সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বহু দেশে বড় আকারের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এর কয়েকটি এখনও চলছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্স থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত এসব বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে প্রায় সব দেশেই দেখা যাওয়া কিছু অভিন্ন সমস্যা, যেমন আবাসন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি সেবায় বরাদ্দ ও সরকারবিরোধী মনোভাবজনিত অর্থনৈতিক চাপ।
এই মুহূর্তে ফ্রান্স ও আলবেনিয়া সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একের পর এক বিক্ষোভের ঢেউয়ে দেশ দুটিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্সে সরকারি নীতিসংক্রান্ত দুটি কারণে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একটি হলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জিনিসপত্রের উচ্চ মূল্য নিয়ে ক্ষোভ, অন্যটি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কাটছাঁটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বড় আন্দোলন। আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আর নির্বাচনে লড়তে পারবেন না, ফলে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার শাসনের ইতি ঘটবে।
গত মাসে প্যারিসে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি ছোট ও স্থানীয় আন্দোলন হিসেবে ফ্রান্সের শিক্ষার্থী সংকটের সূচনা হয়। পরে তা বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই সহিংস সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে এবং বহু এলাকায় ক্লাস ব্যাহত হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ ফ্রান্স ২৪-কে জানান, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিবাদে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, যাদের মধ্যে শুধু প্যারিসেই রাস্তায় নেমেছেন ১ লাখ ১০ হাজার।
বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয় কমানোর মধ্যে পরিবারের খরচ বাড়ায় বিক্ষোভ শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বাড়তি ফি দিতে চান না। এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়। গতকাল ব্রাসেলস ও লিয়েজে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, ফলে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়। বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্তিন একে সমাজকে অস্থিতিশীল করতে সংগঠিত ও পুনরাবৃত্ত নিছক সহিংসতা বলে অভিহিত করেন এবং বিক্ষোভকারীদের দাঙ্গাকারী আখ্যা দেন।
পর্তুগালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্বল্প মজুরি ও সাশ্রয়ী আবাসন পেতে অসুবিধার প্রতিবাদে লিসবনে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছেন। লিসবন ও আরও অনেক শহরে ২০১৭ সালের পর থেকে সম্পত্তির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, আর নতুন ইজারায় ভাড়াও প্রায় একই হারে বেড়েছে। এতে তরুণ কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো চাপে পড়েছে। অনেকের মতে, সমস্যা শুধু বাড়ি কিনতে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ভাড়া বাসায় থাকাও ক্রমেই সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ফরাসি বিক্ষোভকারীদের মতো নয়, পর্তুগালের মিছিলগুলো মজুরি, আবাসন ও পরিবারের সাশ্রয়ী জীবনযাপনের মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইতালিতেও ইউরোপের অন্য অংশের মতো একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেকে প্রতিবাদ করছেন। মজুরি স্থবির থাকা, মূল্যস্ফীতি ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে অসুবিধার প্রতিবাদে মিলানে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে ফ্রান্সের ঘটনাগুলোর তুলনায় ইতালির বিক্ষোভ ছিল ছোট।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খারাপ অবস্থা, উচ্চ শিক্ষা ব্যয়, আর্থিক সহায়তার অভাব এবং স্নাতকের পর কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা নিয়ে আলবেনিয়ার শিক্ষার্থীরাও সরকারের সমালোচনার মুখে ফেলেছেন। ১৩ অক্টোবর তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ভবনটির দিকে ইট ও কংক্রিট ছোড়েন, যার জবাবে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেয়। শিগগিরই তাদের দাবির পরিধি বেড়ে অসমতা, বেকারত্ব এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। স্নাতকের পর অর্থনীতি কাজ দিতে পারবে কি না, এ নিয়ে উদ্বিগ্ন একটি প্রজন্মের চাপে সরকার পড়েছে।
ভারতে বিরোধী দলগুলো এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট নবগঠিত ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী কক্রোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ভোটার তালিকা সংশোধনের স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কার্যক্রমে কথিত অনিয়মের অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চালাচ্ছে। বিদেশে শিক্ষিত জনসংযোগ স্নাতকের নেতৃত্বাধীন সিজেপির নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন প্রকাশ্যে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীসহ দলটির নেতাদের সমর্থন করেছেন। এই গোষ্ঠী মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদেও বিক্ষোভ করেছিল, যার জেরে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়। এসআইআর নিয়ে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতাকারী নো কিংস নেটওয়ার্কের আয়োজনে দেশজুড়ে বিভিন্ন শহর ও জনপদে সমাবেশ হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে মানুষকে আগাম ভোট দিতে বের করে আনাই ছিল এর লক্ষ্য। আয়োজকেরা এসব কর্মসূচিকে দলনিরপেক্ষ বলে প্রচার করলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে ক্ষুব্ধ মানুষের প্রায় দুই বছরের নো কিংস মিছিল ও বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এগুলো আয়োজন করা হয়েছে।
এ সপ্তাহের শুরুতে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। বাজেট কর্তনকারী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যয়ের প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ হয়। পার্লামেন্টের বাইরে হাজারও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মী, ট্রেড ইউনিয়নপন্থি এবং বিরোধী কর্মীর প্রধান বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে ভিড় থেকে বেরিয়ে আসা মুখঢাকা কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছোড়েন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে মিলেই ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা অর্থায়ন সংকট নিয়ে এটি ছিল পঞ্চম বিক্ষোভ। ২০২৫ সালের একটি আইন মেনে সরকারকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ করতে বাধ্য করার একাধিক আদালতের আদেশের পর এ বিক্ষোভ হলো।
তুরস্কে গত মাসে টানা মূল্যস্ফীতির মধ্যে জীবনযাত্রার তীব্র ব্যয়চাপ ও অপর্যাপ্ত পেনশন নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করেছে। মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সাংবিধানিক অধিকার ও পরিবারের মৌলিক খরচ মেটানোর দাবিতে পেনশনভোগীরা আঙ্কারায় সাংবিধানিক আদালতের বাইরে জড়ো হন। বিক্ষোভের সময় ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আলী সেকেরোগলু তুর্কি পতাকা গায়ে জড়িয়ে এবং ‘টাকার জন্য নয়, আমাদের সম্মানের জন্য’ লেখা একটি প্লাকার্ড হাতে নিয়ে নিজের আর্থিক কষ্ট ও দুই বেকার ছেলের কথা বলার পর অস্ত্র দিয়ে নিজেকে গুলি করেন।
সূত্র: এনডিটিভি
ফের রণক্ষেত্র ফ্রান্স, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
ভবনে আগুন-লুটপাট-সংঘর্ষে রণক্ষেত্র ফ্রান্স: গ্রেফতার ১২০০-এর বেশি
শান্তি ভঙ্গ না করার মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেলেন ককরোচ প্রধান দিপকে