আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি বলেছেন, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তার প্রাসাদের নিরাপত্তা বাহিনী যখন তাকে জানায় যে তারা প্রেসিডেন্ট বা কাবুলকে আর সুরক্ষা দিতে অপারগ, তার কয়েক মিনিটের মধ্যে আকস্মিকভাবেই তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। বিবিসি-র রেডিও ফোর চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তালেবানের দ্রুত ক্ষমতা দখলের জন্য কেন আফগান জনগণ তাকে দোষারোপ করেছিল। কিন্তু তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সহযোগী দেশগুলোকে বিশ্বাস করাই ছিল তার একমাত্র ভুল।
বিবিসি-র সাময়িক ঘটনাবলীর বেতার অনুষ্ঠান 'টুডে'র অতিথি সম্পাদক সাবেক ব্রিটিশ চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল নিক কার্টারের প্রশ্নের উত্তরে গণি বলেন, ১৫ আগস্ট সকালেও তিনি একবারও ভাবেননি যে সেদিনই বিকেলে তিনি দেশ ছেড়ে পালাবেন। ভাবেননি এটিই আফগানিস্তানের মাটিতে তার শেষ দিন। তার দাবি, তাকে নিয়ে বিমান উড্ডয়নের পর তিনি অনুধাবন করেন তিনি আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছেন।
ওই সময়ে তিনি তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, বিপদের সময় জনগণকে ফেলে তিনি পালিয়ে গেছেন। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত এই আফগান প্রেসিডেন্ট।
পালানোটা ছিল আকস্মিক সিদ্ধান্ত
আশরাফ গণি বলেন, ১৫ আগস্ট তার শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে জানান, তালেবান কাবুলে না ঢোকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং প্রাসাদের নিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে। তার ভাষায়, ‘আগে আমাদের বলা হয়েছিল, হাক্কানিরা কাবুলে না ঢোকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু দুই ঘণ্টা পর সব বদলে যায়। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. মোহিব এবং প্রেসিডেন্টের রক্ষী বাহিনী পিপিএস-এর প্রধান এসে আমাকে বলেন, প্রাসাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তালেবানের দুইটি ভিন্ন শাখা দুইটি ভিন্ন দিক থেকে তখন কাবুলে ঢোকার জন্য এগিয়ে আসছিল। তাদের সঙ্গে বিশাল এক লড়াইয়ের আশঙ্কা তখন চরমে, যে লড়াই ৫০ লাখ মানুষের শহর কাবুলকে ধ্বংস করে দেবে। মানুষের জীবন চরম বিপদে পড়বে।’ তিনি তখন তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং তার স্ত্রীকে কাবুল থেকে পালানোর অনুমতি দেন। তিনি নিজে অপেক্ষা করেন তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যেতে একটা গাড়ি আসার জন্য। সে গাড়ি আর আসেনি। তার বদলে আসেন ভয়ার্ত প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান। তিনি বলেন, এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।
আশরাফ গণি বলেন, ‘তিনি আমাকে দুই মিনিটের বেশি সময় দেননি। আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় খোস্ত শহরে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে।’ তবে তিনি জানান, খোস্তেরও পতন হয়েছে। জালালাবাদও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত এই আফগান প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। শুধু বিমানটা যখন আকাশে উড়ল, তখন পরিষ্কার হলো যে, আমরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছি। কাজেই এটা খুবই আকস্মিকভাবে ঘটেছিল।’
আফগানিস্তানের বিষয়টি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কুক্ষিগত
আশরাফ গণি আফগানিস্তান ছেড়ে পালানোর জন্য দেশের ভেতরেই ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। এমনকি তার ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ একে ন্যাক্কারজনক ঘটনা বলে মন্তব্য করেন।
জেনারেল নিক কার্টার বিবিসি-র রেডিও অনুষ্ঠানে তাকে প্রশ্ন করেন আশরাফ গণি দেশের ভেতরে থাকলে পরিস্থিতি কি ভিন্ন দিকে যেতে পারতো? উত্তরে গণি বলেন, ‘না। কারণ দুভার্গ্যজনকভাবে আমার ওপর কালো রঙ লেপে দেওয়া হয়েছিল। তাদের সঙ্গে বসার কোনও সুযোগ আমাদের দেওয়া হয়নি। তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাষ্ট্রদূত খলিলজাদ। বিষয়টা যুক্তরাষ্ট্রের কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছিল। এটা আর আফগান ইস্যু ছিল না। আমেরিকা আমাদের মুছে ফেলেছিল।’
আশরাফ গণির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ সঙ্গে নিয়ে গেছেন- যে অভিযোগ তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তিনি এই মিথ্যা অপবাদ ঘোচাতে আন্তর্জাতিক তদন্তকে স্বাগত জানান। তার ভাষায়, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, আমি দেশ থেকে কোনও অর্থ সরাইনি। আমি কিভাবে জীবনযাপন করি, তা সবাই জানে। আমি অর্থ দিয়ে কী করবো?’
তিনি বলেন, তার ভুল ছিল এটা ধরে নেওয়া যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের চুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ওই চুক্তির অধীনে যা ঘটেছে তারই পরিণাম ছিল ১৫ আগস্টের ঘটনা।
তিনি বলেন, একটা শান্তি চুক্তির বদলে আমরা পেয়েছিলাম প্রত্যাহার প্রক্রিয়া নিয়ে চুক্তি। যেভাবে ওই চুক্তি করা হয় তাতে আমাদের মুছে দেওয়া হয়েছিল।
ওই চুক্তিতে ওয়াশিংটন রাজি হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে নেবে এবং বন্দি বিনিময় করবে। সেই শর্তে তালেবান আফগান সরকারের সঙ্গে আলেচনায় বসতে সম্মত হয়। সে আলোচনা কার্যকর হয়নি।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১-এর গ্রীষ্মে প্রতিশ্রুতি দেন যে, মার্কিন সেনাদের শেষ দল ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। এর পরপরই তালেবান একের পর এক শহর দখলের অভিযান শুরু করে।
আশরাফ গণি বলেন, শেষ পর্যন্ত যেটা হয় সেটা একটা সহিংস অভ্যুত্থান। কোনও রাজনৈতিক চুক্তি সেটা ছিল না। সেটা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও ছিল না।
আশরাফ গণি যেদিন কাবুল ছেড়ে যান, সেদিনই তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। যার পর থেকে কাবুল মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। বিশেষ করে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সাক্ষাৎকারে আশরাফ গণি বলেছেন, কাবুল পতনের পেছনে যেসব কারণ রয়েছে তার কিছু কিছুর জন্য দায় নিতে তিনি রাজি আছেন। যেমন: আন্তর্জাতিক সহযোগী দেশগুলোকে বিশ্বাস করা। তিনি বলেন, ‘আমার সারা জীবনের কাজ ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার মূল্যবোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আমাকে বলির পাঁঠা করা হয়েছে।’ সূত্র: বিবিসি।









