সন্ধ্যা ৬টা, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা, সন্ধ্যা ৭টা অথবা সাড়ে ৭টা আর রাত ১০টা কিংবা সোয়া ১০টার প্রদর্শনী শেষ হওয়ার আগে ছবিটি নিয়ে কিচ্ছু লেখা যাবে না।
ব্যাজ নেওয়ার পর আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেওয়া হলো সুদৃশ্য ব্যাগ। ভেতরে উৎসবের গাইড, প্রেস স্ক্রিনিং ও সংবাদ সম্মেলনের সময়সূচিসহ সিনেমা বিষয়ক কয়েকটি ম্যাগাজিন। ব্যাজ পাওয়ায় পালে দে ফেস্তিভাল ভবনে ঢোকার ক্ষেত্রে আর কোনও বাধা রইলো না। এখানে শুরুতে স্ক্যানার মেশিন দিয়ে ব্যাজ পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে ব্যাজধারীর সঙ্গে ব্যাজে যুক্ত ছবির মিল আছে কিনা তা ভালোভাবে পরখ করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। এরপর ব্যাগ খুলে দেখাতে হয়। মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, ঘড়িসহ যা কিছু আছে সেগুলো ট্র্রে’তে দিয়ে আর্চওয়ে মেশিন পেরোনোর পর নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। যতবার ভবন থেকে বের হবো, ততবার একই নিয়মে ঢোকা ছাড়া উপায় নেই।
আনন্দের ব্যাপার হলো, কান যেন সাংবাদিকদের কাছে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে ওঠে ও তারা যেন দারুণভাবে উপভোগ করতে পারেন সেজন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন আয়োজকরা। তেরেস দে জার্নালিস্টস চারতলা থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে তিনতলায়। এখানে একইসঙ্গে কাজ করা ও বিশ্রাম নেওয়া যাবে। ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা ও টিভি ফেস্টিভ্যাল স্ক্রিনিং তো আছেই। এ বছর সেখানে রাখা হয়েছে ২০০টি আসন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা অবধি খোলা থাকবে এই অংশ।
অন্যান্যবার উৎসব শুরুর আগের দিন প্রেস রুম ও ওয়াইফাই জোন খুলে দেওয়া হতো। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র। এ কারণে তিনতলাসহ পালে দে ফেস্তিভাল ভবনের বেশিরভাগ অংশই ফাঁকা। উৎসবের অফিসিয়াল পোস্টার ছাড়া কিছুই দৃষ্টি কাড়ে না। তৃতীয় তলায় অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া সাংবাদিকদের জন্য আছে প্রেস বক্স। প্রতিদিনের দরকারি তথ্য সেখানে রাখা হয়। বাংলা ট্রিবিউনের জন্য বরাদ্দ ১৪৬৫ নম্বর বক্স। মেশিনের ওপর ব্যাজ ধরে রাখলে সবুজ বাতি জ্বলে ওঠার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সেটি খুলতে হয়। নয়তো বিগড়ে যায়। প্রেস বক্সে কানের প্যারালাল বিভাগ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট ও স্যুমে দ্যু লা ক্রিতিকের এবারের আসরের গাইড বই পেলাম। দুপুরে কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমোর সংবাদ সম্মেলনের পর বক্সে দেখি উদ্বোধনী দিনের সূচি।
ভবন থেকে বেরিয়ে ডান দিকে এগিয়ে দেখি, স্টিলের সিঁড়ি নিয়ে তুলকালাম চলছে! মঙ্গলবার থেকে তামাম দুনিয়ার নামিদামি তারকারা চকচকে গাড়িতে চড়ে এখানে এসে নামবেন। তখন সুযোগ বুঝে তাদের ছবি তোলার জন্য এত প্রস্তুতি। এসব আলোকচিত্রীর রেড কার্পেটে যাওয়ার অনুমতি মেলে না। তাই তারা দিনভর মই নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন।
ওদিকে গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে ঢোকার অংশে রেড কার্পেট বসানোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছেন উৎসবের কর্মীরা। দক্ষিণ ফরাসি উপকূলে বইতে শুরু করেছে সিনেমার হাওয়া। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন বলে কথা! তামাম দুনিয়া আগামী ১২ দিন ডুবে থাকবে সাগরপাড়ের শহরে।
* ফ্রান্সের সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের পাঠকদের চার ঘণ্টা যোগ করে নিতে হবে।

/এমএম/

লাইভ

টপ