নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শত শত শ্রমিককে উদ্ধারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলো রাতভর বিভিন্ন সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ পরিষ্কারের চেষ্টা চালিয়েছে।
গত বুধবার নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে। এতে নেপালের বিভিন্ন শহর ও গ্রাম ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলও দুর্যোগের কবলে পড়ে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রবিববার রাত পর্যন্ত নেপালে ৭৮৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন। নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯০০-এর বেশি মানুষ রয়েছেন। চীনের গিরং কাউন্টিতে আরও ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং সেখানে ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
সুড়ঙ্গে আটকা শ্রমিকদের উদ্ধারে তৎপরতা
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের একটি অংশ কাদা ও পাথরে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় অর্ধডজন সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছেন।
উদ্ধারকারীদের মূল লক্ষ্য এখন এসব সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুলে দেওয়া। তবে বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিস্ফোরক ব্যবহার করে পথ তৈরির সুযোগও নেই বলে জানিয়েছেন উদ্ধারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নেপালের সেনাবাহিনীসহ প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধার অভিযানে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরাও কাজ করছেন।
চীন-ভারতের বিশেষজ্ঞ সহায়তা
সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধারে চীন ও ভারত বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। নেপাল সাধারণ উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানালেও সুড়ঙ্গ উদ্ধারের মতো বিশেষায়িত কাজে দুই প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতা নিচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে পৌঁছে সেখানে জমে থাকা মাটি ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছেন। প্রবেশপথ নিরাপদ করা সম্ভব হলে অক্সিজেন সরবরাহের সরঞ্জাম ও ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করবে। এতে সেখানে কেউ জীবিত অবস্থায় আছেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
খারাপ আবহাওয়ায় ব্যাহত উদ্ধারকাজ
প্রবল বৃষ্টি ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় গত কয়েক দিন উদ্ধার অভিযান একাধিকবার স্থগিত করতে হয়েছে। নেপাল ও চীন সীমান্তে দুর্যোগের কারণে একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়েছে। সেটি উপচে পড়ায় নেপালের নদীগুলোতে নতুন করে পানির প্রবাহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সোমবার আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় উদ্ধারকাজের গতি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় প্রভাব
বন্যায় নেপালের বেশ কয়েকটি নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আগের রয়টার্স প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
চীন জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা ২৬১। দেশটি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে এবং জরুরি সহায়তায় অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দিয়েছে।
হিমবাহ ধসকে দায়ী করছে চীন
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতার কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফস্তরের পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এদিকে নেপালের দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের শুরুতে দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে বৈঠক হলেও হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর নিয়ে চীনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে দুর্যোগের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে উদ্ধারকারী দলগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার করা।
সূত্র: রয়টার্স









