বিশ্বে ভালো ছবির আকাল, ৭০ বার্লিনালেও

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৭:৫০, মার্চ ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৪, মার্চ ০১, ২০২০

চলতি মাসেই ফিলিপাইনের চলচ্চিত্রের শতবর্ষ, বিশ্ব-সিনেমায় নিজস্ব গরিমা এখন পাকাপোক্ত, প্রমাণিত বহুদিনই, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রায়-স্থায়ী আসন। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে নামিদামি ‘ফেস্টিভালে’ ফিলিপাইনের ছবি প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হচ্ছে। দর্শক-সমালোচকের আদরও কাড়ছে যথেষ্ট। সেই তুলনায় ভারতীয় ছবি ক্রমশ পিছিয়ে।
৭০তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে অতিথিরাগত শতকের শেষাংশে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (পোশাকি নাম ‘বার্লিনালে’) ভারত থেকে মূল প্রতিযোগিতায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ছবিই ছিল শেষ। এরপরে এখন পর্যন্ত, আর কোনও ভারতীয় ছবি স্থান পায়নি, তথা মনোনীত হয়নি (প্রতিযোগিতায়)। তবে অন্যান্য বিভাগে, যথা প্যানোরমা, ফোরাম, জেনারেশন, তথ্যচিত্রে ঠাঁই পেয়েছে। এবারও পেয়েছে। চার বিভাগে চারটি। কোনও ছবিই সাড়া জাগায়নি, না দর্শককুলে, না সমালোচক মহলে।
যদিও প্রচারণায় কমতি নেই। ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম মার্কেটে সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের বড় স্টল, ছবি বিক্রির জন্যে কাকুতি, সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ঢাউস পোস্টার, সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’র ছবি। স্টল উদ্বোধন করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর। অবশ্য, স্টল উদ্বোধন করতে বার্লিনে আসেননি, এসেছিলেন জার্মান বিদেশ মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে, ভিন্ন কাজে। তিনি চলচ্চিত্রের বোদ্ধা নন, কূটনীতিক। তাই উদ্বোধন করতে এসে কায়দা করে বললেন, ‘ভারতীয় চলচ্চিত্রকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সর্বদাই আমাদের, সরকারি আনুকূল্যে কোনও বাধা নেই। ভারতের সব ভাষার চলচ্চিত্রই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য।’
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতের ছবি কেন পাত্তা পাচ্ছে না, জায়গা পাচ্ছে না, মূলে কী দুর্দশা, সরকারের সেন্সরনীতি, চোখ রাঙানি, কারা মাতব্বর, কী রাজনীতি, হরেক রকম গিঁট, বাধা, শিল্প-সংস্কৃতির নামে কে উঁচু মহলে, এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন করেনি কেউ, করলে ঝানু কূটনীতিক কী উত্তর দিতেন, অজানা।
জয়শঙ্করকে মনে হয়েছে, অন্তত তার কথায়, বাচনভঙ্গিতে, অতিশয় মৃদুভাষী, নিপাট ভদ্রলোক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, স্টলে, ফিতে কেটেই, মিনিট চারেক সময় কাটিয়ে দ্রুত প্রস্থান। মনে হলো, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।
এ বছর ‘বার্লিনালে’র সত্তর, যতটা জাঁকজমক আশা করেছিলাম, ছিটেফোঁটাও নেই। সবই নর্মাল। গতানুগতিক। তবে রদবদল কিছুটা। এর আগে উৎসবকর্তা ছিলেন একজন। ‘সত্তর বছর’ থেকে দুজন। একজন মহিলা, একজন পুরুষ। ‘নর-নারীর সমবণ্টন’- মারিয়েটা রিসানবেক (জার্মান) এবং কার্লো শাত্রিয়ান (ইটালিয়ান)।
উৎসবের জুরি-প্রধান ব্রিটিশ অভিনেতা জেরেমি আইরনস। জুরিতে সাতজন বিচারক (জুরি-প্রধানসহ)। তিনজন নারী, তিনজন পুরুষ। এখানেও ফেমিনিজম। ‘নারী-পুরুষ সমবন্টন।’ এও বাহুল্য। মূল প্রতিযোগিতায় ১৮টি ছবির মধ্যে ৮ জনই নারী পরিচালকের ছবি।
প্রত্যেক ‘নারী পরিচালক’ উত্তম, নিশ্চয় নয়, কয়েকটি ছবি (‘নারী’ পরিচালক) রীতিমতো চোখ ধাঁধিয়েছে। আন্দোলিত দর্শক, সমালোচক। ব্রিটিশ পরিচালক স্যালি পোটার (‘দ্য রোডস নট টেকেন’) চমৎকার কাহিনি ফেঁদেছেন, ডিমেনশিয়াগ্রস্থ এক পুরুষের জীবনচরিত। ছবির পরতে-পরতে টেনশন। ছবিতে সালমা হায়েক ছাড়াও নতুন অভিনেত্রী এলে ফানিং। ব্রিটিশ। ‘ফাটাফাটি’ অভিনয়। বয়স একুশ। সংবাদ সম্মেলনে সালমা বললেন, ‘এলে ফানিং-এর কাছে আমি ম্লান।’
জার্মান যে তিনটি ছবি প্রতিযোগিতায়, কোনোটিই দর্শকের কাছে বাহবা পায়নি। আলফ্রেড ভ্যয়েবলিনের বহুলপঠিত উপন্যাস ‘বার্লিন অ্যালেক্সজান্ডারপ্লাৎস’ চিত্রায়ণ করেছেন বুরহান কুরবানি, উপন্যাসের খোলনলচে পাল্টে উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে, মূলে গোঁজামিল।
‘বার্লিনালে’ বিস্তর দর্শকপ্রিয়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান অভিনেতা অভিনেত্রীর ভিড়, কিন্তু ছবির মান আশাব্যঞ্জক নয়। প্রশ্ন সর্বত্র। বিশ্বে ভালো ছবির আকাল, ৭০ বার্লিনালেও।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ