চকলেট আর বিয়ারের জন্য বিখ্যাত ছিল খেয়ালি ও ব্যস্ত নগর ব্রাসেলস। কিন্তু ক্রমশ এই নগর কুখ্যাত হয়ে উঠছে। কারণ আর কিছুই নয়, জিহাদিদের জন্য উর্বর ভূমি হয়ে উঠেছে এই নগরী। কিন্তু কেন? মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সেই প্রশ্নের উত্তর। ওই বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রান্তিকতার বোধ আর নিরাপত্তা বাহিনীর উদাসীনতার কারণেই সন্ত্রাসবাদের উর্বর ভূমি হয়ে উঠছে ব্রাসেলস।
পুলিশ সূত্রমতে, প্যারিস হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়েছিলো ব্রাসেলসেই। ব্যর্থ অভিযানের পর সেখানকার এক অ্যপার্টমেন্টে আত্মগোপন করে ছিলেন সালাহ আব্দেসলাম। একটি রাস্তায় ফেলে দিয়েছিলেন তার আত্মঘাতী হামলার বেল্ট।
আব্দেসলামকে ধরা গিয়েছিল অনেকটা ভাগ্যক্রমে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যাবস্থা সত্ত্বেও অভিযানগুলো ব্যর্থ হচ্ছিলো, পুলিশের দেওয়া তথ্য ধরে ওই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আটক করা হয় আব্দেসলামকে। সে সময় পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে যান আব্দেসলাম। পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় নিয়োজিত সহযোগী পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। এর তিনদিন পর শুক্রবার প্রকাশ্য দিবালোকে অন্য একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আটক করা হয় আব্দেসলামকে।
আব্দেসলামকে জীবিত গ্রেফতার করে অভিযুক্ত করা হয়, তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। কিন্তু এখনও তাদের কোনও হামলার পরিকল্পনা আছে কিনা সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
জিহাদি দর্শনের উর্বরা ভূমি/ গরম বিছানা
সন্ত্রস্ত ও উৎকণ্ঠিত সময় কাটে বেলজিয়ামে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বিতীয় উচ্চতম মাত্রায় পৌঁছে যায় যা প্রকৃতপক্ষেই হামলার আভাস দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে সিএনএন মলেনবিক নামের একটি জেলায় সহিংস জিহাদিদের তৎপরতার খোঁজ পায় ও প্যারিস হামলার পর সেখানে কোনকিছুর পরিবর্তন ঘটেছে কিনা, ঘটে থাকলে তার ধরন কী রকম তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে যায়।
সেখানকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে প্রতিবেদকদের বেশ সময় লাগে, অনেকেই তাদের সেল ফোনে স্বঘোষিত উগ্রপন্থীদের কাছ থেকে হুমকি পান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার বিষয়ে তাদের সতর্ক করা হয়।
বেলজিয়ামের পুলিশ জিহাদিদের ইসলামিক স্টেট অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করতে পারছিল না। এমনও হতে পারে কর্তৃপক্ষ আসলে ভীত ছিল, প্যারিস হামলার ধরনে ইউরোপে আরও হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
প্যারিসসহ অন্যান্য প্রধান নগরী যেমন আমস্টারডাম, ফ্র্যাঙ্কফুট, কলন, বার্লিন ইত্যাদি থেকে ব্রাসেলস বেশি দূরে নয়। একটি গাড়ী নিয়ে অথবা ট্রেন ধরে যে কেউ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইউরোপের প্রধান নগরগুলোর একটি থেকে অন্যটিতে চলে যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্যারিস হামলার পর থেকে কিছু কিছু নগরীতে ইমিগ্রেশন চেক করা হয়ে থাকে।
পূর্ব ইউরোপের যে কোন দেশের চেয়ে বেলজিয়ামে বিদেশী জিহাদির সংখ্যা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১২ সালের পর থেকে প্রায় ৫০০ নারীপুরুষ জিহাদের উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাত্রা করেছেন। আবার একই সময়ে প্রায় শতাধিক বেলজিয়ান সিরিয়া থেকে দেশে ফিরে এসেছেন- তাদের অনেককেই ফেরামাত্র গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ঠিক কত মানুষ জিহাদে গিয়েছেন আর কত মানুষ জিহাদ থেকে ফিরেছেন সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান নেই।
সদস্য সংখ্যা বাড়াচ্ছে ইসলামিক স্টেট
বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যান জামবোন জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তিনি এ-ও স্বীকার করেন এরই মধ্যে আইএস তার সদস্য সংগ্রহের কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সদস্য সংগ্রহ চলছে- খুঁজে পেতে প্রতি ঘরে ঘরে খোঁজ করতে হবে।’ বেলজিয়ান ইমাম শেখ সুলায়মান ভ্যান আয়েল বলেন, ‘আমরা এমন একটি যুগে বাস করি যেখানে কেউ সত্য বললে তার মুখ চেপে ধরার লোকের অভাব হয় না।’
সুলায়মান ভ্যান আয়েল জিহাদি দর্শনের বিরুদ্ধে সরব ও সোচ্চার হওয়ায় তাকে দেহরক্ষীর প্রহরায় গোপনে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমি ভীত নই। আমি সতর্কতা অবলম্বন করছি, কিন্তু লুকিয়ে থাকছি না। আমি বাইরে যাই, হাঁটি, যা হবার তা তো হবেই। মানুষের ভয়ে ভীত হয়ে থাকার অনুভূতিটা মোটেও ভালো নয়। কিন্তু আমি সত্যিকার অর্থে ভীত নই।’
প্রান্তিকতার বোধ
গিরালডাইন হেনেগিনের সন্তান আনিস ২০১৫ সালে সিরিয়ায় নিহত হন, আইএস তাকে সদস্য হিসেবে যুক্ত করে। গিরালডাইনকে আইএসের ত্রাসের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি তিক্ত হেসে বলেন, ‘আমার আর হারানোর কী আছে? তারা তো আমার ছেলেকেই মেরে ফেলেছে? আমাকে এর বেশি কী করবে?’ তিনি ব্যখ্যা করে বলেন, ‘প্রত্যেকটা ইঙ্গিত আলাদা। বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে কিছুই বোঝা যায়না। কিন্তু পুরো চিত্রটি খেয়াল করলে বুঝতে পারা যায় কিভাবে চলছে সদস্য সংগ্রহ।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলী(ছদ্মনাম)তার দুই ভাইয়ের সিরিয়া যাত্রার গল্প শোনান। আলীর দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারায়। আলীর মতে, বেলজিয়ামে বৈষম্য ও সুযোগের অভাবেই প্রচুর তরুণ জিহাদে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তাদের মধ্যে যে প্রান্তিকতার বোধ রয়েছে তাকেই কাজে লাগিয়ে তাদের দলে টেনে নিচ্ছে আইএস।
চোখ বন্ধ রাখছে প্রতিরক্ষা বাহিনী!
আলীর ধারণা, বেলজিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনী সিরিয়াগামী তরুণদের যাত্রা ব্যহত করার বদলে এই বিষয়টি নিয়ে চোখ বন্ধ রেখেছে। কারণ তারা এই তরুণদের কাছ থেকে মুক্তি পেতে চায়। যদিও তিনি স্বীকার করেন তার ভাইয়েরা স্বেচ্ছায় জিহাদে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে আলী এ-ও মনে করেন তাদের এই পথ থেকে ফেরাতে হয়তো আরও কিছু করার ছিলো।
প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতা জানান নিহত আনিসের মা গিরালডাইন হেনেগিনও। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেকে ফেরাতে পুলিশের কাছে গিয়েছি। তাদের নির্দিষ্ট করে জানিয়েছি কবে, কোন ফ্লাইটে সে সিরিয়া যাচ্ছে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। পুলিশ আমাকে বলেছে, আপনার ছেলে তো শিশু নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেখানে খুশী যেতে পারে।’
সে সময় (২০১৪) আনিসের বয়স ছিল ১৮। একই বছর মা গিরালডাইন জানতে পারেন, আনিস সিরিয়ায় মারা গেছে। গিরালডাইন মনে করেন, তার সন্তানকে তো কোন মূল্যেই ফিরিয়ে আনা যাবে না, কিন্তু বেলজিয়ানদের জিহাদ থেকে ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষ আরও চেষ্টা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “কর্তৃপক্ষের মনোভাব অনেকটা এরকম- ‘আচ্ছা, তুমি জিহাদে গিয়েছ, আর ফিরে এসো না।’ যেখানে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে সমাজের মূলধারায় আবারও যুক্ত করতে চেষ্টা করা উচিত সেখানে আজীবন কারাবাসের ভয় দেখিয়ে তাদের বিদেশেই ফেলে রাখা হচ্ছে।’
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যামবোন দাবি করেন, সরকার তরুণদের জিহাদে যোগ দেওয়া ঠেকাতে চেষ্টা করছে। আলীর এক ভাই পরে বেলজিয়ামে ফিরে আসেন, তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আলী জানান, সে সময় পুরো পরিবারকেই অপরাধী হিসেবে দেখা হতে থাকে। আলী বলেন, ‘তারা সিনেমার মত আমাদের সবার দিকে বন্দুক তাক করে রাখতো।কিন্তু কেন এত সহিংসতা! তারা আমাদের বাড়িতে কোন অস্ত্র, বিস্ফোরক কিছুই পায়নি। কিন্তু তারা যখন এসেছে তাদের ভঙ্গিতে মনে হয়েছে আমাদের বাড়িটা যেন অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত।’
ইয়াসিন ববোট নামের এক তরুণও মনে করেন, বেলজিয়ামে মুসলিমরা নিজ দেশের বিরুদ্ধে যাচ্ছে কারণ পুলিশ ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা তাদের উস্কানি দিচ্ছেন। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যামবোন বলেন, ‘এই তরুণরা বেলজিয়ামেই জন্মেছে। এমনকি তাদের পিতামাতাও বেলজিয়ামে জন্মেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে দেখুন দ্বিতীয় প্রজন্ম প্রেসিডেন্ট হচ্ছে, আর আমাদের এখানে চতুর্থ প্রজন্ম হচ্ছে আইএস যোদ্ধা।’ তিনি আরও বলেন, ‘তুমি জন্মেছ এ দেশে, এই দেশে স্কুলে পড়েছ, এখানে তোমার সব বন্ধুরা রয়েছে, তুমি কেন ভিনদেশী বোধ করবে?’ তিনি এমনকি এ-ও মনে করেন, ইসলামেও বলা হয়েছে, কেউ যেখানে জন্মায়, সেটিই তার দেশ। নিজ দেশকে রক্ষা করা মুসলিমের জন্য পবিত্র দায়িত্ব। সূত্র: সিএনএন
/ইউআর/বিএ/








