ইসলামফোবিয়া যখন পাশ্চাত্য জগতের পরিচয়ের রাজনীতিতে এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ, তখনও লন্ডন সরব হলো মুসলিম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠলো খ্রিস্টান সন্ত্রাসীর হামলাকে ক্যাথলিক হামলা না বললে, কেন মুসলিম পরিচয়ে হামলা হলে তা ইসলামী হামলা হয়। হামলায় হতাহতদের জন্য শোক রূপান্তরিত হলো সব মানুষের প্রতি ভালোবাসায়। জোরালো কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত হলো বিদ্বেষ আর ভয়কে ভালোবাসা দিয়ে প্রতিহত করার শপথ।
ম্যানচেস্টার হামলার পরপরই লন্ডন ব্রিজে হামলা। এখনও সদ্য-স্মৃতিপটে দগদগে ক্ষত।। সিটি হল ও টাওয়ার ব্রিজের মাঝের সেই হামলাস্থল এখনও থমথমে। এখনও স্বজন হারানোর আহাজারি থামেনি। তবে এখান থেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় বুক বাঁধছে মানুষ। শোককে রূপান্তরিত করছেন শক্তিতে।
এখনও এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি ম্যাস্কওয়েল মাদজিকাঙ্গা । হামলাস্থলের কাছাকাছি প্রতিদিনই মধ্যাহ্নভোজ সারতেন। কিন্তু এখন এই জায়গাটা যেন একদম পাল্টে গেছে! ব্রিটেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়য়ের এনএইচএস এর স্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ক এই বিশ্লেষক জানান, ‘আমি শুক্রবার সেখান থেকে চলে আসি। এখন সবকিছু অনেক নীরব। আমি রবিবার গিয়ে এখনও সেই ক্ষত দেখতে পাই। আমাদের অফিসেও সবাই চুপচাপ হয়ে গেছে। কোনও হাসি-তামাশাও নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা থেমে গেলে সন্ত্রাসীরা জিতে যাবে।’
অনেকে হামলার স্থানে সম্মান জানাতে গিয়ে নীরব হয়ে পড়েন। চোখের জল ফেলে ফিরে আসেন অনেকে। এড়িয়ে যেতে চান ওৎ পেতে থাকা সংবাদমাধ্যমকে।
লন্ডন ব্রিজ ও বরো মার্কেটের সেই হামলায় প্রাণ হারায় সাতজন। আর আহত হন ৪৮ জন। সেখানে হতাহতদের সম্মানে জানাতে গিয়ে অনেকে বলছেন, ‘আমরাও তো হামলার শিকার হতে পারতাম।’ সপ্তাহে প্রতিদিনেই এখানে আসার চেষ্টা করেন বিজ্ঞাপনী সংস্থার নির্বাহী আরা বার্নিকোভ ও লিন্ডা হ্যামার। ফুলের তোরা হাতে নিয়ে বার্নিকোভ বলেনম আমরা প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার সেখানে যাই। প্রতিদিনই যাই।’
বরো মার্কেটের রাইট ব্রাদার্সের বার টেন্ডার জোনাথন কইম্বারা বলেন, ‘আমরা সেই রাতে দরজা বন্ধ করে দেই। রক্তমাখা ছুরি দেখতে পাই। তারা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি। আমরা গুলির আওয়াজ পা্ই কিন্তু জানি না কারা এই গুলি করছে, ভালো না খারাপ।’ কথা বলতে বলতেই যেন আতঙ্ক ঝড়ছিলো তার কণ্ঠে।
মার্কেটের বিপরীতে বাস করা নিল ম্যাকগিনিজ অবশ্য মনে করেন এই শোকই শক্তি হয়ে উঠবে। হতাহতদের স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই কষ্টের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। এটাকে সাথে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের, আজকের রাতে সেটারই অংশ।’
এর আগে ১৯৭০ দশকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি' (আইআরএ) খুব সক্রিয় ছিল। যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে 'ইউনাইটেড আয়ারল্যান্ড' গঠনে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল। তারা লন্ডনের মাটিতে ত্রাস তৈরি করে। ম্যাকগিনিজ বলেন, ‘সন্ত্রাস কখনোই জিততে পারবে না। ভালোবাসা ভয়ের চেয়ে শক্তিশালী। যখন আইআরএ বোমা হামলা করে আমরা কখনোই তাদেরকে ক্যাথলিক বলে উল্লেখ করি না। তারা শুধুই সন্ত্রাসী। ইসলামের মতো পবিত্র শব্দকে তাদের তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে কলঙ্কিত করা ঠিক নয়।’
এমা ভ্যালেন্টাইন নামে এক মানবাধিকার কর্মী বলেন, তিনি দশ বছর ধরে লন্ডনে বাস করছেন। কিন্তু এমন লন্ডন কখনো দেখেননি। তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষরা এখানে একত্রিত হয়েছে এক হয়েছে।’ তিনি একদল মুসলিমদের সঙ্গে দাড়িয়ে ছিলেন যাদের হাতে ব্যানার ছিলো, ‘আই অ্যাম মুসলিম, উই আর সেফ।’ অর্থাৎ আমরা মুসলিম, আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এমা বলেন, আমি খারাপ লাগে যে তাদের এইকথা বলতে হচ্ছে। কারণ আমরা সবাই লন্ডনবাসী।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও টেলিগ্রাফ
/এমএইচ/বিএ/








