পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট আসিয়া বিবি নামের খ্রিস্টান নারীকে ধর্ম অবমাননার মামলায় খালাস দেওয়ার পর থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো দেশটিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে ইসলামপন্থী দল তেহরিক-ই-লাব্বাইক (টিএলপি)। সংগঠনের কর্মীরা রাস্তা তো অবরোধ করে রেখেছেই, সেই সঙ্গে তাদের নেতা আরও বেশি করে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটানোর আহ্বান জানাচ্ছে। জঙ্গি হামলার দায়ে চিহ্নিত জঙ্গি হাফিজ সাঈদ আগামীকাল শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, টিএলপির এক নেতা সংশ্লিষ্ট বিচারকদের হত্যার জন্য নিরাপত্তারক্ষী, গাড়ি চালক ও বাবুর্চিদের উসকানি দিচ্ছে। সেখানেই শেষ নয়; ইমরান খানের সরকারকে উৎখাত ও সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়াকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হচ্ছে।
৪৭ বছর বয়সী শ্রমিক আসিয়া বিবি তিন সন্তানের জননী। ২০০৯ সালে এক গরমের দিনে খামারে কাজ করার সময় মুসলমান শ্রমিকদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পানি খাওয়ায় তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তার মুসলমান সহকর্মীরা। তারা দাবি করে, আসিয়া যেহেতু মুসলমান নন,সেহেতু গ্লাসটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে গেছে, সেটি ব্যবহার করা যাবে না। তারা আসিয়াকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাপ দেয়। আসিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে মুসলমান সহকর্মীদের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে মুসলমান শ্রমিকরা দাবি করে, আসিয়া বিবি ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। আসিয়া বিবি বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হওয়ার কথা স্বীকার করলেও তার দাবি, তিনি ধর্ম অবমাননাকর কিছু বলেননি।
দেশটির প্রথম নারী হিসেবে ২০১০ সালে পাকিস্তানের ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত আইনে আসিয়া বিবিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়। এমনকি পাকিস্তানেও তার পক্ষে দাঁড়ান অনেকে। তবে এদের মধ্যে অন্তত দুইজনকে তাদের অবস্থানের কারণে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। আসিয়া বিবির পক্ষে কথা বলায় পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে তারই দেহরক্ষী হত্যা করে। আর সেই দেহরক্ষীকে পাকিস্তানে বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে তেহরিক-ই-লাব্বাইক। গত ৩১ অক্টোবর আসিয়া বিবির মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট।
রায়ের পরপর বিক্ষোভ শুরু করে টিএলপি। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো তা চলছে। করাচি ও লাহোরেরর গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো রাস্তা তারা অবরোধ করে রেখেছে। বেসরকারি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামাবাদেও একই অবস্থা। করাচিতে দেখা গেছে, ২০০ জন প্রতিবাদকারী তাঁবু টাঙিয়ে রাস্তার অবরোধ করে বসে রয়েছে। সেখানে তারা বিভিন্ন ভাষণের রেকর্ড বাজাচ্ছে। বাজতে থাকা এমন একটি ভাষণে টিএলপির নেতাকে বলতে শোনা গেছে, পুলিশ যদি টায়ারে জ্বালানো আগুন নিভিয়ে ফেলে তাহলে যেন আরও বেশি বেশি করে আগুন ধরানো হয়।
এদিকে ইসালামি রাজনৈতিক দল টিএলপির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আফজাল কাদরি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসার ও রায় বাতিল করা বেঞ্চের অপর দুই বিচারকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছে। তার ভাষ্য, ‘তাদের তিনজনকেই হত্যা করা উচিত। হয় নিরাপত্তা রক্ষী, না হয় গাড়ির চালক আর না হয় বাবুর্চির উচিত তাদেরকে হত্যা করা।’ মুহাম্মদ আফজাল কাদরি পাকিস্তান সরকার ও সেনাপ্রধান জেনারেল কামার বাজওয়াকে উৎখাতেরও আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি।
বিক্ষোভকারীদের কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, অবরোধ কর্মসূচি চলতে থাকলে তার সরকার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। ইমরান খানের ভাষ্য, ‘আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, রাষ্ট্রকে এমন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবেন না যাতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।’
অন্যদিকে প্রতিবাদকারীদের পক্ষেও সমর্থন জোরালো হচ্ছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত, জঙ্গি হাফিজ সাঈদ আগামীকাল শুক্রবার জুম্মার পরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। মুম্বাইয়ের ওই হামলায় ১৬৬ জন নিহত হয়েছিলেন। মিলি ইয়াকজেথি কাউন্সিল নামের আরেকটি ইসলামিক গোষ্ঠী প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছে।
আসিয়া বিবির মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করা হলেও এখন তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেছেন, তাকে পাকিস্তানের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।







