মহাকাশের যে শব্দের রহস্য আজও অজানা, এটি কি মহাজাগতিক ঘটনা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪

ভাবুন, আপনি মহাকাশে ভেসে আছেন।

চারদিকে শুধু অন্ধকার। অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলছে দূরে। নেই কোনও বাতাস, নেই কোনও কোলাহল। পৃথিবীর মতো সেখানে পাখির ডাক নেই, গাড়ির শব্দ নেই, মানুষের কথাও নেই। মনে হতে পারে, মহাকাশ বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ জায়গা।

কিন্তু সত্যিই কি মহাকাশ এতটা নিঝুম?

উত্তরটা শুনলে হয়তো অবাক হবেন, মহাকাশে সরাসরি মানুষের কানে কোনও শব্দ শোনা যায় না ঠিকই, কিন্তু সেখানে একেবারে নীরবতা নেই। মহাজাগতিক বস্তুগুলো থেকে প্রতিনিয়ত ছুটে আসছে রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে ও প্লাজমার নানা কম্পন। বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপ ও মহাকাশযানের সাহায্যে সেই সংকেতগুলো ধরে ফেলেছেন।

এরপর ঘটেছে আরও চমকপ্রদ এক ঘটনা। মানুষের কানে শোনার মতো করে সেই সংকেতগুলোকে বদলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার নাম ‘সনিফিকেশন’।

আর তখনই যেন মহাবিশ্বের নীরবতার পর্দা একটু সরে গেলো। শোনা গেলো অদ্ভুত সব আওয়াজ; কোথাও গভীর গর্জন, কোথাও তীক্ষ্ণ শিস, কোথাও আবার পাখির কিচিরমিচিরের মতো সুর।

তবে শুরু করা যাক সবচেয়ে রহস্যময় একটি সংকেত দিয়ে।

১৯৭৭ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘বিগ ইয়ার’ রেডিও টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে আছে। হঠাৎ সেটি ধরে ফেললো অস্বাভাবিক শক্তিশালী একটি বেতার সংকেত।

সংকেতটি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৭২ সেকেন্ড।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরি এহম্যান কম্পিউটারের প্রিন্টআউট হাতে নিয়ে সংকেতটির তীব্রতা দেখলেন। বিস্ময়ে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল এক শব্দ, ‘ওয়াউ!’

প্রিন্টআউটের পাশে লাল কালি দিয়ে তিনি লিখে দিলেন সেই শব্দটিই।

এরপর থেকে সংকেতটির নাম হয়ে গেলো ‘ওয়াও! সিগন্যাল’।

ধনুর্বিন্যাস বা স্যাজিটেরিয়াস নক্ষত্রমণ্ডলের দিক থেকে আসা সেই সংকেত আর কখনও ধরা পড়েনি। কোথা থেকে এসেছিল সেটি? কোনও প্রাকৃতিক মহাজাগতিক ঘটনা? নাকি অন্য কোনও উৎস?

আজও নিশ্চিত উত্তর নেই।

মহাকাশের রহস্য এখানেই শেষ নয়।

কখনও কখনও কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকেও পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে অতি শক্তিশালী রেডিও তরঙ্গের ক্ষণিক ঝলক। এগুলোর নাম ‘ফাস্ট রেডিও বার্স্ট’ বা এফআরবি। কোনও কোনও এফআরবি স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ড। আবার কিছু সংকেত নির্দিষ্ট বিরতিতে বারবার ফিরে আসে।

বিজ্ঞানীরা জানেন, এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী সংকেত। কিন্তু এর উৎস নিয়ে এখন গবেষণা চলছে। ব্ল্যাকহোল, ম্যাগনেটারের মতো মহাজাগতিক বস্তু, নাকি অন্য কোনও অজানা উৎস? উত্তর পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

তারপর আসে আরও অদ্ভুত একটি শব্দ।

ভাবুন, মহাকাশের অন্ধকারে কোথাও থেকে ভেসে আসছে গভীর গর্জন। যেন কোনও অদৃশ্য দৈত্য ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে।

এটি কোনও সিনেমার শব্দ নয়।

পার্সিয়াস গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কেন্দ্রে থাকা একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের চারপাশের উত্তপ্ত গ্যাসে তৈরি হওয়া শব্দতরঙ্গের তথ্যকে শব্দে রূপ দিয়েছে নাসা। তবে সেই কম্পন মানুষের কানে শোনার মতো ছিল না। তাই বিজ্ঞানীরা এর ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে মানুষের শ্রবণসীমায় নিয়ে আসেন।

ফলাফল: একটি গভীর, গা ছমছমে গর্জন।

তবে মহাকাশের সব শব্দ যে ভয়ংকর, তা নয়।

পৃথিবীর চারপাশেও তৈরি হয় এক ধরনের অদ্ভুত সুর। সৌরঝড়ের প্লাজমা কণা যখন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে আঘাত করে, তখন তৈরি হয় ‘করাস ওয়েভস’। বিজ্ঞানীরা সেই সংকেতকে শব্দে রূপান্তর করেছেন।

শুনলে মনে হয়, যেন দূরে কোথাও অসংখ্য পাখি একসঙ্গে ডাকছে। আবার তার মধ্যে মিশে আছে তিমির গানের মতো এক ধরনের সুর।

অর্থাৎ, আমাদের পৃথিবীর চারপাশের মহাকাশও যেন নিজের মতো করে গান গাইছে।

আর সবচেয়ে দূরের গল্পটি আসে ভয়েজার-১ থেকে।

২০১২ সালে নাসার এই মহাকাশযান সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে, নক্ষত্রগুলোর মাঝের বিশাল ফাঁকা অঞ্চলে।

সেখানে ভয়েজার-১ এর যন্ত্রে ধরা পড়ে প্লাজমার একটি অদ্ভুত কম্পন।

বিজ্ঞানীরা যখন সেই তথ্যকে মানুষের শোনার উপযোগী করে তুললেন, তখন ভেসে উঠলো একটানা তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ।

কোথাও কোনও বাতাস নেই। কোনও মানুষ নেই। কোনও শব্দযন্ত্রও নেই।

তবু কোটি কোটি কিলোমিটার দূর থেকে মহাকাশযানটি যেন আমাদের জন্য একটি বার্তা নিয়ে এলো, মহাকাশ যতটা নিঃশব্দ বলে আমরা ভাবি, আসলে তার ভেতরেও ঘটে চলেছে অসংখ্য ঘটনা।

হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় এটাই।

মহাকাশ হয়তো নীরব।

কিন্তু সেই নীরবতারও যেন নিজস্ব একটি ভাষা আছে।

/এএ/
সম্পর্কিত
ফেসবুক-ইউটিউব থেকে দ্রুত আয়ের কার্যকর উপায়, আপনিও পারবেন
ফের বাড়লো তেলের দাম
ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে ২৪.৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি ঘোষণা পেন্টাগনের
সর্বশেষ খবর
বৃষ্টিতে ভিজলো ছুটির দিনের সকাল
বৃষ্টিতে ভিজলো ছুটির দিনের সকাল
রোগাক্রান্ত গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগ, দুই কসাইয়ের কারাদণ্ড
রোগাক্রান্ত গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগ, দুই কসাইয়ের কারাদণ্ড
ফেসবুক-ইউটিউব থেকে দ্রুত আয়ের কার্যকর উপায়, আপনিও পারবেন
ফেসবুক-ইউটিউব থেকে দ্রুত আয়ের কার্যকর উপায়, আপনিও পারবেন
ডরসেটের উপকূলে পথে পথে ইতিহাসের বিস্ময়
ডরসেটের উপকূলে পথে পথে ইতিহাসের বিস্ময়
সর্বাধিক পঠিত
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
বিএনপির রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির
বিএনপির রাজনীতিতে যেভাবে উত্থান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির
এমপিকে পদত্যাগের নির্দেশের প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন আসিফ মাহমুদ
এমপিকে পদত্যাগের নির্দেশের প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন আসিফ মাহমুদ