মুম্বাইয়ের সেই ব্যতিক্রমী খান– নাম যার ‘ইরফান’

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬:০৫, এপ্রিল ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩১, এপ্রিল ২৯, ২০২০

ইরফান খানপ্রায় তিন দশক ধরে বলিউড যে তিন ‘খান’-ই শাসন করে এসেছেন, তা কে না জানেন!

আমির, সালমান ও শাহরুখ খান—মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মূল চালিকাশক্তি হলেও এদের বাইরে আরও একজন খান কিন্তু নিজের যোগ্যতা আর প্রতিভায় ভারতের সিনেমাপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। এক কথায় যাকে বলা যায় ভক্তদের নয়নের মণি!
তিনি সব অর্থেই ছিলেন ব্যতিক্রমী। আজীবন বেঁচেছেন, অভিনয় করেছেন নিজের শর্তে। এমনকি, আন্তর্জাতিক সিনেমা দুনিয়ায়ও ভারতের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।
আর তিনিই সাহেবজাদা ইরফান আলি খান।
অন্তত এই নামেই তার জন্ম হয়েছিল রাজস্থানের টঙ্কে এক সম্পন্ন মুসলিম পরিবারে। পরে অবশ্য নাম থেকে সাহেবজাদা আর আলি-টা ছেঁটে ফেলেন, ইরফানের ‘র’-টাও লিখতেন ইংরেজির দুটো ‘R’ দিয়ে।
কিন্তু কেন? ‘কেন আবার? ওভাবে উচ্চারণ করলে আমার নামটা শুনতে ভালো লাগে’, সপাট জবাব ছিল ইরফান খানের।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িতে এতটাই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন যে একসময় তো রেগেমেগে ‘খান’টাও নাম থেকে বাদ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কয়েকটা সিনেমার টাইটেল ক্রেডিটে তার নাম শুধু ‘ইরফান’ হিসেবেও গেছে।
অথচ বলিউডের অন্য খানদের মতো তার ক্যারিয়ার মোটেই ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’ টাইপ ছিল না। আমিরকে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’, সালমানকে ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’ কিংবা শাহরুখকে ‘দিওয়ানা’ বা ‘বাজিগর’ যেভাবে হঠাৎ সুপারস্টার বানিয়েছিল– ইরফান খানের ভাগ্য মোটেও তেমন সুপ্রসন্ন ছিল না।
আসলে আশির দশকের শেষে বা নব্বইয়ের গোড়াতেও মুম্বাইতে যে ধরনের চেহারার নায়কের কদর ছিল, ইরফান মোটেও সেরকম দেখতে ছিলেন না। সে কারণেই ১৯৮৮-তে মীরা নায়ারের ‘সালাম বোম্বে’-তে একটা ছোট ক্যামিও আর পরের বছর বাসু চ্যাটার্জির ‘কমলা কি মওত’-এ নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার পরও সিনেমায় আর একটা ভালো ব্রেক পেতে তাকে দীর্ঘ এক যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
নিজ বাসায় স্ত্রীর সঙ্গে ইরফান খান
হ্যাঁ, এক যুগ বা কম করেও ১২ বছর। মাঝের সময়টায় টুকটাক টিভি সিরিয়াল আর সোপ অপেরায় অভিনয় করেই পেট চালিয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি।
এই লড়াইতে চিরকাল তার পাশে ছিলেন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা-তে তার সহপাঠিনী ও বাঙালি স্ত্রী সুতপা সিকদার, যার কথা ইরফান পরে বহু সাক্ষাৎকারে বহুবার কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
২০০১-এ ব্রিটিশ নির্মাতা আসিফ কাপাডিয়ার ‘দ্য ওয়ারিয়র’ ইরফানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কাপাডিয়ার বাজেট ছিল না বলিউডের কোনও প্রতিষ্ঠিত তারকাকে নেবেন, তাই তিনি খুঁজছিলেন ‘প্রতিভাবান কোনও অচেনা’-কে!  হিমালয়ের তুষারধবল পর্বতে আর রাজস্থানের মরুতে শুট করা এই ছবিটাই রাতারাতি বিখ্যাত করে দেয় ইরফানকে।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। পরবর্তী দুই দশকে তিনি প্রতি বছর অন্তত পাঁচ/ছয়টা করে ছবিতে অভিনয় করেছেন, যার বেশিরভাগই প্রধান চরিত্রে। স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেছেন বলিউড থেকে হলিউড– এমনকি ‘ডুব’ দিয়েছেন ঢাকাতেও।
‘বলিউড’ শব্দটা নিয়ে অবশ্য আপত্তি ছিল ইরফানের। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন, ‘হলিউডের নকল করে বলিউড– বিষয়টা কিন্তু কখনও সেরকম নয়। হলিউড অনেক সুপরিকল্পিত। বলিউডের অতো প্ল্যানের বালাই নেই। এটা অনেক স্বতঃস্ফূর্ত, ঘরোয়া- যার উৎস লুকিয়ে আছে পার্সি থিয়েটারে।’
অথচ সাজানো-গোছানো হলিউড থেকে খামখেয়ালিতে ভরা মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, দুটোতেই তিনি অনায়াসে অভিনয় করেছেন। ‘স্লামডগ মিলিওনিয়ার’-এর পুলিশ অফিসার থেকে ‘পিকু’র ট্যাক্সি কোম্পানির মালিক– দুটোতেই তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ।
সারা দুনিয়াতেই এমন কোনও অভিনেতা বোধহয় খুঁজে পাওয়া ভার– যিনি মাতৃভাষায় ‘মকবুল’, ‘হিন্দি মিডিয়াম’ বা ‘পান সিং তোমরে’র মতো ছবিতে দর্শকের যে ভালোবাসা পেয়েছেন– তেমনি বিদেশি ভাষায় তৈরি ‘নেমসেক’, ‘লাইফ অব পাই’ বা ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ডে’ও তার অভিনয়ের মুন্সিয়ানাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দর্শক।
‘ডুব’ ছবির অনুষ্ঠানে ইরফান খানের সঙ্গে রোকেয়া প্রাচী, তিশা ও পার্নো মিত্র২০১৮-তে হঠাৎই তার শরীরে ধরা পড়ে বিরল ও দুরারোগ্য এক রোগ, নিউরোএন্ডোক্রিন টিউমারস। দুই বছর ধরে সেই রোগের বিরুদ্ধে বীরের মতো লড়ছিলেন ইরফান। লন্ডনে টানা অনেক মাস চিকিৎসাও নিয়েছিলেন। অবশেষে মুম্বাইয়ের কোকিলাবেন হাসপাতালে সে লড়াই থেমে গেল আজ, ২৯ এপ্রিল ভোরে।
মাত্র চার দিন আগে জয়পুরে তার মা প্রয়াত হয়েছেন, লকডাউনের কারণে ইরফান মা-কে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে। চারদিনের মাথায় সে-ই মা যেন প্রিয় সন্তানকে বুকে টেনে নিলেন।
বহুদিন আগে ইরফান একবার বলেছিলেন, ‘আমি এত লাজুক ছিলাম, তাও আবার এরকম লিকলিকে রোগা চেহারা– কেউ কোনোদিন ভাবেননি আমি অভিনেতা হতে পারবো। কিন্তু আমার ভেতরে অভিনয়ের প্রচণ্ড ক্ষিদে ছিল, সুতীব্র ইচ্ছেটা ছিল বরাবর!’
সেই সুতীব্র ইনটেন্স অভিনয় আর তুলনাহীন স্বকীয়তার জন্যই সারা দুনিয়ার সিনেমাভক্তরা ইরফান খানকে মনে রাখবেন বহুদিন।

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ