লাদাখের সংঘাতের পর ভারতজুড়ে ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছে চীনবিরোধী মনোভাব। তবে চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অবস্থান দেশের জাতীয়তাবাদী ও কট্টরপন্থীদের বিপরীতে। তিনি যুদ্ধ চান না। কেননা, মোদি জানেন সংঘাতে জড়ালে চীনের সঙ্গে পেরে উঠবে না তার দেশ। সে কারণে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে লাদাখ সীমান্তে ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে উত্তেজনার পর গত ১৫ জুন (সোমবার) উভয় পক্ষ সংঘাতে জড়ায়। এতে ভারতীয় সেনাসূত্র তাদের ২০ সদস্য নিহত হওয়ার কথা জানায়। তাদের দাবি, সংঘর্ষে চীনেরও বেশ কিছু সংখ্যক সেনা নিহত হয়েছে। তবে চীনের পক্ষ থেকে কোনও হতাহতের তথ্য জানানো হয়নি।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মোদি সে দেশের সেনাদের চীন সীমান্তে যেকোনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, ‘কেউ আমাদের সীমান্তে অনুপ্রবেশ করেনি। কেউ এখন সেখানে নেই। আমাদের কোনও নিরাপত্তা চৌকিও দখল হয়ে যায়নি।’ মোদির এই বক্তব্যকে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে বেইজিং। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মূলত গালওয়ান উপত্যকায় সাম্প্রতিক সংঘাতজনিত উত্তেজনা প্রশমিত করতে চাইছেন।
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক লিন মিনওয়াং মনে করেন, ভারত-চীন উত্তেজনা শিথিল করতে প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্য খুব মূল্যবান ভূমিকা রাখবে। কারণ, চীনকে আরও বেশি করে দোষারোপ করার মতো কোনও নৈতিক ভিত্তি তিনি কট্টরপন্থীদের জন্য রাখেননি।
বেইজিংভিত্তিক সামরিক বিশেষজ্ঞ ওয়ে ডংজু মনে করেন, সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে মোদি যে হুমকি দিয়েছেন তা লোক দেখানো। গ্লোবাল টাইমসকে তিনি বলেন, জনগণকে শান্ত করতে এবং সৈনিকদের মনোবল দৃঢ় করতে এমন কথা বলেছেন মোদি।
লিন বলেন, ‘ভারতের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে দেখাটা স্বাভাবিক। তবে ভারতের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের প্রভাব থাকবে কিনা এবং তা চীনকে আরও উসকে দেবে কিনা তা নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ভারত যখন পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তখন কট্টরপন্থীদের প্রকৃত অভিযান চালানোর জন্য প্ররোচিত করে জাতীয়তাবাদী চৈতন্য। তবে চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা।’
‘চীন কতটা শক্তিশালী, তা জাতীয়তাবাদীরা অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করলেও ভারত সরকার ও সে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা ঠিকই বোঝেন। সে কারণে তারা কিছু কড়া শব্দ ব্যবহার করলেও আমাদের বিরুদ্ধে আগে গুলি ছোড়ার মতো সাহস করবে না’- বলেন লিন।
চীনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত এড়াতে চীন খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। তার মানে এ নয় যে কোনও দেশের, বিশেষ করে ভারতের শত্রুতাপূর্ণ আচরণে তারা ভীত। ভারত-চীনের মধ্যে যেকোনও ধরনের বড় সংঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯৬২ সালের পরিস্থিতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
লিন বলেন, ভারত সংলগ্ন পশ্চিম সীমান্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার ইচ্ছে চীনের নেই। বরং দেশটি তাইওয়ানকে একীভূত করার জন্য পূর্ব সীমান্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে চায়। সুতরাং, ভারত সংলগ্ন সীমান্তে চীনা সেনা মোতায়েনের সংখ্যা ভারতীয় পক্ষের তুলনায় কম।
তারপরও যদি উত্তেজনা না কমে এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তবে চীনের বিপুল পরিবহন ও সামরিক শিল্পের বদৌলতে ভারতের ওপর সমন্বিত কৌশল প্রয়োগ করতে পারবে পিএলএ। আর সে কারণেই গত কয়েক দশকে চীনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের প্রচেষ্টা চালায়নি ভারত। ছোটখাটো উত্তেজনার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থেকেছে।







