প্রায় তিন দশক পর এমন সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হলো যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ। লাখো মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন বিরল এই মহাজাগতিক দৃশ্য। যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ এলাকায় সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি ঢেকে যায় চাঁদের আড়ালে। আর গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু এলাকায় দেখা যায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
বুধবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় শুরু হওয়া এই সূর্যগ্রহণ যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন দেশটির অধিকাংশ এলাকায় সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢেকে যায়। কর্নওয়ালে সূর্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত চাঁদের আড়ালে চলে যায়।
আকাশ পরিষ্কার থাকায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে গ্রহণটি দেখতে পান। স্কটল্যান্ড, উত্তর ইংল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিছু এলাকায় আকাশ মেঘলা থাকলেও বিখ্যাত বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
এডিনবরার ক্যালটন হিলেও বড় জমায়েত হয়। অনেকেই বিশেষ সুরক্ষাচশমা পরে সূর্যগ্রহণ দেখেন। তবে গ্রহণের আগে বাজারে এসব চশমার সংকট দেখা দিয়েছিল। ফলে কেউ কেউ ছিদ্রযুক্ত কাগজ, সিরিয়ালের বাক্স কিংবা রান্নাঘরের ঝাঁঝরি ব্যবহার করে নিরাপদে গ্রহণ দেখার চেষ্টা করেন।
স্পেনের আকাশে নেমেছিল পুরো অন্ধকার
যুক্তরাজ্যে দেখা গেছে আংশিক সূর্যগ্রহণ। কিন্তু স্পেনের কিছু এলাকায় দৃশ্যটি ছিল আরও নাটকীয়।
স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় সরলরেখায় চলে আসায় সেখানে দেখা যায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো ম্লান হয়ে আকাশে নেমে আসে রাতের মতো অন্ধকার।
স্পেনের আরিজা এলাকায় ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যকে ঢেকে ফেলছে। শেষ পর্যন্ত সূর্যের উজ্জ্বল চাকতিটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে শুধু বাইরের আবহমণ্ডল বা করোনা দৃশ্যমান হয়।
চিলির বিজ্ঞানী ইয়াসমিন ক্যাট্রিচিও এই দৃশ্য দেখতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আ কোরুনিয়ায় যান। পূর্ণগ্রহণের মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সবাই আনন্দে চিৎকার করছিলেন। মহাবিশ্বের এই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
কেন হয় সূর্যগ্রহণ?
চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি আটকে দেয়, তখন সূর্যগ্রহণ ঘটে। চাঁদের ছায়া তখন পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অংশের ওপর পড়ে।
চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেললে সেটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। আর চাঁদের অবস্থানের কারণে সূর্যের কিছু অংশ দৃশ্যমান থাকলে সেটি আংশিক সূর্যগ্রহণ।
এই গ্রহণে যুক্তরাজ্যের বেশিরভাগ জায়গা থেকে সূর্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ঢাকা পড়লেও সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি একই সরলরেখায় না থাকায় সেখানে পূর্ণগ্রহণ দেখা যায়নি।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ এত বিরল কেন?
পৃথিবীর কোথাও না কোথাও গড়ে প্রতি ১৮ মাসে একবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। কিন্তু একই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এমন দৃশ্য দেখা অত্যন্ত বিরল। কোনো একটি এলাকায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ফিরে আসতে গড়ে প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
পূর্ণগ্রহণের সময় চাঁদের আড়াল থেকে সূর্যের করোনা দেখা যায়। এটি সূর্যের বাইরের অত্যন্ত উত্তপ্ত বায়ুমণ্ডল, যেখানে মহাকাশের দিকে ছুটে যাওয়া উত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহ দেখা যায়। কখনও সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে বেরিয়ে থাকা গোলাপি আভাযুক্ত গ্যাসের লুপ বা প্রমিনেন্সও দেখা যায়।
এবার স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় সেই বিরল দৃশ্যই দেখেছেন হাজারো মানুষ।
মহাবিশ্বের এক আশ্চর্য ‘কাকতাল’
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সম্ভব হওয়ার পেছনে রয়েছে একটি আশ্চর্য মহাজাগতিক সমাপতন।
পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। সূর্য পৃথিবী থেকে চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ দূরে। আবার সূর্যের ব্যাস চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড়।
এই দুই অনুপাতের কারণে পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। ফলে নির্দিষ্ট অবস্থানে চাঁদ যখন সূর্যের সামনে আসে, তখন সেটি সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে পারে।
চাঁদ সামান্য ছোট হলে কিংবা পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব কিছুটা বেশি হলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগই থাকত না।
সামনে আরও তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ
২০২৬ থেকে ২০২৮ সালকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য একটি ‘সোনালি সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই তিন বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিনটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ থাকবে।
তবে যুক্তরাজ্যের মানুষ এসব পূর্ণগ্রহণ দেখতে পারবেন না। ২০২৭ সালে দেশটির কিছু অঞ্চল থেকে সূর্যের সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢাকা পড়া একটি আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যেতে পারে। আর যুক্তরাজ্যে এবারের চেয়ে বেশি সূর্য ঢাকা পড়া গ্রহণ দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দশক।
২০৮১ সালে দেশটির কিছু এলাকায় সূর্যের প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত ঢেকে যেতে পারে। আর যুক্তরাজ্য থেকে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২০৯০ সালে।
অর্থাৎ এবারের দৃশ্যটি শেষ হয়ে গেলেও যুক্তরাজ্যের আকাশে এমন আরেকটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে অনেক প্রজন্মকেই অপেক্ষা করতে হবে।









