জার্মানির কোলন শহরে নববর্ষ উৎসবে সংঘবদ্ধ যৌন নিপীড়নের ঘটনায় কারা দায়ী তা নিয়ে চলছে তীব্র বিতর্ক। জার্মান সরকারের নেওয়া উন্মুক্ত অভিবাসন নীতিবিরোধীরা বলছে, শরণার্থীরাই ওই যৌন নিপীড়নের ঘটনার জন্য দায়ী। তবে সরকারসহ স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দাবি, শরণার্থীরাই যে এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন সে ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এদিকে ঘটনার পর পরই বিদেশি নাগরিক আর অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় খবর প্রকাশ না করায় তোপের মুখে রয়েছে দেশটির পুলিশ বিভাগ ও মিডিয়াগুলোও।
গত বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) রাতে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে কোলন সিটি সেন্টার ও এর আশেপাশের এলাকায় প্রচুর মানুষ জড়ো হয়। ভিড়ের সুযোগে কোলন স্টেশন ও সিটি সেন্টারের মাঝামাঝি জায়গায় একদল তরুণ নারীদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। কোলন ছাড়াও হামবুর্গ আর স্টুটগার্ট শহরেও একইধরনের ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত পুলিশের কাছে প্রায় ১শ’টি অভিযোগ এসেছে। এরমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ অভিযোগ যৌন নিপীড়নের। দুটি ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নিপীড়নকারীদের বয়স ১৫-৩৫ এর মধ্যে। তারা ৩০-৪০ জনের মতো করে একটি দল তৈরি করে আলাদা আলাদাভাবে ঘেরাও করে নিপীড়ন চালিয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি আরব অথবা উত্তর আফ্রিকার নাগরিক হতে পারেন বলে অভিযোগ করা হলেও তাদের পরিচয় সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনও তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিবাসীদের জন্য জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল উন্মুক্ত দরোজা নীতি ঘোষণার পর দেশটিতে গত ১২ মাসে ১০ লাখেরও বেশি অভিবাসী প্রবেশ করেছে। এছাড়া প্রতিদিনই নতুন করে কয়েক হাজার অভিবাসী যুক্ত হচ্ছেন। এমন অবস্থায় অভিবাসন নীতির বিরোধিতা করে গণ অভিবাসন বন্ধ করতে মের্কেলের ওপর চাপ দিয়ে আসছে ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) এবং এন্টি ইসলামিক মুভমেন্ট পরিচালনাকারী সংগঠন পেগিডার মত কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো। বর্ষবরণের সময় যৌন নিপীড়নের ঘটনায় শরণার্থীদের জড়িত থাকার সম্ভাবনাকেই তাই জোরালো করে দেখছে তারা।
তবে সরকার ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দাবি, ওই ঘটনায় শরণার্থীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুতরাং প্রমাণ পাওয়ার আগে কাউকে সন্দেহ করা ঠিক হবে না বলেই মত দিয়েছেন তারা। কোলনের পুলিশ প্রধান জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় ঠিক কারা জড়িত সে ব্যপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে তিন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে প্রচণ্ড ভীড় আর অন্ধকারের কারণে প্রকৃত দোষীদের আদৌ শনাক্ত করা সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যদি দোষীদের শনাক্ত করা না যায় তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছেন কেউ কেউ।
এদিকে বর্ষবরণের সময় যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়েছে জার্মান পুলিশ। ঘটনার পর পরই ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন তারা। তবে ঘটনার দিন প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ছিল না বলে স্বীকার করেছেন পুলিশ ট্রেড ইউনিয়নের প্রধান রেইন ওয়েন্ডেট।
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত শেষে দোষীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলেও, যৌন নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য নারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন কোলনের মেয়র হেনরিয়েটে রেকার ৷ তাঁর পরামর্শ, নিজেকে নিরাপদ রাখতে পুরুষদের থেকে নারীদের অন্তত এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে৷ এরপরই বর্ষবরণের দিনের যৌন নিপীড়নের ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় চলে আসে। পরে অবশ্য সমালোচনার মুখে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। অভিবাসীবিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ঘটনার পর পরই খবর প্রকাশ না করায় ক্ষমা চেয়েছেন বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষও। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
/এফইউ/বিএ








