যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ঐতিহাসিক ‘নীল সুনামি’ বা বিপুল বিজয় বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলতে পারে। ওয়াশিংটনে ক্ষমতার এই পটপরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহযোগী, কৌশলগত মিত্র এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ভূরাজনীতিতে নতুন প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
ইরান ও ইসরায়েল পরিস্থিতি
আট মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভোটারদের ক্লান্তি স্পষ্ট। উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে শান্তি চুক্তির দিকে বেশি ঝুঁকলেন কি না, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে দুবাইভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টার-এর এবতেসাম আল-কেতবি সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান যদি বোঝে যে ট্রাম্পের চুক্তি প্রয়োজন, তবে যুদ্ধ শেষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই ফলকে দুর্বলতা মনে করলে তা নতুন করে সামরিক সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র বিক্রির ওপর এখন মার্কিন কংগ্রেসের কড়া নজরদারি থাকবে। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ইসরায়েলি নির্বাচনে অনির্ধারিত ফলাফলের পর দেশটির বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা দ্বিপক্ষীয় আমেরিকান সমর্থন হারানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করছেন।
জ্বালানি তেলের বাজার
ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছিল। তবে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত সমাধানের দিকে হাঁটবেন, এমন ধারণায় বুধবারেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতির দিকে দেখা গেছে। স্যাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বলেন, বাজার ধারণা করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পেছনে ফেলে আসতে চাইবেন।
ইউক্রেন নীতি
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় এখন ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তা প্যাকেজ প্রস্তাব করা সহজ হবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তবে আসছে শীতে ইউক্রেনের শহরের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় মার্কিন প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি দ্রুত পূরণ সম্ভব হবে না। এ ছাড়া রুশ ডিজেল বিশ্ববাজারে ফিরিয়ে আনার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইন আনার উদ্যোগ নিচ্ছেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস। কিন্তু ত্রিপাক্ষিক শান্তি আলোচনায় ওয়াশিংটনের নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে মনে করছে ক্রেমলিন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফল এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক থেকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। ভারতের সাবেক বাণিজ্য সচিব অনুপ ওয়াধাওয়ান বলেন, নির্বাচনে হারের পর ট্রাম্পের ইচ্ছেমতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নিশ্চিতভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটা পর্যায়ে তার কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে, যা তাকে দুর্বল করেছে।
তবে এশীয় অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ক্ষেত্রে এটি একটি সুবিধা এনে দিলেও চীন-মার্কিন সম্পর্ক একটি ‘ভঙ্গুর স্থিতিশীলতায়’ থাকবে বলে মন্তব্য করেন ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-এর বিশ্লেষক চিম লি।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)
নির্বাচনে মার্কিন ভোটাররা আগ্রাসী এআই ডেটা সেন্টারের বিস্তৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। লংবো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট-এর সিইও জেক ডলারহাইড বলেন, ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য প্রযুক্তি খাতের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে এআই খাতের লাগামহীন প্রবৃদ্ধি ধীর করে দিতে পারে।
এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। বুধবারে টিএসএমসি, স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, এসকে হাইনিক্স ও কিওক্সিয়ার মতো এশিয়ান চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমেছে।
সূত্র: রয়টার্স
‘নীল সুনামিতে’ ট্রাম্প ও ইসরায়েলের শঙ্কা দেখছে ইসরায়েলি মিডিয়া
রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব, স্বীকার করলেন ট্রাম্প