ভুয়া গণভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা সংহত করার পর ২০১০ সালে মিয়ানমারের তখনকার জান্তা সরকার একটি ভুয়া নির্বাচনের আয়োজন করে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির দল সেই নির্বাচন বর্জন করলেও ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে অংশ নেয় তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি)। সেনা-নিয়ন্ত্রিত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে সু চি নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তার দল ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায়। ওই বছরই অনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন তিনি। এর এক বছর আগে ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের তখনকার শীর্ষ জেনালের থেইন সেইন এর সঙ্গে দেখা হয় সু চির। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই থেকেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সখ্যের সূচনা হয়।
২০০৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা একটি ‘ভুয়া’ গণভোটের আয়োজন করে, নিজেদের ক্ষমতা সংহত করে। ২০১০ সালে জান্তা একটি জাতীয় নির্বাচন দেয়। সু চির রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি’ (এনএলডি) সেই নির্বাচন বর্জন করে। তাদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনি আইন ‘অন্যায্য।‘ ওই নির্বাচনে সামরিক জান্তার তৈরি দলটি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনকরে।
সেনা কর্তৃপক্ষ তখন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সরকার গঠন করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান থেইন সেইন। এর কয়েকদিন পরেই সু চিকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সে সময় বিশ্বজুড়ে তার মুক্তি পাওয়ার বিষয়টিকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে সু চি প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত সরকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক মিয়ানমার গড়তে ইচ্ছুক অং সান সু চির এক কৌশলী মিথস্ক্রিয়া।
২০১১ সালের নভেম্বরে হিলারি ক্লিনটন যান মিয়ানমারে। ৫০ বছরের মধ্যে সেটাই ছিল মার্কিন কোনও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফর। ২০১২ সাল নাগাদ দেশটির ওপর থাকা সব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনও সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার আদেশ দেন। সেই সঙ্গে মুক্তি দেন শত শত রাজবন্দিকে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড ২০১১ সালে সু চির সঙ্গে দেখা করেন ইয়াঙ্গুনে। সু চি ও তার সহযোগীরা দুইটি ভাঙাচোরা গাড়িতে করে উপস্থিত হন সাক্ষাতের জন্য। ওই দুইটি গাড়িই তাকে সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
সু চি ২০১২ সালের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যদিও আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বৈধতা পেয়ে যাবে, যা সামরিকতন্ত্রের প্রতি পক্ষপাত করে। প্রচার চালানোর সময় জনগণের কাছ থেকে বিপুল সমাদর পেয়েছিলেন সু চি। উপনির্বাচনে তার দল এনএলডি ৪৪ আসনের মধ্যে ৪৩টি আসনে জয়লাভ করে। সু চি ইয়াঙ্গুনের ছোট গ্রাম কামুর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এসময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সু চিকে ‘মানবাধিকারের সুপারস্টার’ আখ্যা দেয়।
২০১২ সালের মে মাসে অনির্বাচিত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংসদে যোগ দেন সু চি। মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির মোট আসনের এক চতুর্থাংশ বরাদ্দ সেনা কর্মকর্তাদের জন্য। সেনাবাহিনীর হাতেই ক্ষমতা থাকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করার। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড মনে করেন, সু চি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটির ভেতরে ঢুকে তার পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছিলেন। ‘তার পরিকল্পনা ছিল সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করা এবং দেখা, বদলে কতটা প্রত্যাশা পূরণ হয়।’







