আফগানিস্তানে তালেবানের হাতে কাবুলের পতনের পর পাকিস্তানের চিরাচরিতভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক কণ্ঠগুলোতে এক বিরল বিষয় লক্ষ করা গেছে: ঐক্য। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান 'দাসত্বের শৃঙ্খলা' ভাঙায় তালেবানের প্রশংসা করেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল, ইসলামি দলগুলোর নেতারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে 'ঐতিহাসিক জয়ে' তালেবানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্তত অর্ধেক ডজন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল প্রকাশ্যে উদযাপন করেছেন। উদযাপনে শামিল ছিল পাকিস্তানের জেনারেল ও সরকারের শত্রু হিসেবে পরিচিত চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো।
কিন্তু প্রকাশ্যে ব্যাপকভাবে আনন্দ উদযাপন করলেও পাকিস্তান ধীরে ধীরে আফগান সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতি পেতে শুরু করেছে। তালেবানের নাটকীয় উত্থান পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রক্তাক্ত বিদ্রোহের রসদ শুধু জোগাচ্ছে তা নয়, এর ফলে দেশটির কট্টরপন্থী ইসলামি দলগুলোর পালে হাওয়া লাগাচ্ছে, যারা পাকিস্তানকে মৌলবাদী ইসলামি চরিত্রে রূপ দিতে চায়।
বিশ্লেষক এবং পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলাফল হলো, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য নতুন উভয় সংকট। যা ১৯৭০ দশক থেকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে তারা। একই সঙ্গে সতর্কভাবে দেশটিতে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পরিচিত জঙ্গি গোষ্ঠী, রক্ষণশীল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারা তালেবানের ক্ষমতায় ফিরে আসায় ব্যাপক আশাবাদী। করাচির বিরোধী রাজনীতিক, যিনি তালেবানকে সমর্থন করেন, কিন্তু পাকিস্তানের ভেতরে সহিংস সংগ্রামবিরোধী মাওলানা ফজল-উর রেহমান তালেবানের বিজয়কে উল্লেখ করে ইমরান খানকে উৎখাতের জন্য নির্বাচনি বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার তালেবানের জনক বলে পরিচিত সুন্নি ধর্মীয় নেতার ছেলে আরও বেশি রক্ষণশীল রাজনীতিক মাওলানা হামিদ উল হক তার সমর্থকদের বলেছেন, আফগানিস্তানে শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপন করেছে তালেবান। এতে গণতন্ত্রের ঘাটতি উঠে আসছে। পাকিস্তানেও এমন সত্যিকার ইসলামি ব্যবস্থার জন্য কঠোর সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত হতে হবে।
ইসলামাবাদের পাকিস্তানি ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ-এর ডিরেক্টর মুহাম্মদ আমির রানা মনে করেন, প্রতিবেশী আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলে এরইমধ্যে পাকিস্তানে প্রভাব পড়তে শুরু করছে। তিনি বলেন, তালেবানের কাবুল দখলে পাকিস্তানবিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অনুপ্রাণিত হবে। কিন্তু এখানেই শেষ হবে না। দেশে যুদ্ধের এক নতুন আখ্যান রচিত হবে। যা রাষ্ট্র ও সমাজ এবং ধর্মের ভূমিকা সম্পর্কে চলমান বিতর্ক বদলে যাবে।
তিনি আরও যোগ করেন, চরমপন্থী ও সহিংস গোষ্ঠীগুলো ভাববে, যদি আফগানিস্তানে ইসলামি শাসন হতে পারে এখানে কেন সম্ভব না?
উদ্বেগের নাম পাকিস্তানি তালেবান
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের আশু উদ্বেগের কারণ হলো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সশস্ত্র জোট তেহরিক-ই-তালেবান বা পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি)-এর পুনরুত্থান। এ গোষ্ঠীটির আফগান তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। গত দশকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ১ হাজার ৮০০ হামলা চালিয়েছে তারা। তালেবানের ক্ষমতা দখলের প্রশংসা করে টিটিপি গত সপ্তাহে উত্তরাঞ্চলে একটি হামলা চালিয়েছে। হামলাকারী বন্দুকধারীরা আফগানিস্তান থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করেছে। এতে দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
জুলাই মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, টিটিপির অন্তত ৬ হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা সীমান্তের ওপারে আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবান ও টিটিপি নিজেদের সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
পাকিস্তানের সিনেটের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান মুশাহিদ হুসেইন সৈয়দ জানিয়েছেন, তালেবানকে ‘রেডলাইন’ টেনে দিয়ে টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে।
এক সাবেক শীর্ষস্থানীয় টিটিপি কমান্ডার জানিয়েছেন, পাকিস্তান সম্প্রতি তালেবানকে বলেছে সাধারণ ক্ষমার বদলে টিটিপি যোদ্ধাদের অস্ত্র আত্মসমর্পণের জন্য। জবাবে তালেবান বলেছে, তারা টিটিপি সদস্যদের পাকিস্তানের হাতে তুলে দেবে না, কিন্তু পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য চাপ দেবে। তিনি বলেন, আফগান তালেবান যদি টিটিপিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে তাহলে অনেক কমান্ডার ইসলামিক স্টেট-খোরাশানে যোগ দিতে পারে। সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট








