‘না না আমাকে আগে বলুন– অনুপ্রবেশের সমস্যা কোথায়, এত বিরাট হয়ে গেলো? কোথায়, কোথায়?’
‘আর কে-ই বা ভারতে এসে থাকতে চাইবে? কে, কে?’
‘আমাকে একটা জিনিস বলুন, আমি নিজেই তো সীমান্তবর্তী একটি কেন্দ্রের এমপি। তো (সীমান্তের ওপার থেকে) কে এসে ইন্ডিয়াতে থাকতে চাইবে?
‘আমার কেন্দ্র নদীয়া জেলায়, তার উল্টো দিকেই সীমান্তের অন্য পারে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া। জিডিপি বলুন, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন ইন্ডিকেটর (সূচক) বলুন, কিংবা আরও নানা জিনিস– বাংলাদেশে এগুলো ভারতের চেয়েও আসলে অনেক ভালো!’
‘দয়া করে বরং নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহর মাথা থেকে এই ধারণাটা বের করে দিতে বলুন যে গোটা দুনিয়ার লোক আপনাদের ইন্ডিয়াতে এসে থাকার জন্য হেদিয়ে মরছে!’
বক্তার নাম – মহুয়া মৈত্র।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর আসন থেকে নির্বাচিত, তৃণমূল কংগ্রেসের ডাকাবুকো পার্লামেন্টারিয়ান– যিনি মোদি-শাহ জুটির বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ করে সংসদীয় বিরোধিতাকে প্রায় অন্য একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
সম্প্রতি ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার এ মন্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে।
বিশেষত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যখন কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চলছে এবং বাংলাদেশি সন্দেহে আটক নারী-পুরুষদের ঢালাওভাবে সীমান্তের অন্য পারে ‘পুশ-ইন’ করা হচ্ছে, তখন মহুয়া মৈত্র দাবি করেছেন—বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ আসলে কোনও বাস্তব সমস্যাই নয়। কারণ বাংলাদেশিদের ভারতে আসার কোনও কারণই নেই।
এই ‘ন্যারেটিভ’ অবশ্য একেবারে নতুন কিছু নয়। ২০২০ সাল নাগাদ আইএমএফের পূর্বাভাসেই যখন বলা হয়েছিল—বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা (মাথাপিছু) জিডিপি ভারতকেও টপকে যেতে চলেছে। তখন থেকেই এই মতটা চালু আছে—বাংলাদেশে আয় ও উপার্জনের সুযোগ ভারতের চেয়েও বেশি, তাই বাংলাদেশিরা ভারতে আসার আর কোনও আকর্ষণ অনুভব করেন না।
তা ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা, নারী অধিকার, শিশুমৃত্যুর হার, স্বাস্থ্য পরিষেবাসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্স বহুকাল ধরেই ভারতের চেয়ে ভালো। মহুয়া মৈত্রও তার বক্তব্যে এই ইন্ডিকেটরগুলোর কথাই উল্লেখ করেছেন।
২০১৯ সালের নভেম্বরে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীকে দিল্লির জাতীয় প্রেস ক্লাবে যখন ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘জেনে রাখুন, বাংলাদেশিরা বরং ভূমধ্যসাগর সাঁতরে ইতালি পাড়ি দিতে চাইবে, তবু তারা ভারতে আসতে চাইবে না!’
আসলে তুলনামূলক বিচারে একজন অর্থনৈতিক অভিবাসীর (ইকোনমিক ইমিগ্র্যান্ট) জন্য বাংলাদেশের চেয়েও ভারতের ‘পুল ফ্যাক্টর’ (আকর্ষণের ক্ষমতা) যে কমে গেছে– সেই যুক্তিটাই ছিল তার ওই বক্তব্যের নেপথ্যে।
মহুয়া মৈত্রও তার বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে অনেকটা একই ধরনের যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন, যদিও এর পেছনে অন্য রাজনৈতিক কারণ আছে।
বস্তুত অবৈধ বাংলাদেশিদের দেশ থেকে তাড়ানোর নাম করে ভারতের শাসক দল বিজেপি আসলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরেই আক্রমণ চালাচ্ছে– তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির এই রাজনৈতিক বয়ানটাকেই তাদের রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার করে তুলেছেন। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এটাই যে বিজেপির বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক আক্রমণের অভিমুখ হতে যাচ্ছে, সেটাও গত সপ্তাহে কলকাতায় এক মেগা জনসমাবেশ থেকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
দিল্লির কাছে গুরগাঁওতে ভারতীয় নাগরিক বাঙালি মুসলিমদের অভিযোগ বাংলাদেশি তকমা দিয়ে পুলিশ-প্রশাসন তাদের হেনস্তা করছে
মহুয়া মৈত্র-র বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতও ঠিক এটাই। যার মধ্য দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশিদের কথিত এই অনুপ্রবেশ ভারতের জন্য প্রকৃত কোনও সমস্যাই নয়। আসলে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর নামে হামলা চালানো হচ্ছে বাংলা ও বাঙালিদের বিরুদ্ধে।
তবে এই মন্তব্যের জন্য তাকে যথারীতি ভারতের সোশ্যাল মিডিয়াতে তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে, শিকার হতে হচ্ছে ট্রলিংয়ের।
অনেকেই লিখছেন, ‘ম্যাডাম, বাংলাদেশেই যখন সব ভালো, আপনি বরং ওদেশেই চলে যান। ওরা আপনাকে এমপি বানায় কিনা দেখুন!’ কেউ বা পরামর্শ দিয়েছেন, ‘রাজনীতি করছেন করুন, কিন্তু তাই বলে নিজের দেশের সঙ্গে তঞ্চকতা অন্তত বন্ধ করুন!’








