পাকিস্তানের বিখ্যাত আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী আসমা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে পাকিস্তানজুড়ে শোকের হাওয়া বইছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি, রাজনীতিক নেতা, আইনজীবী, সংস্কৃতি ও মানবাধিকার কর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শোক জানাচ্ছেন অনেকে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। বেশ কয়েক বছর ধরেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। হঠাৎ করেই বেশি অসুস্থ বোধ করার পর শনিবার রাতে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আসমা জাহাঙ্গীর আইনজীবী হিসেবে বেশ কয়েকজন অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে লড়াই করেছেন। তিনি কারাগারে বন্দি থাকা সংখ্যালঘু, নারী ও শিশুদের পক্ষে মামলা লড়েছেন।
আসমা জাহাঙ্গীর ১৯৯৫ সালে সিতারা-ই-ইমতিয়াজসহ বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করায় ১৯৯২ সালে তাকে আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পুরস্কার দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯৯৫ সালে তিনিক মার্টিন এনালস পদক ও রামন ম্যাগসাইসাই পদকেও ভূষিত হন।
পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি মিয়া সাকিব নিসার দেশটির মানবাধিকার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা আসমা জাহাঙ্গীরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি আসমা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন।
বেলুচিস্তানের জাতীয় পার্টির নেতা আখতার মঙ্গল তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে টুইট করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার জানা সবচেয়ে সাহসী নারীদের একজনের এমন মৃত্যুতে শোক জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আসমা জাহাঙ্গীর অনেক মানুষের অনুপ্রেরণা ছিলেন। কিন্তু বেলুচিস্তানিরা তার শক্তি ও সাহসকে ভালবাসে। তিনি সবক্ষেত্রে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে, আমাদের পক্ষে লড়াই করেছেন। তার মৃত্যু আমাদের অনেককে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেল।’
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তান মানবাধিকারের একজন বলিষ্ঠ রক্ষক ও গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থককে হারাল।
পাকিস্তানের জিও নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীর বলেন, তিনি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না আসমা জাহাঙ্গীর আর বেঁচে নেই।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর মেয়ে বাকতাওয়ার ভুট্টো জারদারি বলেন, আসমা জাহাঙ্গীরের মৃত্যু পাকিস্তানের জন্য বিশাল ক্ষতি।
টুইটারের এক পোস্টে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ এর নেতা মরিয়ম নওয়াজ তার মৃত্যুকে ‘সবার জন্য ক্ষতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন তাদের একজন মহান সেনানীকে হারালো। এটা সবার জন্যই ক্ষতি। এটা কঠিন শোকের দিন।’
১৯৫২ সালে জন্ম নেওয়া আসমা জাহাঙ্গীর লাহোরের বেড়ে ওঠেন। তিনি কিনার্ড থেকে বিএ পাস করার আগে তিনি কনভেন্ট অব জিসাস অ্যান্ড মেরি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে ১৯৭৮ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। আসমা জাহাঙ্গীর ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। এরপর থেকে ১৯৯৩ সালে কমিশনের চেয়ারপার্সন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের হয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিচারিক সংস্কারের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন আসমা জাহাঙ্গীর। জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। পাকিস্তানের উইমেন অ্যাকশন ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন ৬৬ বছর বয়সী এই মানবাধিকারকর্মী। বিভিন্ন সময় শাসক শ্রেণির বিরোধিতা করায় তাকে বেশ কয়েকবার গৃহবন্দি করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা চালানোর সমালোচনা করে জেল খেটেছেন আসমা জাহাঙ্গীরের বাবা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই অসামান্য ভূমিকার কারণে ২০১৩ সালে তাকে মৈত্রী সম্মাননা দেওয়া হয়। বাবার পক্ষ থেকে সেই পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি। সূত্র: দ্য নিউজ।







