বাফটায় রাজত্ব করলো ‘নাইনটিন সেভেনটিন’

Send
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১২:৫০, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৬, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০

স্যাম মেন্ডেস, রেনে জেলওয়েগার ও ওয়াকিন ফিনিক্সপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘নাইনটিন সেভেনটিন’ ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) অ্যাওয়ার্ডসে রাজত্ব করলো। সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালনাসহ সর্বাধিক সাতটি পুরস্কার জিতলো স্যার স্যাম মেন্ডেসের ছবিটি।

লন্ডনের রয়েল আলবার্ট মিলনায়তনে ২ ফেব্রুয়ারি (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল) জমকালো আয়োজনে এবারের বাফটা বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন টিভি ব্যক্তিত্ব গ্রাহাম নর্টন।
‘নাইনটিন সেভেনটিন’ দেখলে মনে হবে পুরোটাই একটি শটে ধারণ করা! এর গল্প নো ম্যান’স ল্যান্ডে দুই তরুণ ব্রিটিশ সৈন্যের দুঃসাহসিক অভিযানকে কেন্দ্র করে। স্যাম মেন্ডেসের মাধ্যমে ১১ বছর পর কোনও ব্রিটিশ নির্মাতা বাফটায় সেরা পরিচালক হলেন। সবশেষ ২০০৯ সালে ড্যানি বয়েল (স্লামডগ মিলিয়নিয়ার) এই সম্মান পেয়েছিলেন। আউটস্ট্যান্ডিং ব্রিটিশ চলচ্চিত্র, শব্দগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, চিত্রগ্রহণ ও স্পেশাল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বিভাগগুলোতেও সেরা হয়েছে ‘নাইনটিন সেভেনটিন’।

মনোনীতদের মধ্যে জাতিগত বৈচিত্র্য ও লিঙ্গ সমতার অভাব থাকায় বাফটার ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এবার অভিনয়শিল্পী বিভাগগুলোতে মনোনয়ন পেয়েছেন শুধুই শ্বেতাঙ্গরা (২০ জন)। এছাড়া পরিচালক বিভাগে মনোনীতরা সবাই পুরুষ। এ নিয়ে টানা সাত বছর এমন চিত্র দেখা গেলো। এসব কারণে ‘বাফটাস সো হোয়াইট’ হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জাতিগত বৈচিত্র্য ও লিঙ্গ সমতা না থাকায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন বাফটার প্রধান আমান্ডা বেরি।
লালগালিচায় এসেছিলেন বাফটার সভাপতি প্রিন্স উইলিয়াম ও তার স্ত্রী কেট মিডেলটন। ডিউক অব ক্যামব্রিজ উইলিয়াম বলেন, ‘২০২০ সালে এসে গত কয়েক বছরের মতোই জাতিগত বৈচিত্র্য নিশ্চিতকরণ ও পুরস্কার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে আমাদের। বাফটা এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এবারের মনোনয়ন তালিকা নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় পুরো পুরস্কার প্রক্রিয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা চলছে। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, প্রত্যেকের জন্য সুযোগ রয়েছে।’
মঞ্চে কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষে মন্তব্য করেছেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়া ওয়াকিন ফিনিক্স। টড ফিলিপস পরিচালিত ‘জোকার’ ছবিতে দুর্বল ব্যক্তি থেকে আত্মবিশ্বাসী ভিলেন হয়ে ওঠা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন তিনি। তার কথায়, ‘পুরস্কারটি পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। কিন্তু একইসঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমার চেয়েও অনেক মেধাবী অভিনেতা উপেক্ষিত রয়েছে। ভিন্ন বর্ণের শিল্পী-কুশলীদের আমরা স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়ে দিচ্ছি, মেধাবী আর পরিশ্রমী হলেও কোনও লাভ হবে না। আমরা এমন শিল্পীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখাচ্ছি যারা আমাদের শিল্পকে উপকৃত করেছেন ও তাদের অনেক অবদান আছে। এমন পদ্ধতিগত বর্ণবৈষম্য ঠেকাতে তৎপর হওয়ার এখনই সময়।’


সেরা আবহসংগীত (হিলদুর গুনাডটার) ও সেরা অভিনয়শিল্পী নির্বাচন (শেইনা মার্কোউৎজ) বিভাগেও পুরস্কৃত হয়েছে ‘জোকার’। এর মধ্যে অভিনয়শিল্পী নির্বাচন বিভাগটি বাফটায় এবারই প্রথম চালু করা হলো।

অভিনেত্রী ও পার্শ্ব অভিনেত্রী উভয় বিভাগে মনোনীত স্কারলেট জোহানসনের মন্তব্য, ‘পরিচালক বিভাগে শুধুই পুরুষদের মনোনয়ন পাওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, নারীদের আটকে রাখার প্রবণতা। হলিউডকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। গত বছর নারী পরিচালকদের বানানো দারুণ কিছু ছবি ছিল, তবুও তাদের উপেক্ষা করায় আমি হতাশ।’

স্কারলেটকে হটিয়ে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন রেনে জেলওয়েগার। ‘জুডি’ ছবিতে হলিউড অভিনেত্রী-গায়িকা জুডি গারল্যান্ডের ভূমিকায় নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তিনি। নারী পরিচালক গ্রেটা গারউইগের ‘লিটল উইমেন’ পোশাক পরিকল্পনা বিভাগে সেরা হয়েছে।

লরা ডার্ননেটফ্লিক্স প্রযোজিত মার্টিন স্করসেজির ‘দি আইরিশম্যান’-এর জন্য বাফটা ছিল হতাশার। গ্যাংস্টারধর্মী তারকাবহুল ছবিটি ১০টি বিভাগে মনোনয়ন পেলেও ফিরেছে খালি হাতে। যদিও নেটফ্লিক্সের আরেক প্রযোজনা ‘ম্যারেজ স্টোরি’তে নির্দয় আইনজীবীর চরিত্রে মুন্সিয়ানা দেখিয়ে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হয়েছেন লরা ডার্ন। ‘টয় স্টোরি ফোর’ ও ‘ফ্রোজেন টু’কে হটিয়ে সেরা অ্যানিমেটেড ছবির পুরস্কার জিতেছে নেটফ্লিক্সের ‘ক্লাউস’।

কোয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম…ইন হলিউড’ও ১০টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল। তবে ছবিটির একমাত্র অর্জন সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে ব্র্যাড পিটের জয়। সুদর্শন স্টান্টম্যানের চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন তিনি। তার পক্ষে পুরস্কারটি নেন সহশিল্পী মার্গট রবি। একইসঙ্গে পিটের বার্তা পড়ে শোনান, ‘হে ব্রিটেন, শুনেছি তুমি একা হয়ে গেছো। বিয়েবিচ্ছেদের ক্লাবে স্বাগতম! বিচ্ছেদের বন্দোবস্তের জন্য তোমাকে শুভেচ্ছা জানাই।’

অভিনয়শিল্পী বিভাগের চারটি পুরস্কারই জিতেছেন আমেরিকানরা। ১৯৭৭ সালের পর বাফটার ইতিহাসে এমন ঘটনা দেখা গেলো দ্বিতীয়বার। ওয়াকিন ফিনিক্স, রেনে জেলওয়েগার, ব্র্যাড পিট ও লরা ডার্ন হলিউডের উল্লেখযোগ্য সব পুরস্কারই জিতেছেন। বাকিগুলো হলো গোল্ডেন গ্লোবস, স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডস ও ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস। চারজনই আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি অস্কারে ফেভারিট।

তাইকা ওয়াইতিতি, বং জুন-হো ও রজার ডিকিন্সইংরেজি ব্যতিত অন্য ভাষার ছবি ও সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য বিভাগে সেরা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘প্যারাসাইট’। বং জুন-হো পরিচালিত ছবিটি গত বছর কান উৎসবে স্বর্ণ পাম জেতে। ২০১৬ সালে ফক্স নিউজ চ্যানেলের যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ‘বম্বশেল’ চুল ও রূপসজ্জায় সেরা হয়েছে।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে একজন মায়ের অভিজ্ঞতাকে ঘিরে নির্মিত ‘ফর সামা’ সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে। সিরিয়ার নারী নির্মাতা ওয়াদ আল-কাতিব মঞ্চে তার চার বছরের কন্যা সামাকে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘সিরিয়ান নাগরিক, নার্স, চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবীদের এই পুরস্কার উৎসর্গ করতে চাই, যারা এখনও সংগ্রাম করছেন।’

ব্রিটিশ তারকা হিসেবে চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান রাখায় পুরস্কৃত হয়েছেন অভিনেতা অ্যান্ডি সার্কিস। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন স্যার আয়ান ম্যাককেলেন। অ্যাকাডেমি ফেলোশিপ পেয়েছেন আমেরিকান প্রযোজক ক্যাথলিন কেনেডি। 

‘নাইনটিন সেভেনটিন’ বাফটা শাসন করলেও আগামী সপ্তাহে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে ছবিটি সফল হবে কিনা সেই পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ গত পাঁচ বছর ধরে বাফটার সেরা চলচ্চিত্র অস্কারে শেষ হাসি হাসেনি। বাফটা বিজয়ী ও মনোনীতদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন অ্যাকাডেমির ৬ হাজার ৭০০ জন সদস্য, যারা হলিউডের প্রফেশনালস ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সৃজনশীল ব্যক্তি।

অ্যান্ডি সার্কিসবাফটা ২০২০ আসরের বিজয়ী তালিকা
সেরা চলচ্চিত্র: নাইনটিন সেভেনটিন
অসামান্য ব্রিটিশ ছবি: নাইনটিন সেভেনটিন
সেরা অভিনেত্রী: রেনে জেলওয়েগার (জুডি)
সেরা অভিনেতা: ওয়াকিন ফিনিক্স (জোকার)
সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী: লরা ডার্ন (ম্যারেজ স্টোরি)
সেরা পার্শ্ব অভিনেতা: ব্র্যাড পিট (ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম… ইন হলিউড)
সেরা পরিচালক: স্যাম মেন্ডেস (নাইনটিন সেভেন্টিন)
রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড: মাইকেল ওয়ার্ড
অসামান্য অভিষেক (লেখক, পরিচালক অথবা প্রযোজক): বেইট (পরিচালক মার্ক জেনকিন, প্রযোজক কেট বায়ার্স ও লিন ওয়েইট)
ইংরেজি ব্যতিত অন্য ভাষার ছবি: প্যারাসাইট
সেরা প্রামাণ্যচিত্র: ফর সামা
সেরা অ্যানিমেটেড ছবি: ক্লাউস (নেটফ্লিক্স)
সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য: প্যারাসাইট (হান জিন ওয়ান ও বং জুন-হো)
সেরা অ্যাডাপ্টেড চিত্রনাট্য: জোজো র‌্যাবিট (তাইকা ওয়াইতিতি)
সেরা আবহসংগীত: জোকার (হিলদুর গুদনাডট্টির)
সেরা চিত্রগ্রহণ: নাইনটিন সেভেন্টিন (রজার ডিকিন্স)
সেরা পোশাক পরিকল্পনা: লিটল উইমেন (জ্যাকলিন ডুর্যা ন্ট)
সেরা সম্পাদনা: ফোর্ড ভার্সেস ফেরারি (অ্যান্ড্রু বাকল্যান্ড ও মাইকেল ম্যাককাসকার)
সেরা শিল্প নির্দেশনা: নাইনটিন সেভেন্টিন (লি স্যান্ডেলস)
সেরা রূপসজ্জা ও চুলসজ্জা: বম্বশেল (ভিভিয়ান বেকার, কাজু হিরো ও অ্যান মর্গ্যান)
সেরা শব্দগ্রহণ: নাইনটিন সেভেন্টিন (স্কট মিলান, অলিভার টারনে, র্যা চেল টেট, মার্ক টেলর ও স্টুয়ার্ট উইলসন)
সেরা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস: নাইনটিন সেভেন্টিন (গ্রেগ বাটলার, গিওল র্যঁ শো ও ডমিনিক টুয়ি)
সেরা অভিনয়শিল্পী নির্বাচন: জোকার (শেইনা মার্কোউইৎজ)
ব্রিটিশ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: লার্নিং টু স্কেটবোর্ড ইন অ্যা ওয়ারজোন (ইফ ইউ আর অ্যা গার্ল)
ব্রিটিশ স্বল্পদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন: গ্র্যান্ড্যাড ওয়াজ অ্যা রোম্যান্টিক
ব্রিটিশ তারকা হিসেবে চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান: অ্যান্ডি সার্কিস

সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি



/জেএইচ/এম/

লাইভ

টপ