মতামতওয়েব সিরিজ মানে কি অশ্লীলতা?

Send
কামরুজ্জামান বাবু
প্রকাশিত : ১৬:৫৭, জুন ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪১, জুন ২৪, ২০২০

ওয়েব সিরিজ মানেই নগ্ন শরীর প্রদর্শন?

কুরুচিপূর্ণ ভাষার ব্যবহার?
ধূমপান-মদপান-মাদকদ্রব্য গ্রহণ?
এই মহামারির মধ্যেও এমন প্রশ্ন কেন করছি? নব্বই দশকে এই ভূখণ্ডে এক টিকিটে দুই ছবির ধরনটা অনেকের কাছে পরিষ্কার ছিল। আর হাল আমলে এক ক্লিক বা আঙুলের টাচে ওয়েব সিরিজ নিয়ে ঠিকঠাক কোনও ধারণাই পাওয়া যাচ্ছে না!
কামরুজ্জামান বাবু

গত কয়েকদিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমগুলোতে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার দুটি ধারা তৈরি হয়েছে। একটি ধারা বিশ্বায়নের কথা বলে ওয়েব সিরিজের পক্ষে আওয়াজ তুলছেন। আরেকটি গেল গেল জাত গেল, কৃষ্টি-কালচার সব গেল বলে ধিক্কার জানাচ্ছে।

সরকারি কর্তাব্যক্তিরাও স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না। ‘বুজুর্গে’র মতো বলছেন দেশের প্রচলিত আইন মেনে আমাদের সামাজিকতা রক্ষা করে কাজ করতে হবে! সর্বশেষ তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘যারা অশ্লীল ওয়েব সিরিজ তৈরি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


এটুকু স্পষ্ট করার জন্য ধন্যবাদ মাননীয় মন্ত্রী।
হাতের মুঠোয় লাইভ অপশন থাকায় প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন। এমনও দেখা যায়, একে অপরকে গালমন্দ করতেও দ্বিধা করছেন না! করোনাকালে আমাদেরও এখন খেয়ে দেয়ে কোনও কাজ নেই। মানুষের ‘কাইজা’ অর্থাৎ শুদ্ধ ভাষায় যাকে বলে, ঝগড়া- বেশ ভালোভাবেই উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। দু’-একদিন হলো দেখেছি যে নিউজ টিভিগুলো এখন এই বিষয়টি নিয়ে ঝাঁঝালো টকশোর আয়োজন করছে। আহা- বোকা বাক্সের টিভি দর্শককেই এই শাস্তি পেতে হচ্ছে। সব দোষ এই আমাদের মতো দর্শকদের। কারণ, আমরা নেটফ্লিক্স-প্রাইম ভিডিও-হৈচৈ-জি-ফাইভ টাকা দিয়ে কিনছি, তাই প্রতিযোগিতায় থাকার জন্য আমাদের একদল নির্মাতা তেমনই মানের ওয়েব সিরিজ তৈরি করছেন বলে দাবি করছেন। বলতে পারেন, মান মানে কী? মান মানে কী নগ্নতা? অশ্লীলতা? রগরগে দৃশ্য আর অশ্রাব্য ভাষার ব্যবহার?

ওয়েব সিরিজ বিতর্ক: জোটবদ্ধ ১১৮ নির্মাতা, দিয়েছেন বিবৃতি

এবার ওয়েব সিরিজ প্রসঙ্গ। ওয়েব সিরিজ মানেই যদি অশ্লীলতা হয়, তাহলে আমার কোনও আপত্তি নেই। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমার কথা আছে।

প্রথমত আমি বাংলাদেশে বসবাস করি। এ দেশের নাটকের রয়েছে স্বর্ণযুগের ইতিহাস এবং এখনও টেলিভিশনে নাটক হলো অন্যতম বিনোদন ও বাণিজ্য করার পণ্য। শুধু টেলিভিশনেরই নয়, ইউটিউবেও নাটক থেকে লাখ লাখ টাকা আয় হয় অনায়াসেই। যতই আমরা বলি না কেন, বস্তাপচা গল্প বা জঘন্য নাটক নির্মাণ হচ্ছে দেশে, তারপরও ঈদের মতো উৎসবে টিভি চ্যানেলগুলো ৭ থেকে ১০ দিন ধরে পিক আওয়ারে নাটক অনএয়ার করে। ঈদ উপলক্ষে অনেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ করে ইউটিউবে নাটক আপ করে। এই তো সেদিন ঈদে ‘বড় ছেলে’ নামে একটি নাটক টিভিতে ও ইউটিউবে গেলো। মিলিয়ন মিলিয়ন দর্শক। কই এখানে তো কোনও বাজে শব্দের গালি ছিল না, ছিল না কোনও অশ্লীল দৃশ্য। ছিল মায়া, ছিল ভালোবাসা, ছিল কান্না, ছিল কষ্ট। এরপরেও এরকম নাটক হয়েছে এবং হচ্ছে। তাহলে হঠাৎ করে কী সমস্যা হলো?

গেল ঈদে তিনটি ওয়েব সিরিজ এলো। সেগুলো আবার পাইরেসি হয়ে ইউটিউবে ছড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্মাতারা। আহা, আমাদের অ্যাপের কী সুরক্ষা! আমরা ওয়েব সিরিজ বানিয়ে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে দিলাম। সেখান থেকে চলে গেল ইউটিউবে! সাধারণ রুচিশীল কোনও মানুষই ওয়েব সিরিজ তিনটিকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। না নেওয়ারই কথা। খুব আগ্রহ নিয়েই দেখলাম। ‘আগষ্ট ১৪’ দেখার পরে মনে হলো ঐশীর গল্পটিকে ভালোভাবেই নির্মাতা শিহাব শাহীন তুলে এনেছেন। কিন্তু কোনও দরকার ছিল না মন্দ ভাষার গালিগালাজগুলো। দরকার ছিল না অশালীন দুই একটি দৃশ্যের। নির্মাতার কাছে বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাই, আপনি কি আপনার সন্তানকে নিয়ে এই সিরিজটি দেখতে পারবেন? জানতে পেরেছি, নির্মাতা সম্প্রতি আপত্তিকর গালি ও কিছু দৃশ্য কর্তন করেছেন। এজন্য নির্মাতাকে ধন্যবাদ। আরও জেনেছি, অন্য দুই সমালোচিত সিরিজ নামিয়ে ফেলা হয়েছে। সেটির জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই বিঞ্জ কর্তৃপক্ষকেও। এটলিস্ট দেরিতে হলেও তারা আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণটা অনুভব করতে পেরেছেন, হয়তো।


সবকিছু মুছে দিলে বা এডিট করলেই তো এত দ্রুত এই ক্ষত শুকাবার নয়। তাই কথাগুলো বলছি।

ওয়েব সিরিজ বিতর্ক: ৭৯ ব্যক্তিত্বের অভিমত

এবারে আসি ‘সদরঘাটের টাইগার’ সিরিজের বিষয়ে। সুমন আনোয়ার, কাজের জন্য প্রশংসিত টিভি অঙ্গনে। কিন্তু এবার অভিনেত্রী অহনাকে দিয়ে তিনি যে সংলাপগুলো আওড়ালেন, (ছাপার অযোগ্য) আদৌ কি বাংলাদেশের কোনও স্ত্রী তার স্বামীকে নিয়ে এভাবে কথা বলে? আমি পুরান ঢাকাতে ছিলাম প্রায় চার বছর। খুব কাছ থেকে অনেক বিত্তশালী পুরুষ এবং স্ত্রী-শাসিত পরিবার দেখেছি। তাদের স্ত্রীদের কোনোদিন এমন সংলাপ বলতে শুনিনি।
আরেকটি সিরিজের নাম ‘বুমেরাং’। এখানে হিল্লোল-অর্ষা এবং আজাদ আবুল কালাম অভিনয় করেছেন। একটাই প্রশ্ন, হিল্লোল ও অর্ষা যখন শয্যাশায়ী তখন আজাদ আবুল কালাম পাশের সোফায় বসে আছেন, এটির কি কোনও দরকার ছিল? এর নাম কি মুক্তচিন্তা? নির্মাতা ওয়াহিদ তারেক, আপনি কি পারবেন আপনার নির্মিত সিরিজটি পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করতে? নেটফ্লিক্স-এর সুবাদে ‘পাবলো’, ‘নাকরোস’-এর মতো ব্যয়বহুল সিরিজ আমরা দেখেছি। সেখানে নারী-পুরুষের বিছানাদৃশ্য দেখানো হয়, কিন্তু গল্পের কারণে সেখানকার দৃশ্যগুলো যতটা প্রয়োজন মনে হয়, এই সিরিজে কী এই দৃশ্যগুলোর আদৌ প্রয়োজন ছিল?
ওয়েব সিরিজে মৌটুসী, শ্যামল মাওলা ও ইমিকে আমরা যেভাবে দেখলাম, তাতে একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, নিছক শরীরসর্বস্ব সিরিজ হিসেবেই এটি তৈরি করা হয়েছে এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করার উদ্দেশ্যেই এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। যৌনদৃশ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করার বিষয়টি আজকে নতুন কিছু নয়। আর যদি যৌনদৃশ্যের ওপর ভর করেই নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিও, হৈচৈ-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার অভিপ্রায় থাকে আমাদের কারও কারও, তাহলে বলবো, দুঃখিত—আপনারা মেধাশূন্য হয়েছেন বলেই যৌনতার ওপর ভর করছেন।
নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিও বা হৈচৈ-এ এমন অনেক সিরিজ হয়েছে যেগুলো ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যেখানে যৌনতা বা রগরগে কোনও দৃশ্য নেই। তাহলে আমার প্রশ্ন, একটি অ্যাপে তিনটি সিরিজ তৈরি হলো, আর তিনটিতেই রগরগে দৃশ্য বা অশ্রাব্য ভাষার ব্যবহার, তার মানে তো ধরেই নিতে হবে এটা আসলে পরিকল্পিত।

‘আমরা কারিনার ক্লিভেজ মুগ্ধ হয়ে দেখি আর মমকে দেখে গালি দেই!’

আমি প্রায় ২৩ বছর ধরে বিনোদন সাংবাদিকতা করেছি একই সঙ্গে আমি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) সাধারণ সম্পাদক। আমার কাজের সুবাদে সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তাদের কারও সঙ্গেই আমার সম্পর্ক খারাপ নয়। ফলে কারও ওপর রাগ বা অনুরাগের বশে কথাগুলো বলছি না। নব্বই দশকের শেষভাগে এসে আমাদের বাংলা সিনেমাতেও একইভাবে নগ্নতা মানেই অশ্লীলতা নয়, নগ্নতা হলো নান্দনিকতা- এরকম যুক্তি তুলে ধরে, অশ্লীল বা যৌনতায় ভরপুর দৃশ্যায়ন সংযোজন করা হতো। পরে এর নাম হয়ে যায় ‘কাটপিস’। মধ্যবিত্ত ও নারী দর্শকরা সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে গেলো। সে সময় জাতীয় পত্রিকাগুলো ধারাবাহিকভাবে এই সিনেমাগুলোর খবরাখবর প্রকাশ করেছে এবং সিনেমাগুলো সরকার নিষিদ্ধ করেছে। ২০০৪ সালে তৎকালীন সরকার বাধ্য হয়ে দেশে অশ্লীলতাবিরোধী আইন জাতীয় সংসদে পাস করেছে। এমনকি অশ্লীলতা বন্ধ করার জন্য র‌্যাবকে দিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করেছে। চলচ্চিত্র এখন অশ্লীলতামুক্ত।
আমার আশঙ্কা, আজ যে বা যারা এই সিরিজের পক্ষে সাফাই গাইছেন, তারা বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক, নাটক-শিল্পকে ধ্বংস করার প্রাথমিক কাজটি শুরু করে দিয়েছেন।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়, একটি দেশে সিনেমার জন্য অশ্লীলতাবিরোধী আইন রয়েছে আর সেই দেশে ওয়েব সিরিজের জন্য সে আইন বলবৎ হবে না, তা তো হতে পারে না। সিনেমা বানাতে গেলে আমাকে বলবেন, তুমি তোমার কৃষ্টি কালচার, তোমার আইন মেনে সিনেমা বানাও, আর ওয়েব বানালে আমি যা খুশি তা বানাবো, বাহ্!
এক দেশে কি দুই আইন চলতে পারে? অনেকেই ভাবতে পারেন যে, আমি বোধহয় সেন্সরশিপ চাইছি। মোটেই না। আমি তো বলবো যে এখন আর সেন্সর বোর্ড থাকাই উচিত নয়! কারণ, এক দেশে দুই ধরনের নিয়ম থাকতে পারে না। অ্যাপ যদি সুনির্দিষ্ট দর্শকের জন্য হয়, সিনেমাও তো সুনির্দিষ্ট দর্শকদের জন্য। টিকিট কেটে নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শক সিনেমা হলে যায়। তাহলে সিনেমায় চুম্বনের দৃশ্য কর্তন হবে, আর ওয়েবে খোলামেলা দৃশ্য চলতে পারে, এমন যুক্তি দেন কী করে সাফাইকারীরা?

...তাই আপনাকে অশ্লীল লাগছে!

আগেও বলেছি, এখনও বলবো- সেন্সর বোর্ডকে সার্টিফিকেট বোর্ড করে দিন। সেখান সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ যাই বানানো হোক না কেন সেগুলোকে গ্রেডেশন করে দিন। আর একটি কথা, যখন আপনি স্বাধীনতা পাবেন, তখন তাকে ধরে রাখতেও জানতে হবে। আপনি স্বাধীনতার অপব্যবহার করে ‘বুমেরাং’ বানাবেন, তখন কিন্তু পুরো পরিস্থিতিটাই বুমেরাং হবে।
এখন কঠিন কথাটি বলছি। গত কয়েক বছরে দেখেছি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যে কয়েকটি সিনেমা বানিয়েছেন, তার প্রতিটি সিনেমাই সেন্সর বোর্ডে আটকা পড়েছে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ছবিগুলো ছাড়পত্র পেয়েছে। কই সেদিন তো আজকের তরুণ নির্মাতাদের বিবৃতি দিতে দেখিনি। ফারুকীর ছবি সেন্সরের কাঁচিতে পড়েছিল বলে সেদিন তারাই বেশি উল্লসিত হয়েছিলেন, যারা আজকে ওয়েব সিরিজ-এর পক্ষে গলা চড়াচ্ছেন। ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’, ‘টেলিভিশন’ সিনেমাগুলোতে কিন্তু কোনও অশ্লীলতা ছিল না। তারপরেও আপনারা ছিলেন নিশ্চুপ। কেন এই দ্বিমুখী নীতি। আর আজ যখন ওয়াহিদ তারেক ‘বুমেরাং’-এর মতো সিরিজে পর্ণ দৃশ্য দেখায়, তখন সেটির বৈধতা চাইছেন।
বাহ্, মামাবাড়ির আবদার। কঠিন কথাটি হলো, এই ‘বুমেরাং’-এর মতো সিরিজ আমাদের অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে। এমন সিরিজের জন্যই ওয়েব সিরিজে সেন্সরশিপের আলোচনা উঠেছে। এখন যদি সরকার সেন্সর আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। কারণ, দেশের কোনও সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ‘বুমেরাং’-এর পক্ষে কথা বলছেন না। প্রয়োজন হলে আপনারা দর্শকদের মতামত নিন, তাহলেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন।
অতএব, ওয়েব সিরিজের নির্মাতা ভাইয়েরা, আপনারা শুধু আপনাদের নিজেদের ক্ষতি করলেন না, একই সঙ্গে ক্ষতি করলেন এই সম্ভাবনাময় মাধ্যমটির।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের অশ্লীলতাবিরোধী আইন অনুযায়ী যে বা যারা অশ্লীল বা নগ্ন দৃশ্যে কাজ করবেন, এর সঙ্গে যুক্ত শিল্পী কলাকুশলী সবাই অপরাধী।
চলুন আমরা জেনে নিই আইনে কী বলা হয়েছে? ‘পর্নোগ্রাফি মানে-(১) যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনও অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য যারা চলচ্চিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র বা অন্য কোনও উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যাহার কোনও শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই।’ তাই যদি হয়, তবে কেন এখনও এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের হলো না। আমরা দেখলাম, আইনি নোটিশ পাওয়ার পর সকল মাধ্যম থেকে তিনটি সিরিজের দুটি তুলে নেওয়া হয়েছে। একটি কর্তন করা হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি যারা এই কাজটি করলেন, তারা এরপরেও কী করে এর পক্ষে বিবৃতি দেন, লাইভ টকশোতে এসে কথা বলছেন? তাহলে তারা কি আদালত বা দেশের প্রচলিত আইনকে অমান্য করছেন না? আশা করি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

কোথাও নেই বিতর্কিত সিরিজ ‌‘বুমেরাং’ ও ‘সদরঘাটের টাইগার’

বলা হচ্ছে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে এমন সিরিজের দরকার আছে। কোনও সমস্যা নেই। ওয়েব সিরিজ তৈরি করুন, যেকোনও গল্প নিয়েই করতে পারেন, কিন্তু সেখানে অশ্লীলতা ও যৌনদৃশ্য পরিহার করলে কী খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? এখানে আমি আর একটি উদাহরণ দেই, টেলিভিশনের স্বর্গরাজ্য বলা হয় ভারতকে। তারা তো আমাদের থেকে অনেক বেশি আধুনিক। সারা দুনিয়াতেই তাদের নাটক প্রদর্শন হচ্ছে। তারা কি প্রতিযোগিতায় নেই? তারা কি মানুষের কাছে জনপ্রিয় নয়? তারা কি তাদের নাটকের জনপ্রিয়তা পেতে যৌনতানির্ভর দৃশ্য সংযোজন করছে? তাহলে কেন, আমরা হঠাৎ করে আমাদের সংস্কৃতির মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে আধুনিকতার নামে এমন বাজে দৃশ্যায়নের সিরিজ বানালাম?
বিষয়টি ভাবতে হবে। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি থেকে আমরা অবশ্যই অনেক কিছু নেবো। সেখানে থেকে আমরা তা-ই নেবো, যা আমাদের সমাজের সঙ্গে যায়, যা আমার পরিবার নিয়ে উপভোগ করা যায়। আমি ভালোটা রেখে কেন মন্দটা গ্রহণ করবো? আরেকটি কথা, আমি আমার নিজের ঘরে কী করছি, তা তো আমার নিজের মধ্যেই রাখবো, কিন্তু তা কি খোলাসা করে মানুষকে দেখাতে হবে? অনেকেই বলেন, নগ্নতা মানেই তো অশ্লীলতা নয়। আমিও তাই বলি ও জানি। আর এই যুক্তি দিয়ে যদি আমি আমার নাটকে কোনও আরোপিত নগ্নদৃশ্য জুড়ে দেই, সেটি কি তখন আর নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে?
দেরিতে হলেও আমাদের নাটকের বিজ্ঞজনরা যে বিবৃতি দিয়েছেন, আমি মনে করি তাদের আরও সোচ্চার হতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে যেতে হবে, দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই এই নোংরা সিরিজ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
না হলে প্রয়াত গোলাম মুস্তাফা, আব্দুল্লাহ আল মামুন, হুমায়ুন ফরীদি আর জীবন্ত কিংবদন্তি হাসান ইমাম, ফেরদৌসি মজুমদার, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা, আজিজুল হাকিম, তৌকীর আহমেদ, জাহিদ হাসান, আফসানা মিমি, শমী কায়সার, বিপাশা হায়াতদের মাধ্যমে যে নাটকের অঙ্গন আমাদের সমাজে সমাদৃত হয়েছে, তা কলুষিত হবে।
তা না হলে কোনও ভদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা অভিনয় অঙ্গনে পা দেবে না। আমাদের সমাজ হবে নাটকশূন্য। আমরা নিশ্চয়ই এমন অবস্থায় ফিরে যেতে চাই না।আলোচিত তিনটি সিরিজের প্রচ্ছদ
লেখক:
অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান, নাগরিক টিভি
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ