রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটির তদন্ত বন্ধে পাঁচ আন্তর্জাতিক সংস্থার আহ্বান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৩ আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৮:২১

আটক সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চলমান তদন্ত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার বিষয়ক পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্বরের ঘটনা সম্প্রচার সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই তদন্ত চলছে। যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সাংবাদিকরা যেন তাদের পেশাগত প্রতিবেদনের জন্য কোনও ফৌজদারি অপরাধ, বিশেষ করে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো মামলার মুখোমুখি না হন। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংস্থাগুলো হলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, সিভিকাস: ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটির তদন্ত বন্ধে পাঁচ আন্তর্জাতিক সংস্থার আহ্বান

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রসিকিউটররা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে ইসলামপন্থি সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অভিযানের সংবাদ সম্প্রচার নিয়ে এই তদন্ত করা হচ্ছে, যেখানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে আইসিটি রূপা ও বাবুকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখায়। এই বিবৃতি দেওয়ার সময় পর্যন্ত তাদের আইনজীবীরা কোনও তথ্য-প্রমাণ বা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) পাননি। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগগুলো ২০১৩ সালের ওই ঘটনার সম্প্রচার সংক্রান্ত, যার মধ্যে রূপার উপস্থাপিত একটি সমসাময়িক বিষয়ের অনুষ্ঠানও রয়েছে; যা হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে’ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের একটি মৌলিক দিক হলো সাংবাদিকতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যার মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। বিতর্কিত কোনও রাজনৈতিক ঘটনা কীভাবে সম্প্রচার করা হবে, সেই সিদ্ধান্তকে কখনোই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না; মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিচার করা তো দূরের কথা। এমন আচরণকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা আইনিভাবে ভুল। আইনি ভিত্তি ছাড়া এমন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে।

সংগঠনগুলো বলেছে, ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর পাশাপাশি রূপার স্বামী ও একাত্তর টিভির সাংবাদিক শাকিল আহমেদ এবং ভোরের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক শ্যামল দত্ত ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর থেকে প্রি-ট্রায়াল বন্দি হিসেবে আটক রয়েছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা অসংখ্য হত্যা মামলায় তাদের আটক রাখা হয়েছে। তবে এসব মামলার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত প্রতিবেদন কীভাবে হত্যার অপরাধ হতে পারে, তার কোনও ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। সাবেক সরকারের সমর্থক সন্দেহে হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে যেসব হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, এটিও তারই অংশ এবং এগুলোর বেশির ভাগের কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

বিবৃতিতে সংস্থাগুলো বলেছে, ২০২৬ সালের ১১ মে বাংলাদেশের হাইকোর্ট রূপা ও শাকিল আহমেদকে অধিকাংশ মামলায় জামিন দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পরবর্তীতে সেই আদেশ স্থগিত করে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এই নতুন প্রক্রিয়াটি এমন একটি আদালত ব্যবস্থায় তাদের আটকে রাখার আলাদা পথ তৈরি করেছে, যেখানে জামিন পাওয়া বিরল। এর ফলে হত্যা মামলাগুলোতে জামিন পেলেও রূপা ও বাবুর বন্দিদশা দীর্ঘায়িত হবে।

সংস্থাগুলো মনে করে, আইসিটিতে রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) অনুচ্ছেদ ১৫ এবং ১৯-এর অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার পরিপন্থি, যেখানে বাংলাদেশ নিজেও একটি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে যেন, তদন্ত যেভাবেই চলুক না কেন, প্রসিকিউশন যেন কেবল সাংবাদিকতার কারণে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে আনুষ্ঠানিক আসামি না করে, তা নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো খতিয়ে দেখতে এবং এগুলো কেবল বৈধ সাংবাদিকতার কারণে করা হয়েছে কিনা তা মূল্যায়নের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ব্যবস্থা গঠনে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু এবং শ্যামল দত্তকে অবিলম্বে সেসব মামলা থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে, যেখানে তারা কেবল শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মানবাধিকার চর্চা এবং প্রতিবেদনের জন্য আটক রয়েছেন। পাশাপাশি সাংবাদিকতার জন্য তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং সারা দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা ও গণ-এফআইআর দায়েরের সংস্কৃতি বন্ধের জোর দাবি জানানো হয়। সেই সঙ্গে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ দেশের প্রত্যেকের মানবাধিকার নিশ্চিত ও বজায় রাখার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাগুলো।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হলে তা সাংবাদিকদের নিপীড়ন বন্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারকে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অবিলম্বে মামলাগুলোর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
মঙ্গলের ‘চাঁদ’ থেকে গুঁড়ো পাথর আনতে জাপানের ঐতিহাসিক অভিযান
সর্বশেষ খবর
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে এক নোটিশে ছাঁটাই ৭৩৯ শ্রমিক-কর্মচারী
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির