চলচ্চিত্র প্রিভিউ: ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ যেখানে ব্যতিক্রম

Send
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৯:৫৫, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪২, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০। তিনি প্রায় ১৮ বছর ধরে সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’ সম্পাদনা করে আসছেন। সমাজ রূপান্তরকামী এই লেখক-শিক্ষাবিদ ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিপ্রতীক্ষিত ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ চলচ্চিত্রটি সম্প্রতি দেখেছেন। সেই সূত্রে মতামত ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের সামগ্রিক চলচ্চিত্র শিল্পের গতিধারা নিয়ে। যা তুলে ধরা হলো বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য—

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বামে ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’-এর পোস্টার

চলচ্চিত্র যে কত শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম, সে তো আমরা সবাই জানি। যা অতিদ্রুত দর্শকের কাছে চলে যায় এবং একটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শক নতুন এক জগতে প্রবেশ করেন। দর্শকের চোখ, কান, কল্পনাশক্তি, চিন্তাশক্তি- সমস্ত কিছুই একসঙ্গে কাজ করে তখন। একটা ভালো ছবি দেখলে অনেক দিন পর্যন্ত মনে থাকে। এজন্যই চলচ্চিত্র অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। এর মান যত উন্নত হয় ততই বোঝা যায়, যারা এর পেছনে রয়েছেন তাদের মানটা কী!
এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, কিছুটা হতাশাব্যঞ্জকও বলা যায় যে- আমরা ভালো চলচ্চিত্র পাচ্ছি না!
পাকিস্তান আমলেও যারা চলচ্চিত্র তৈরি করছিলেন, তাদের অনেকেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে রইলেন না। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে জহির রায়হানের কথা। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি পাকিস্তান আমলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। এবং তখনও তিনি ছবি তৈরি করছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের প্রাক্কালে হারিয়ে গেলেন! এবং তার এই হারিয়ে যাওয়া একটা সম্ভাবনা আর একটা প্রতিশ্রুতি- এই দুইয়েরই হারিয়ে যাওয়া!
আলমগীর কবিরও ছবি তৈরি করছিলেন, আমাদের আশা দিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনিও চলে গেলেন! অনেক পরে তারেক মাসুদ এলেন। তিনিও মুক্তিযুদ্ধের ওপর ছবি বানিয়েছেন। তারেক মাসুদ চিন্তা ও চলচ্চিত্র এই দুটোকে মেলাতে চাচ্ছিলেন। খুবই অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনিও হঠাৎ চলে গেলেন। এটি ছিল চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এর ফলে চলচ্চিত্রে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
শূন্যতা তো চিরস্থায়ী কিছু নয়, এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ! ফলে এই শূন্যতাকে গ্রাস করে ফেলেছে বাণিজ্য! বিনোদনের নামে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যেখানে কোনও চিন্তা নেই, স্থূলতা আছে। সেখানে এমন কদর্যতা আছে, যেটা সমাজের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই সমস্ত চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনগুলোও অশ্লীল!
টেলিভিশনে যে ছবিগুলো দেখানো হয় সেগুলোর ভেতরেও ধারাবাহিকতা থাকে না। কারণ, সেগুলোর ভেতরে বিজ্ঞাপন প্রবেশ করে। আবার খবরের কাগজগুলোর বিনোদনের যে পাতা, সেখানে দেখা যায় নারীদের অর্ধনগ্ন ছবি, কোনও রুচি নেই! এগুলো মানুষ প্রতিনিয়ত দেখছে। রুচির যে নিম্নগামী প্রবণতা, সেটা এখানে প্রশ্রয় পাচ্ছে।
এর মধ্যে যারা সুস্থধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান, তাদের জন্য এটা মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, বিনিয়োগ আর সমর্থন ছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়।
আমি মাসুদ হাসান উজ্জ্বলকে অভিনন্দন জানাবো, কারণ এই চ্যালেঞ্জটি তিনি নিয়েছেন। তার ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’কে আমি চ্যালেঞ্জ বলবো। এই চ্যালেঞ্জ স্থূল বাণিজ্যিক প্রবণতার বিপরীতে, আবার তথাকথিত আর্টফিল্মের ধারণা থেকেও তিনি বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। আর্টফিল্মের একটা দুর্বলতা হলো, এটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য খুব ব্যাঘ্র থাকে। দুঃখজনকভাবে পুরস্কার সেই সমস্ত ছবিকেই দেওয়া হয়, যেখানে আমাদের দারিদ্র্য, পশ্চাৎপদতা, ব্যর্থতাগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে! মনে হয় এই নেতিবাচক দিকগুলোই আমাদের একমাত্র বাস্তবতা!
মানুষের যে সংগ্রাম, যে আশা এবং এই জনপদে যে নানারকম ইতিবাচক কর্মতৎপরতা চলছে, এখানে যে তরুণরা স্বপ্ন দেখে, তারা যে চিকিৎসক হয়, বিজ্ঞানী হয়, এই জায়গাগুলো আসে না সেসব চলচ্চিত্রে।

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এ সমস্ত কিছুকেই এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ দিয়ে। তথাকথিত বাণিজ্য এবং আর্টফিল্মকে অস্বীকার করে একটা নতুন চলচ্চিত্র-ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার চলচ্চিত্রে ইতিবাচক জিনিস নিয়ে এসেছেন, বিনোদনকে অস্বীকার করেননি এবং শিল্পবিচারে এই ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ অত্যন্ত উন্নতমানের!

এর শতখানি (পুরোটা) আমি দেখেছি। মনে হয়েছে এর চিত্রগ্রহণ, আলোক-সম্পাত, সংলাপ এবং এর ভেতরে যে গানগুলো রয়েছে সমস্ত কিছু মিলে একটা পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। এই ধরনের চলচ্চিত্রের দর্শক আছে। দর্শক এইরকম ছবিই দেখতে চায়। কিন্তু এসবের জন্য বিনিয়োগ বা পৃষ্ঠপোষকতা করবার জন্য কেউ নেই! এবং যারা স্থূল ভাবনার চলচ্চিত্র তৈরি করেন, তারা এই ধরনের চলচ্চিত্রকে মোটেই সমর্থন দেবেন না। কেননা এই চলচ্চিত্র তাদের যে বাণিজ্য, যে প্রবণতা, যে অভ্যাস- এই সমস্ত কিছুকে চ্যালেঞ্জ করবে!

‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ যারা দেখবেন, তারা আমার সাথে একমত হবেন যে, এখানে কেবলমাত্র উন্নতমানের একটি চলচ্চিত্র আছে তা নয়, এরমধ্যে বুদ্ধি আছে। এবং যে আওয়াজটা এখানে নির্মাতা তুলেছেন- ‘কাঁচের যুগের ছবি নয়’। এই স্লোগান থেকে যেটা আমি বুঝলাম- আমরা একটা কাঁচের যুগে বাস করছি, যেখানে সম্পর্কগুলো সব ভঙ্গুর! সমস্ত কিছুই ভঙ্গুর, সম্পর্ক বিশেষভাবে ভঙ্গুর! ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ সেখানে ব্যতিক্রম। যেকোনও পরিস্থিতিতেই সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতির ছবি এটা।

সাহিত্যের গুণও এই চলচ্চিত্রে লক্ষণীয়। আমার মনে আছে কৈশোরে-যৌবনে যে সমস্ত ছবি দেখতাম, সেগুলোকে বই বলা হতো। অর্থাৎ বইয়ের যে গুণ, সাহিত্যের যে গুণ, তার সবটুকুই তখনকার চলচ্চিত্রে ছিল। তারপরে ক্রমাগত সাহিত্যের গুণটা চলচ্চিত্র থেকে সরে গেছে। মনে হয় এটা কেবল একটা স্থূল যান্ত্রিক বিষয়, শুধুই বিনোদনের বিষয়। এখানে চিন্তার কোনও দরকার নেই, বুদ্ধিবৃত্তির আবশ্যকতা নেই! সেই জাগাটিতেও কিন্তু ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে।

এটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রেড অক্টোবর’ দেখে আমি খুব কৌতূহলী ছিলাম। সে তো সেই অক্টোবর বিপ্লবের রেড, ১৯১৭-এর সেই রুশ বিপ্লব! পরে বুঝতে পারলাম, একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। সমাজ পরিবর্তনের সেই ইঙ্গিতটিই এখানে পেলাম। যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আর শৈল্পিক উপস্থাপনা রয়েছে।

আমি ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ এবং মাসুদ হাসান উজ্জ্বলকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের চলচ্চিত্রের যে শূন্যতা, যে বন্ধ্যত্ব তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণ করতে এরকম সাহসী চলচ্চিত্র এবং সাহসী নির্মাতার ভীষণ প্রয়োজন।


* ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ মুক্তি পাচ্ছে ২৮ ফেব্রুয়ারি
গ্রন্থনা: মাহমুদ মানজুর

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ